ওয়াই-ফাইয়ের গতি বাড়ানোর সহজ উপায়
ক.বি.ডেস্ক: এক ঘরে রাউটার, অন্য ঘরে গেলেই ইন্টারনেটের গতি কমে যায় এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে। ভিডিও বাফারিং, ওয়েবসাইট খুলতে দেরি, অনলাইন মিটিংয়ে বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা ফাইল ডাউনলোডে বেশি সময় লাগা দুর্বল ওয়াই-ফাই সিগন্যালের কারণে এসব সমস্যা হতে পারে।
অনেকেই মনে করেন, ইন্টারনেট প্যাকেজের গতি বেশি হলেই ওয়াই-ফাই দ্রুত হবে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। রাউটারের অবস্থান, দেয়ালের বাধা, আশপাশের অন্যান্য ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক, রাউটারের প্রযুক্তি, সংযুক্ত ডিভাইসের সংখ্যা এবং সঠিক সেটিংস সবকিছুর ওপর ওয়াই-ফাইয়ের পারফরম্যান্স নির্ভর করে। তাই নতুন রাউটার কেনার আগে কয়েকটি সহজ বিষয় পরীক্ষা করে দেখুন। অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ ছাড়াই ওয়াই-ফাইয়ের পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব।
রাউটার রাখুন বাড়ির উপযুক্ত স্থানে
ওয়াই-ফাইয়ের গতি ও কভারেজের ক্ষেত্রে রাউটারের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভব হলে রাউটার বাড়ির মাঝামাঝি এবং তুলনামূলক খোলা জায়গায় রাখুন। একেবারে কোনও ঘরের কোণে, মেঝেতে কিংবা আলমারির ভেতরে রাখলে সিগন্যাল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। রাউটার একটু উঁচু জায়গায় রাখলে সাধারণত ভালো কভারেজ পাওয়া যায়। রাউটারের ওপর কাপড়, বই বা অন্য কোনও বস্তু দিয়ে ঢেকে না রাখাই ভালো।
দেয়াল ও ধাতব বস্তুর কাছ থেকে দূরে রাখুন
বাড়ির মোটা দেয়াল, বিশেষ করে কংক্রিটের দেয়াল, ধাতব দরজা, বড় আয়না এবং কিছু বৈদ্যুতিক যন্ত্র ওয়াই-ফাই সিগন্যাল দুর্বল করতে পারে। তাই রাউটার এমন জায়গায় রাখুন, যেখান থেকে প্রয়োজনীয় কক্ষগুলোর দিকে সিগন্যাল যাওয়ার পথে যতটা সম্ভব কম বাধা থাকে। বিশেষ করে রান্নাঘর, বড় ধাতব আলমারি বা ভারী ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির একেবারে পাশে রাউটার রাখা এড়িয়ে চলুন।
রাউটারের অ্যান্টেনার অবস্থান ঠিক করুন
আপনার রাউটারে যদি একাধিক অ্যান্টেনা থাকে, সেগুলো একই দিকে না রেখে বিভিন্ন কোণে রাখার চেষ্টা করতে পারেন। রাউটারের অ্যান্টেনার নকশা অনুযায়ী সিগন্যাল ছড়ানোর ধরন ভিন্ন হতে পারে। তাই অ্যান্টেনা সামান্য পরিবর্তন করে বিভিন্ন জায়গায় স্পিড পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।
২.৪ গিগাহার্টজ ও ৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ড সঠিকভাবে ব্যবহার করুন
আধুনিক অনেক রাউটারে ২.৪ গিগাহার্টজ এবং ৫ গিগাহার্টজ দুই ধরনের ওয়াই-ফাই ব্যান্ড থাকে। ২.৪ গিগাহার্টজ সাধারণত তুলনামূলক বেশি দূরত্বে সিগন্যাল পৌঁছাতে পারে এবং দেয়াল ভেদ করার ক্ষমতাও বেশি। তবে এই ব্যান্ডে আশপাশের অন্যান্য নেটওয়ার্কের হস্তক্ষেপ বেশি হতে পারে। অন্যদিকে ৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ডে সাধারণত বেশি গতি পাওয়া যায়, কিন্তু দূরত্ব বাড়লে এবং দেয়ালের সংখ্যা বাড়লে সিগন্যাল দ্রুত দুর্বল হতে পারে। তাই রাউটারের কাছাকাছি অবস্থান করলে ৫ গিগাহার্টজ ব্যবহার করে বেশি গতি পাওয়া যেতে পারে। আর দূরের কক্ষের জন্য ২.৪ গিগাহার্টজ বেশি কার্যকর হতে পারে।
ওয়াই-ফাই চ্যানেল পরিবর্তন করে দেখুন
একই এলাকায় অনেকগুলো রাউটার কাছাকাছি থাকলে ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে হস্তক্ষেপ হতে পারে। অ্যাপার্টমেন্ট বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। রাউটারের সেটিংসে গিয়ে উপযুক্ত ওয়াই-ফাই চ্যানেল নির্বাচন করা যেতে পারে। অনেক আধুনিক রাউটারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম ব্যস্ত চ্যানেল বেছে নেয়ার সুবিধাও থাকে। তবে সেটিংস পরিবর্তনের আগে রাউটারের মডেলের নির্দেশিকা দেখে নেয়া ভালো।
রাউটারের ফার্মওয়্যার আপডেট রাখুন
রাউটারের সফটওয়্যার বা ফার্মওয়্যার পুরোনো হয়ে গেলে পারফরম্যান্স ও নিরাপত্তা দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা হতে পারে। প্রস্তুতকারকের পক্ষ থেকে নতুন ফার্মওয়্যার আপডেট দেয়া হলে তা ইনস্টল করুন। এতে কখনও কখনও বাগ ঠিক হওয়ার পাশাপাশি সংযোগের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাও উন্নত হতে পারে।
রাউটারে অতিরিক্ত ডিভাইস সংযুক্ত আছে কি না দেখুন
একসঙ্গে অনেক স্মার্টফোন, টিভি, কমপিউটার, ক্যামেরা, স্মার্ট স্পিকার বা অন্যান্য ডিভাইস ইন্টারনেটে যুক্ত থাকলে ব্যান্ডউইডথের ওপর চাপ পড়তে পারে। বিশেষ করে কোনও ডিভাইসে বড় ফাইল ডাউনলোড, ৪কে ভিডিও স্ট্রিমিং বা ক্লাউড ব্যাকআপ চললে অন্য ডিভাইসে ইন্টারনেট ধীর মনে হতে পারে। তাই রাউটারের অ্যাডমিন প্যানেলে গিয়ে কোন কোন ডিভাইস সংযুক্ত রয়েছে তা পরীক্ষা করুন। অপরিচিত ডিভাইস থাকলে ওয়াই-ফাইয়ের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করাও ভালো।
ওয়াই-ফাইয়ের নিরাপত্তা শক্ত করুন
অন্য কেউ আপনার ওয়াই-ফাই ব্যবহার করলে আপনার ইন্টারনেটের গতি কমে যেতে পারে। তাই শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন এবং সম্ভব হলে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেমন ডব্লিউপিএ২ বা ডব্লিউপিএ৩ ব্যবহার করুন রাউটার সমর্থন করলে। রাউটারের ডিফল্ট অ্যাডমিন পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু গতি নয়, নিরাপত্তার জন্যও নিয়মিত ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ড পর্যালোচনা করা উচিত।
বড় বাড়িতে ওয়াই-ফাই এক্সটেন্ডার বা ম্যাশ ব্যবহার করুন
বাড়ি বড় হলে কিংবা একাধিক দেয়ালের কারণে রাউটারের সিগন্যাল দূরের কক্ষে পৌঁছাতে না পারলে ওয়াই-ফাই রেঞ্জ এক্সটেন্ডার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এক্সটেন্ডার এমন জায়গায় বসাতে হবে যেখানে মূল রাউটারের সিগন্যাল এখনও ভালোভাবে পাওয়া যায়। একেবারে দুর্বল সিগন্যাল পাওয়া জায়গায় এক্সটেন্ডার বসালে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও পাওয়া যেতে পারে। আর বড় বাড়ি, একাধিক তলা কিংবা অনেকগুলো কক্ষের জন্য ম্যাশ ওয়াই-ফাই সিস্টেম তুলনামূলক ভালো সমাধান হতে পারে। এতে একাধিক নোডের মাধ্যমে পুরো বাড়িতে একটি সমন্বিত ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায়।
পুরোনো রাউটার হলে আপগ্রেডের কথা ভাবুন
অনেক বছর আগের রাউটার ব্যবহার করলে আধুনিক উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগের পুরো সুবিধা পাওয়া নাও যেতে পারে। নতুন রাউটার কেনার সময় শুধু ‘সর্বোচ্চ Mbps’ দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ওয়াই-ফাই জেনারেশন, আপনার ইন্টারনেট প্যাকেজের গতি, বাড়ির আকার এবং একই সময়ে কতগুলো ডিভাইস ব্যবহার করা হয় এসব বিষয় বিবেচনা করুন। বিশেষ করে নতুন রাউটার কেনার আগে আপনার ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের দেয়া সংযোগের সঙ্গে সেটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
ওয়াই-ফাই ধীর নাকি ইন্টারনেট সংযোগই ধীর আগে বুঝুন
অনেক সময় আমরা ওয়াই-ফাইকে দায়ী করি, অথচ সমস্যাটি আসলে ইন্টারনেট সংযোগে। বিষয়টি বোঝার সহজ উপায় হলো রাউটারের কাছাকাছি গিয়ে একই সময়ে স্পিড টেস্ট করা এবং দূরের কক্ষে গিয়ে আবার পরীক্ষা করা। যদি রাউটারের কাছাকাছি ভালো গতি পাওয়া যায় কিন্তু দূরে গেলে গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, তাহলে সমস্যা মূলত ওয়াই-ফাই কভারেজ বা সিগন্যালের। অন্যদিকে রাউটারের কাছেও যদি গতি কম থাকে, তাহলে ইন্টারনেট প্যাকেজ, আইএসপির সংযোগ, রাউটার বা অন্য কোনও কারণে সমস্যা হতে পারে।
নতুন রাউটার কেনার আগে যা করবেন
নতুন রাউটার কেনার আগে একবার রাউটারের অবস্থান পরিবর্তন করুন; রাউটার রিস্টার্ট করে দেখুন; সংযুক্ত ডিভাইসের তালিকা পরীক্ষা করুন; ফার্মওয়্যার আপডেট আছে কি না দেখুন; ২.৪ গিগাহার্টজ ও ৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ড পরীক্ষা করুন; আশপাশের ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের হস্তক্ষেপ বিবেচনা করুন এবং রাউটারের কাছাকাছি ও দূরে স্পিড টেস্ট করুন। এসব করার পরও যদি সমস্যা থাকে, তখন ওয়াই-ফাই এক্সটেন্ডার, ম্যাশ সিস্টেম বা নতুন রাউটার কেনার কথা ভাবা যেতে পারে।
দ্রুতগতির ইন্টারনেট প্যাকেজ থাকলেই যে বাড়ির প্রতিটি ঘরে সমান গতির ওয়াই-ফাই পাওয়া যাবে, এমন নয়। রাউটারের সঠিক অবস্থান, উপযুক্ত ব্যান্ড, নিরাপদ সেটিংস, কম হস্তক্ষেপ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম ব্যবহার করলেই ওয়াই-ফাইয়ের অভিজ্ঞতা অনেকটাই উন্নত করা সম্ভব। তাই রাউটার বদলানোর আগে তার অবস্থান ও সেটিংস পরীক্ষা করুন। আর বড় বাড়ি বা দুর্বল কভারেজের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী ওয়াই-ফাই এক্সটেন্ডার, ম্যাশ সিস্টেম ব্যবহার করুন। এতে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে আপনার বিদ্যমান ইন্টারনেট সংযোগ থেকেই আরও ভালো পারফরম্যান্স পাওয়া সম্ভব।





