ডিজিটাল বিপ্লবে বদলে যাচ্ছে বিচারব্যবস্থা: ই-জুডিসিয়ারিতে গতি, স্বচ্ছতা ও স্বস্তি
ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ: দেশের বিচারব্যবস্থায় শুরু হয়েছে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী রূপান্তর। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ‘ই-জুডিসিয়ারি’ উদ্যোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে আদালতের চিরচেনা ধারা-দীর্ঘসূত্রতা, জটিলতা আর ভোগান্তির জায়গা দখল করছে গতি, স্বচ্ছতা ও সহজতা।
সরকার ইতোমধ্যে বিচার ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে একাধিক ডিজিটাল সেবা চালু করেছে। ই-বেইলবন্ড ম্যানেজমেন্ট, ই-ফ্যামিলি কোর্ট, অনলাইন কজলিস্ট, এমনকি বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের ডিজিটালাইজেশন সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো গড়ে ওঠছে। এর লক্ষ্য একটাই বিচারপ্রার্থীদের সময়, খরচ ও ভোগান্তি কমিয়ে একটি জনবান্ধব বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগগুলো বিচারপ্রক্রিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে, তবে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য এখনও অনেক পথ বাকি। আদালতে অডিও-ভিজ্যুয়াল রেকর্ডিং, অনলাইন সাক্ষ্যগ্রহণ, কেস ট্র্যাকিং ও ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা আরও বিস্তৃত করা গেলে বিচারপ্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের মতে, অনলাইন সাক্ষ্যগ্রহণ চালু হলে মামলার জট অনেকাংশে কমে আসবে। বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণে অনেক মামলাই দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাক্ষ্য দেয়ার সুযোগ থাকলে এই সমস্যার সমাধান সহজ হবে। একই সঙ্গে অডিও-ভিজ্যুয়াল রেকর্ডিং চালু হলে প্রতিটি সাক্ষ্য সংরক্ষিত থাকবে, যা পরবর্তীতে যাচাইযোগ্য হওয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘ই-জুডিসিয়ারি’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। প্রকল্পটি চালু হলে মামলা দায়ের থেকে শুরু করে কজলিস্ট, কেস ট্র্যাকিং এবং নথি সংরক্ষণ সবকিছুই হবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে।
ইতোমধ্যে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে এবং বিচার ব্যবস্থায় ডিজিটাল বিপ্লব ত্বরান্বিত করতে দেশের বগুড়া সহ সাত জেলায় ই-বেইলবন্ড কার্যক্রম চালু হয়েছে। বগুড়া, রাজশাহী, নাটোর, ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা ও কুষ্টিয়ায় একযোগে ই-বেইলবন্ড কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে ঘরে বসেই বেইলবন্ড দাখিল করা যাচ্ছে। এতে আইনজীবী, কারা প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। পাশাপাশি দুটি জেলায় চালু হওয়া ই-ফ্যামিলি কোর্ট নারী ও শিশুদের জন্য বিচারপ্রাপ্তি আরও সহজ করে তুলেছে।
এদিকে অনলাইন কজলিস্টের কারণে এখন মামলার তারিখ ও অগ্রগতি জানতে আর আদালতে ছুটতে হচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন আদালতে স্থাপিত তথ্য ও সেবা কেন্দ্রগুলোও বিচারপ্রার্থীদের জন্য বড় সহায়ক হয়ে ওঠেছে।
বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থাও ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে জালিয়াতি কমবে এবং সংশ্লিষ্ট মামলার সংখ্যাও হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সবকিছুর মধ্যেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষ করে প্রবীণ আইনজীবীদের অনেকেই এখনও পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেননি। পাশাপাশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রযুক্তি অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণের।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘ই-জুডিসিয়ারি’ শুধু একটি প্রকল্প নয় এটি দেশের বিচারব্যবস্থাকে নতুন যুগে নিয়ে যাওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে, ভবিষ্যতে বিচারপ্রার্থীদের জন্য অপেক্ষা করবে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং সহজ এক বিচারব্যবস্থা।





