অন্যান্য টিপস

শিশু সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষতিকর কনটেন্ট: কী করবেন অভিভাবকরা?

ক.বি.ডেস্ক: মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শিশুদের দৈনন্দিন জীবনেরও অংশ। পড়াশোনা, বিনোদন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বিভিন্ন প্রয়োজনে শিশুরা খুব অল্প বয়সেই ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রবেশ করছে। কিন্তু এই জগতের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি রয়েছে নানা ধরনের ঝুঁকি। বয়স-অনুপযোগী কনটেন্ট, সহিংসতা, অশালীনতা, সাইবার বুলিং, আত্মক্ষতির প্ররোচনা কিংবা শরীর ও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে নেতিবাচক ধারণার মতো বিষয় অনিচ্ছাকৃতভাবেই পৌঁছে যেতে পারে শিশুর সামনে। এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের করণীয় কী?

বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশ শিশুই কোনও না কোনোভাবে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংস্পর্শে আসছে। কখনও বাবা-মায়ের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে, আবার কখনও শিশুর নামে আলাদা অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়া হচ্ছে। ফলে বয়স, মানসিক পরিপক্বতা ও প্রয়োজন বিবেচনা না করেই অনেক শিশু খুব অল্প বয়সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষামূলক, সৃজনশীল ও ইতিবাচক কনটেন্টের অভাব নেই। কিন্তু একই সঙ্গে রয়েছে সহিংসতা, অশালীনতা, সাইবার বুলিং, আত্মক্ষতির প্ররোচনা, শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নানা ধরনের বয়স-অনুপযোগী কনটেন্ট। এসব বিষয় শিশুর চিন্তা, আচরণ ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করে আয় ও জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ফেসবুক, ইউটিউব সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে রিলস, শর্টস ও অন্যান্য ভিডিও কনটেন্ট থেকে আয় এবং মনিটাইজেশন নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের প্রতিবেদন মানুষকে তথ্য দেয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরিকে অনেকের কাছে সম্ভাবনাময় আয়ের পথ হিসেবেও উপস্থাপন করছে। ফলে অনেকে জেনে বা না জেনে কনটেন্ট তৈরির দিকে ঝুঁকছেন।

সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এই প্রবণতার সঙ্গে শিশুদেরও বাণিজ্যিকভাবে যুক্ত করা হয়। শিশুর স্বাভাবিক জীবন, ব্যক্তিগত পরিসর ও মানসিক বিকাশের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে অনেক সময় তাকে দিয়ে ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে। কখনও শিশু নিজেই হয়ে ওঠছে ভিডিওর মূল চরিত্র, আবার কখনও তার পোশাক, কথাবার্তা, আচরণ কিংবা ব্যক্তিগত মুহূর্তকে দর্শক আকর্ষণের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

অর্থ উপার্জন বা জনপ্রিয়তা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও প্রশ্ন থেকেই যায় একটি শিশুর ব্যক্তিগত জীবন ও নিরাপত্তার বিনিময়ে সেই কনটেন্ট তৈরি করা কতটা গ্রহণযোগ্য? শিশুকে শুধু ডিজিটাল কনটেন্টের ভোক্তা কিংবা বাণিজ্যিক মুনাফার উপকরণ হিসেবে না দেখে একজন ‘অধিকারধারী’ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। ডিজিটাল পরিবেশে শিশুর নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, মতপ্রকাশের সুযোগ এবং সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সবার।

শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বয়সসীমা, অভিভাবকের সম্মতি এবং বয়স যাচাইয়ের মতো বিভিন্ন সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ডেনমার্কও কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাজ্য সহ বিভিন্ন দেশে বয়স যাচাই, স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরির নানা উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে।

গবেষণাতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে শিশুদের সাইবার বুলিং, বয়স-অনুপযোগী কনটেন্টের সংস্পর্শ, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন ঝুঁকির সম্পর্কের কথা ওঠে এসেছে। বিশেষ করে আত্মক্ষতির প্ররোচনা, খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা কিংবা শরীর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে এমন কনটেন্ট শিশুদের ক্ষেত্রে গুরুতর উদ্বেগের কারণ। তাহলে শিশু যদি ভুল করে কোনও ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখে ফেলে, তখন অভিভাবকদের কী করা উচিত?

শিশুকে বকাঝকা নয়, কথা বলুন
শিশু কোনও অস্বস্তিকর বা ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখে ফেললে প্রথমেই আতঙ্কিত হওয়া কিংবা তাকে বকাঝকা করা উচিত নয়। বরং শান্তভাবে জানতে হবে সে কী দেখেছে, কোথায় দেখেছে এবং সেটি দেখে তার কেমন লেগেছে। অভিভাবকের রাগ বা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার কারণে শিশু যদি মনে করে সত্য কথা বললে তাকে শাস্তি পেতে হবে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় কোনও সমস্যার মুখোমুখি হলেও সে বিষয়টি গোপন করতে পারে। তাই প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুকে নিরাপদ অনুভব করানো।

তৈরি করুন খোলামেলা যোগাযোগের পরিবেশ
শিশু যেন জানে, অনলাইনে কোনও অস্বস্তিকর, ভয়ংকর বা বিভ্রান্তিকর কিছু দেখলে সে নির্ভয়ে বাবা-মাকে জানাতে পারবে। অনলাইনে কার সঙ্গে কথা বলছে, কী ধরনের ভিডিও দেখছে কিংবা কোনও অচেনা ব্যক্তি যোগাযোগ করছে কি না এসব বিষয়ে বয়স অনুযায়ী নিয়মিত আলোচনা করা প্রয়োজন। এখানে নজরদারির পাশাপাশি বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করাটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নির্ধারণ করুন ডিজিটাল সীমানা
কখন, কোথায় এবং কতক্ষণ মোবাইল বা অন্য ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে সে বিষয়ে পরিবারের নিজস্ব নিয়ম থাকা দরকার। খাবারের সময়, পড়াশোনা, ঘুম এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময়কে যতটা সম্ভব স্ক্রিনমুক্ত রাখা যেতে পারে। শিশুর বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করা এবং সেই নিয়মে বাবা-মায়েরও ধারাবাহিক থাকা জরুরি।

প্রযুক্তিকে নিরাপদ করুন
শিশুর হাতে শুধু স্মার্টফোন তুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ডিভাইস ও অ্যাপের নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলোও বুঝতে হবে অভিভাবকদের। বয়স উপযোগী প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, নিরাপদ সার্চ, প্রাইভেসি সেটিংস ও কনটেন্ট ফিল্টার ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে শিশুকে বোঝাতে হবে পূর্ণ নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড, ব্যক্তিগত ছবি বা অন্য সংবেদনশীল তথ্য অনলাইনে অপরিচিত কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না।

ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখলে ব্যবস্থা নিন
কোনও পোস্ট, ভিডিও বা অ্যাকাউন্ট শিশুর জন্য ক্ষতিকর মনে হলে সেটি রিপোর্ট, ব্লক কিংবা ‘নট ইন্টারেস্টেড’ করার পদ্ধতি শিশুকে শেখানো যেতে পারে। সাইবার বুলিং, হয়রানি কিংবা সরাসরি হুমকির ঘটনা ঘটলে প্রয়োজনীয় স্ক্রিনশট ও অন্যান্য তথ্য প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করা উচিত। গুরুতর পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সহায়তা নেয়া যেতে পারে।

স্ক্রিনের বাইরে তৈরি করুন আনন্দের জগৎ
শুধু মোবাইল ব্যবহার বন্ধ করে দেয়াই সমাধান নয়। শিশুর জন্য বিকল্প আনন্দ ও সৃজনশীলতার সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। বই পড়া, খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গান, গল্প বলা, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর সুযোগ বাড়াতে হবে। শিশুর জীবনে বাস্তব জগতের আনন্দ যত বেশি থাকবে, স্ক্রিনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সম্ভাবনাও তত কমবে।

নিষেধ নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
শিশুকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখাই সব ক্ষেত্রে একমাত্র সমাধান নয়। কারণ ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষা, যোগাযোগ ও সৃজনশীলতারও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রয়োজন হলো শিশুর বয়স, মানসিক পরিপক্বতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলা। এর জন্য দরকার অভিভাবকের সচেতনতা, সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার।

শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেয়া সহজ; কিন্তু সেই প্রযুক্তি কীভাবে নিরাপদে ব্যবহার করতে হবে, তা শেখানোই বড় দায়িত্ব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন শিশুর শৈশব কেড়ে না নেয়। বরং ডিজিটাল দুনিয়া হয়ে উঠুক তার শেখা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ ও বিকাশের নিরাপদ সহযাত্রী এ দায়িত্ব পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরের। কারণ শিশুকে শুধু অনলাইন ঝুঁকি থেকে দূরে রাখাই যথেষ্ট নয়; তাকে নিরাপদ ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *