এমএফএস খাতের ফাঁদ: ই-মানি, ট্রাস্ট ফান্ড ও সাড়ে আঠারো টাকা
সোহেল মৃধা: ধরা যাক এক বাস্তব দৃশ্যের কথা। মালয়েশিয়ার পেনাং বা কুয়ালালামপুরের কোনও কারখানা থেকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠালেন এক প্রবাসী তরুণ। লক্ষ্য বাড়িতে থাকা মায়ের হাতে বিশ হাজার টাকা পৌঁছানো। টাকাটা হুন্ডি এড়িয়ে একদম বৈধ প্রাতিষ্ঠানিক পথে এসেছে বলে দেশের সরকারও বেশ সন্তুষ্ট। প্রবাসী আয়কে উৎসাহিত করতে রাষ্ট্র নিজের পকেট থেকে আরও পাঁচশো টাকা উপহার হিসেবে জুড়ে দিল, যা রেমিট্যান্সের প্রণোদনা নামে পরিচিত। ২০১৯ সালে শতকরা ২ টাকা দিয়ে শুরু হওয়া এই সরকারি প্রণোদনা ২০২২ সালে এসে বেড়ে দাঁড়ায় আড়াই টাকায়।
কিন্তু গল্পের দ্বিতীয় অংশ শুরু হয় প্রবাসীর গ্রামে। প্রবাসীর বৃদ্ধা মা গেলেন স্থানীয় বাজারের একটি বিকাশের দোকানে টাকাটা তুলতে। এজেন্ট দোকানদার হিসাব কষে গুনে হাতে টাকা বুঝিয়ে দিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই বিশ হাজার চারশো টাকা থেকে এক লহমায় কেটে রেখে দিলেন প্রায় ৩৮০ টাকা। কারণটা আর কিছুই নয়, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস)- এর বহুল পরিচিত ক্যাশ-আউট চার্জ, যা হাজারে সাড়ে ১৮ টাকা বা ১.৮৫ শতাংশ। হিসাবটা দাঁড়াল খুব অদ্ভুত, সরকার দেশীয় অর্থনীতি বাঁচানোর নামে জনগণের করের টাকা থেকে দিল পাঁচশো টাকা, আর মাঝখান থেকে একটি বেসরকারি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের অ্যাপ বা এজেন্টের ভাড়া বাবদ কেটে নিল ৩৮০ টাকা!
রাষ্ট্রের দেয়া পুরস্কার আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তোলা ভাড়া একই মায়ের হাতে এসে প্রায় কাটাকুটি হয়ে গেল। কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, প্রবাসীর মা বিষয়টি টেরও পেলেন না। শুধু তিনি নন, দেশের কোটি কোটি সাধারণ গ্রাহকের কেউই এটা নিয়ে আর প্রশ্ন তোলেন না। কারণ বছরের পর বছর ধরে চলতে চলতে এই চার্জটা আমাদের সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, মনে হয় এটি যেন প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম, ঠিক যেমন আকাশে মেঘ জমলে বৃষ্টি হয়।
অথচ এই চুপচাপ মেনে নেয়া খরচের পেছনের মূল অংকটা কিন্তু মোটেই ছোট নয়। কেবল প্রবাসীদের এই আড়াই শতাংশ প্রণোদনা যোগাতে প্রতি বছর রাষ্ট্রকে নিজের বাজেট থেকে প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়, যার পুরোটাই সাধারণ মানুষের রক্তঘামে দেয়া করের টাকা। অন্যদিকে প্রবাসীরা দেশে পাঠাচ্ছেন রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স, যা বছরে ৩২ বিলিয়ন ডলারের অঙ্ক ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র পাইপের গোড়ায় কোটি কোটি টাকার সরকারি ভর্তুকি ঢালছে প্রাতিষ্ঠানিক পেমেন্টকে জনপ্রিয় করতে, আর পাইপের একদম শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের হাত থেকে চড়া হারে ভাড়া বা টোল আদায় করে নিচ্ছে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলো।
এক ওয়ালেট থেকে অন্য ওয়ালেটে টাকা পাঠানোর সরাসরি ও সস্তা কোনও উপায় আজও সাধারণ গ্রাহকের হাতে নেই
হাত বদলের খরচ ও রেট কার্ডের অংকের হিসাব
বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) খাতটি গত এক দশকে এক বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কথা বলে এই খাত সাধারণ মানুষের খুব কাছে পৌঁছে গেলেও, প্রতিবার টাকা হাতবদল বা পকেটবদলের ক্ষেত্রে প্রতিটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানেরই রয়েছে বেশ শক্ত রেট কার্ড ও ফি-এর হিসাব।
দেশের সবচেয়ে বড় সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশের কথাই ধরা যাক। অ্যাপ ব্যবহার করে ক্যাশ-আউট করুন কিংবা বাটন ফোনের ইউএসএসডি কোড দিয়ে টাকা তুলুন, সব মাধ্যমেই হাজারে চার্জ ধরা হয় ১৮ টাকা ৫০ পয়সা, যা মোট টাকার ১.৮৫ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি মাঝখানে প্রিয় এজেন্ট নামে একটি নিয়ম চালু করেছে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট দোকান থেকে টাকা তুললে খরচ কিছুটা কমে হাজারে ১৩ টাকা ৯৫ পয়সায় নামে। তবে একই সঙ্গে সেন্ড মানি বা এক ওয়ালেট থেকে অন্য ওয়ালেটে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা পার হলেই ৫ থেকে ১০ টাকা অতিরিক্ত ফি গুণতে হয়।
দ্বিতীয় বৃহত্তম সেবা ‘নগদ’-এর অ্যাপের মাধ্যমে ক্যাশ-আউট ফি ১২ টাকা ৫০ পয়সা হলেও, তার ওপর ১৫ শতাংশ সরকারি ভ্যাট যুক্ত হয়ে গ্রাহকের চূড়ান্ত খরচ দাঁড়ায় ১৪ টাকা ৯৪ পয়সায়। আর বাটন ফোনে লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনও ছাড় নেই, সেখানে সরাসরি ১৪ টাকা ৯৪ পয়সাই কাটা হয়।
ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ‘রকেট’-এর ক্ষেত্রে যদি কোনও গ্রাহক তাদের নিজস্ব এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে পারেন, তবে খরচ পড়ে হাজারে ৯ টাকা। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষ যখন ক্যাশ-আউট করতে এজেন্টের দোকানে যান, তখন তাদেরকেও সেই হাজারে ১৮ টাকাই দিতে হয়। অন্যদিকে ‘উপায়’ অ্যাপ ও বাটন ফোন উভয় মাধ্যমেই ক্যাশ-আউট চার্জ রেখেছে হাজারে ১৪ টাকা বা ১.৪ শতাংশ।
এই খরচগুলো আলাদাভাবে শুনলে হয়তো খুব বেশি মনে হয় না, কিন্তু বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মেলালে এর আসল তীব্রতা বোঝা যায়। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যখন বিভিন্ন দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার খরচ পাশাপাশি রেখে মেপেছে, তখন দেখা গেছে পঁচিশ হাজার টাকা সমপরিমাণ অর্থ ক্যাশ আউট করতে বাংলাদেশে একজন গ্রাহকের খরচ হয় ৩৭২ থেকে ৪৬২ টাকা। অথচ রাজনৈতিক সংকটে থাকা মিয়ানমারে ২৩১ টাকা, আর পাশের দেশ ভারতে এই ক্যাশ-আউট চার্জ বলতে গেলে সম্পূর্ণ শূন্য।
প্রবাসীদের এই আড়াই শতাংশ প্রণোদনা যোগাতে প্রতি বছর রাষ্ট্রকে নিজের বাজেট থেকে প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়
ব্যাংক আমানত নাকি জমানো ই-মানি
আমরা যখন সাধারণ ব্যাংকে টাকা জমা রাখি, তখন আইনিভাবে আমরা হই সেই ব্যাংকের ‘আমানতকারী’। ব্যাংক আমাদের জমা টাকার নিরাপত্তা দিতে বাধ্য থাকে এবং বছর শেষে নির্দিষ্ট হারে সুদ বা মুনাফা দিতে আইনিভাবে বাধ্য থাকে। কিন্তু মোবাইল ওয়ালেটের দুনিয়ায় আমরা কি সত্যিই আমানতকারী?
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালে যখন মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএস-এর নীতিমালা তৈরি করে, সেখানে দুটি মূল শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছিল। প্রথমত, কোনও মোবাইল ওয়ালেট কোম্পানি একা চলতে পারবে না; তার অন্তত ৫১ শতাংশ মালিকানা থাকতে হবে কোনও না কোনও তদারকি করা ব্যাংকের হাতে। দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মটি হলো, একটি ব্যাংকের ছাতার নিচে থাকলেও ওয়ালেটে রাখা আপনার টাকা কিন্তু ব্যাংকের প্রথাগত আমানত নয়। অ্যাপের ব্যালেন্সে আপনি যে অংকটি দেখছেন, সেটি কেবল একটি কোম্পানির খাতায় ডিজিটাল জমা হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিভাষায় এই জমার নাম ‘ই-মানি’।
দেশের কোটি কোটি সাধারণ গ্রাহক তাদের ওয়ালেটে যে ছোট ছোট অংকের টাকা জমিয়ে রাখেন, তার সমষ্টি দাঁড়ায় শত শত কোটি টাকায়। এই পুরো বিশাল অঙ্কের টাকাটি আলাদাভাবে রাখা থাকে না, এটি একটি সুবিশাল বাণিজ্যিক ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে একত্রিত করে রাখা হয়, যাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষায় বলা হয় ‘ট্রাস্ট ফান্ড’ বা ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট।
নিয়ম অনুযায়ী এই পুকুরসম ট্রাস্ট ফান্ডের জিম্মাদার থাকে এমএফএস প্রতিষ্ঠানটি নিজেই। এখন প্রশ্ন হলো, ব্যাংকে পড়ে থাকা এই বিশাল কোটি কোটি টাকা থেকে ব্যাংক যে বিপুল পরিমাণ সুদ বা বাণিজ্যিক মুনাফা তৈরি করে, তা কোথায় যায়? সেই লভ্যাংশ ভাগাভাগি করে নেয় এমএফএস প্রতিষ্ঠান এবং ওই নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংক। আর যে কোটি কোটি সাধারণ গ্রাহকের টাকায় এই সুদ তৈরি হলো, তারা পান ঠিক শূন্য পয়সা।
এই বিশাল ট্রাস্ট ফান্ডের জিম্মাদারির আইনি ফাঁদ ও প্রশাসনিক ঝুঁকিও কিন্তু কম নয়। অতি সম্প্রতি আমরা নগদের উদাহরণে দেখেছি, কীভাবে তাদের সাবেক কারিগরি অংশীদার প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে জমা রাখা ই-মানির বিপরীতে শত শত কোটি টাকা জামানত বা কোল্যাটেরাল দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বাণিজ্যিক ঋণ তুলে নিয়েছিল। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক অনিয়ম নয়, বরং আমাদের দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি কাঠামোর এক গভীর দুর্বলতা ফুটিয়ে তোলে।
‘বাংলা কিউআর’ ফুটপাতের দোকান তো দূর, সাধারণ মহল্লার দোকানেও পৌঁছুতে পারেনি
লেনদেনের জোড়াতালি ও নগদ টাকার চাহিদা
একটি তথ্য আমরা প্রায়ই সরকারের বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখতে পাই, বাংলাদেশে প্রতিদিন যত প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন হয়, তার প্রায় ৮৩ শতাংশই ঘটে এই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। প্রথম দর্শনে এটি শুনলে যে কারও মনে হতে পারে, বাংলাদেশ বোধহয় পুরোপুরি একটি ‘ক্যাশলেস’ বা ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।
কিন্তু এই পরিসংখ্যানের গভীরে প্রবেশ করলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য ধরা পড়ে। যাকে আমরা বলি সংখ্যার জয়, কিন্তু আসল মূল্যের বা অংকের পরাজয়। প্রতিদিন যত কোটি কোটি লেনদেন হচ্ছে, সেগুলোর যদি আর্থিক মূল্যমান হিসাব করা হয়, তবে দেখা যাবে দেশের মোট অর্থনৈতিক লেনদেনের মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ টাকা আসে এমএফএস ওয়ালেটগুলো থেকে!
কারণটা বুঝতে কোনও বড় অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশের ওয়ালেটগুলোতে মূলত ঘোরে সাধারণ মানুষের অতি প্রয়োজনীয় ছোট ছোট টাকা, গ্রামের মাকে পাঠানো ১,০০০ টাকা, ৫০০ টাকার ই-কমার্স কেনাকাটা, ঘরের বিদ্যুৎ বা গ্যাসের সামান্য বিল দেয়া। আর অর্থনীতির বড় বড় অর্থনৈতিক চাকা, যেমন জমি-জমা কেনাবেচা, বড় বাণিজ্যিক এলসি খোলা, কর্পোরেট পেমেন্ট বা পাইকারি বাজারের কেনাকাটা তার শতভাগই ঘটে প্রথাগত ব্যাংকিং চ্যানেল বা সরাসরি কাগজের টাকায়।
বাস্তবতা হলো, আজ ২০২৬ সালেও দেশের মোট খুচরা অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রায় ৬৫ শতাংশ সরাসরি কাঁচা বা কাগজের নোটে সম্পন্ন হয়। এমনকি আমাদের দেশে জমে ওঠা ই-কমার্স এবং ডিজিটাল কেনাকাটার ক্ষেত্রেও প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রাহক পণ্য হাতে পাওয়ার পর টাকা বা ‘ক্যাশ-অন-ডেলিভারি’ পদ্ধতি বেছে নেন। দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক চিত্রে নজর দিলে দেখা যায়, দোকানে বা বাজারে দাঁড়িয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে কেনাকাটার মূল্য মেটান প্রতি ১০০ জনে মাত্র ১৫ জন।
কেন এমন হচ্ছে? কারণ একটা দুষ্টচক্রে আটকে আছে পুরো সমাজ। পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে ডিজিটাল পেমেন্ট নেয়ার ব্যবস্থা নেই বলে সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে ওয়ালেট থেকে টাকা ক্যাশ-আউট বা নগদ করতে হয়। আর গ্রাহকরা পকেটে কাঁচা টাকা নিয়ে ঘুরছেন বলে সাধারণ দোকানদারদেরও ডিজিটাল হওয়ার বা কিউআর কোড ঝুলানোর কোনও তাড়না থাকে না।
বছরের পর বছর ধরে চলতে চলতে এই চার্জটা আমাদের সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে
এক ওয়ালেট থেকে অন্য ওয়ালেটে দেয়াল কেন?
দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আমাদের দেশে এক অদ্ভুত নিয়ম চালু ছিল, একটি বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে কোনোভাবেই নগদ বা রকেটে সরাসরি টাকা পাঠানো যেত না। আপনি যদি এক ওয়ালেটের টাকা অন্য ওয়ালেটে নিতে চাইতেন, তবে একমাত্র উপায় ছিল এজেন্টের দোকানে গিয়ে প্রথমে ক্যাশ-আউট করে কাঁচা টাকা হাতে নেয়া, তারপর সেই টাকা অন্য ওয়ালেটে ক্যাশ-ইন করা। অর্থাৎ, একই গ্রাহককে মাঝখান থেকে দুইবার সার্ভিস চার্জ বা মাশুল দিতে হতো। এই দেয়াল বা কৃত্রিম বাধাগুলো টিকিয়ে রাখার পেছনে ওয়ালেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় বাণিজ্যিক স্বার্থ ছিল। কারণ দেয়াল ভাঙলে তো ক্যাশ-আউট চার্জের বিশাল আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়!
২০২০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো একটি জাতীয় ইন্টারওপারেবল পেমেন্ট সুইচ বা সুইচিং প্ল্যাটফর্ম চালু করে এই দেয়াল ভাঙার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণকারী অদৃশ্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই সরকারি সেবা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ দুই বছর পর, ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা সরকারি ব্যয়ে চালুর ঘোষণা দেয়া হয় ‘বিনিময়’ নামক নতুন ইন্টারওপারেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল প্রযুক্তিগত ডিজাইনের কারণে এটি সাধারণ মানুষের কাছে আশীর্বাদ না হয়ে উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
বিনামূল্যে আন্তঃলেনদেনের সুবিধা দেয়ার বদলে প্রতিটি ট্রানজেকশনে গ্রাহকের ওপর নতুন করে সার্ভিস ফি চাপিয়ে দেয়া হলো। দেশের সিংহভাগ বাটন ফোন ব্যবহারকারী মানুষ এটি ব্যবহারই করতে পারলেন না। আরও অবাক করার বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বসম্পন্ন এই প্রযুক্তির পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়া হয়েছিল সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ একটি বেসরকারি আইটি প্রতিষ্ঠানের হাতে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, চুক্তিটি তাদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের পর সেই ব্যর্থ ‘বিনিময়’ প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন ঘোষণা দিয়ে বলেছে, ২০২৭ সালের জুলাই মাসের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও নিখরচায় জাতীয় সুইচিং ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করা হবে। আজ ২০২৬ সালের আগস্টে দাঁড়িয়ে যদি আমরা মাঠের বাস্তবতা পর্যালোচনা করি, তবে দেখব চিত্রটা বিন্দুমাত্র বদলায়নি। এক ওয়ালেট থেকে অন্য ওয়ালেটে টাকা পাঠানোর সরাসরি ও সস্তা কোনও উপায় আজও সাধারণ গ্রাহকের হাতে নেই।
ভারত কীভাবে পারল, আমরা কেন পারলাম না?
আমাদের দেশের বিকাশ বা অন্যান্য এমএফএস মডেলটি ২০০৭ সালে আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় সফল হওয়া ‘এম-পেসা’ মডেলকে হুবহু অনুকরণ করে বানানো। নাইরোবির প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক চিন্তাকে সরাসরি এনে বসানো হয়েছিল ঢাকায়। কিন্তু আফ্রিকান মডেলটি ছিল মূলত টেলকো ও এজেন্টের ওপর নির্ভর করে ক্যাশ-আউট চার্জ তুলে মুনাফা করার এক কর্পোরেট রূপ। অথচ আমাদের একেবারে পাশের দেশ ভারত এই ক্ষেত্রে হেঁটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বৈপ্লবিক এক পথে। তারা তিনটি ধাপে নিজেদের পুরো দেশের পেমেন্ট ইকোসিস্টেমকে পুনর্গঠন করে-
প্রথম ধাপ (২০১৪): ভারত সরকার ‘জন ধন যোজনা’ নামক সুবিশাল জাতীয় অভিযানের মাধ্যমে দেশের ৫৩ কোটিরও বেশি মানুষের শূন্য-ব্যালেন্সে মূলধারার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়। এগুলো কোনও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের ওয়ালেট ছিল না, ছিল সরাসরি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের আসল হিসাব।
দ্বিতীয় ধাপ (২০১৬): চালু করা হয় ‘ইউপিআই’ বা ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস। কোনও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান এর মালিক নয়; এটি ভারতের সকল ব্যাংকের অলাভজনক জোট এনপিসিআই-এর তৈরি এক সরকারি ডিজিটাল রাজপথ। এই রাজপথ দিয়ে এক ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি অন্য যেকোনও ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে মুহূর্তে টাকা চলে যায়।
তৃতীয় ধাপ (২০১৯): ভারত সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাংক-টু-ব্যাংক এই সমস্ত লেনদেনে ‘জিরো-এমডিআর’ বা শূন্য শতাংশ মার্চেন্ট ফি ঘোষণা করে। অর্থাৎ, একজন গ্রাহক ১ টাকা পাঠাক বা ১ লাখ টাকা পাঠাক তার কোনও ফি লাগবে না। এমনকি যে দোকানদার টাকাটি গ্রহণ করছেন, তাকেও এক পয়সা সার্ভিস চার্জ দিতে হবে না।
ফলাফল? আজ ভারতে ছোট চা-দোকানি, ডাব বিক্রেতা, সবজিওয়ালা থেকে শুরু করে রাস্তার অটোরিকশায় ঝুলছে কিউআর কোড। গত এক বছরে এই সম্পূর্ণ নিখরচায় তৈরি সরকারি অবকাঠামো দিয়ে পৌনে তিন ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। ভারতে ক্যাশ-আউট বা নগদ টাকা তোলার মানে হলো যেকোনও ব্যাংকের এটিএম থেকে বা অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নিজের টাকা বিনামূল্যে তুলে নেয়া। আর আমাদের দেশে ক্যাশ-আউট করা মানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মানিব্যাগ থেকে চড়া মাশুল গুনে নিজের রক্তঘামের টাকা বের করা।
দেশের কোটি কোটি সাধারণ গ্রাহক তাদের ওয়ালেটে যে ছোট ছোট অংকের টাকা জমিয়ে রাখেন, তার সমষ্টি দাঁড়ায় শত শত কোটি টাকায়
দোকানের কিউআর কোড আর বাড়তি ফি-এর হিসেব
কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘বাংলা কিউআর’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল। নীতিগত উদ্দেশ্যটি ছিল বেশ চমৎকার, দোকানে একাধিক প্রতিষ্ঠানের চার-পাঁচটি আলাদা আলাদা কিউআর কোডের স্টিকার না ঝুলিয়ে একটিমাত্র সর্বজনীন স্টিকার থাকবে, যা দিয়ে যেকোনও ব্যাংক বা ওয়ালেটের অ্যাপ থেকে স্ক্যান করে কেনাকাটার বিল মেটানো যাবে। কিন্তু অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই ‘বাংলা কিউআর’ উদ্যোগটি কেন মাঠপর্যায়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল?
এর পেছনে মূল বাধা হলো ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাহীন বাণিজ্যিক লোভ। ভারতে যেখানে একজন সাধারণ প্রান্তিক বিক্রেতার ক্ষেত্রে পেমেন্ট গ্রহণ করতে ১ পয়সাও কেটে নেয়া হয় না, সেখানে বাংলাদেশে এমএফএস এবং ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা ট্রানজেকশন ফি কেটে নিতে চায়।
এখন সহজ বুদ্ধিতে চিন্তা করুন, যে সাধারণ রাস্তার দোকানদার বা ন্যানো-মার্চেন্ট সারাদিন কষ্ট করে পণ্য বিক্রি করে ৩ থেকে ৫ শতাংশ লাভে চলেন, তিনি কেন কেবল ডিজিটাল পেমেন্ট নেয়ার অপরাধে নিজের কষ্টার্জিত লাভের ১ থেকে ২ শতাংশ ব্যাংকের পকেটে তুলে দেবেন? ফলে ২০২৬ সালের এই আগস্টে এসেও আমরা দেখতে পাই, ‘বাংলা কিউআর’ ফুটপাতের দোকান তো দূর, সাধারণ মহল্লার দোকানেও পৌঁছুতে পারেনি। এটি কেবল বড় শহরের নামীদামী চেইন শপ, সুপারমার্কেট বা বড় ব্র্যান্ডের শোরুমের কাঁচের দরজায় ঝুলানো একটি শো-পিস স্টিকার হয়েই আটকে আছে।
কোন পথে বের হবে বাংলাদেশ?
উৎপাদনশীলতা বা উদ্ভাবনী মেধা ছাড়াই শুধু সাধারণ মানুষের বাধ্যবাধকতাকে জিম্মি করে নিয়ম বানিয়ে টাকা তুলে নেয়ার অর্থনীতিকে গবেষকরা বলেন ‘খাজনা-পুঁজিবাদ’। আমাদের দেশে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক রাজস্ব আয় হাজার হাজার কোটি টাকা, আর নিট মুনাফাও শত শত কোটি টাকা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এই বিশাল মুনাফার সিংহভাগই লভ্যাংশ হিসেবে চলে যায় ওয়ালেটগুলোর পেছনে থাকা বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বহুজাতিক তহবিলের পকেটে। আর মূল লেনদেনের সমস্ত ধকল ও সাড়ে আঠারো টাকার মাশুল বহন করতে হয় আমাদের দেশের খেটে খাওয়া কোটি কোটি মানুষকে। আজকের এই শোষণমূলক বাস্তবতার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে একটি সত্যিকারের ডিজিটাল ও ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়তে হলে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে তিনটি সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপে হাঁটতে হবে-
১. ফ্রি ডিজিটাল রাজপথ তৈরি: ২০২৭ সালের জুলাই মাসের যে সময়সীমা দেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে কোনও রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক আপস করা যাবে না। একটি স্বাধীন ও সর্বজনীন জাতীয় পেমেন্ট সুইচের অধীনে ব্যাংক ও মোবাইল ওয়ালেটের মধ্যে টাকা পারাপার সম্পূর্ণ ফি-মুক্ত বা ফ্রিতে নিশ্চিত করতে হবে।
২. ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের জন্য জিরো-এমডিআর: প্রান্তিক বা ন্যানো-মার্চেন্টদের জন্য ‘বাংলা কিউআর’-এ লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট চার্জ শতভাগ শূন্য ঘোষণা করতে হবে, যেন একজন চা-দোকানি বা ফেরিওয়ালা নিজে থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ক্যাশ টাকার বদলে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে উৎসাহী হন।
৩. ট্রাস্ট ফান্ডের সুদের সঠিক ব্যবহার: মোবাইল ওয়ালেটের পেটে জমা থাকা কোটি কোটি টাকার ট্রাস্ট ফান্ড থেকে অর্জিত সুদের সিংহভাগ অর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর পকেটে যেতে দেয়া যাবে না। সেই সুদের টাকাকে বিশেষ তহবিল বানিয়ে গ্রাহকদের ক্যাশ-আউট চার্জ কমানোর কাজে ব্যবহার করতে বাধ্য করতে হবে।
আমাদের প্রবাসীর পাঠানো সেই বিশ হাজার টাকা দিয়ে নিবন্ধ শুরু হয়েছিল। টাকাটা মালয়েশিয়ার ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে এসেছে ডিজিটাল হয়ে, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পার হয়েছে ডিজিটাল হয়ে, এমনকি প্রবাসীর মোবাইল ওয়ালেটে ঢুকেছে ডিজিটাল হয়ে। কিন্তু একদম শেষ ধাপে এসে, যেখানে গ্রামের মায়ের হাতের স্পর্শ পাওয়ার কথা, ঠিক সেখানে এসে পুরো পেমেন্ট ব্যবস্থা আবার থমকে গিয়ে রূপান্তরিত হলো কাঁচা কাগজের নোটে। আর সেই কাগজ তৈরির মাশুল হিসেবে হাওয়া হয়ে গেল ৩৮০ টাকা।
সমস্যা বিকাশ, নগদ বা অন্য কোনও নির্দিষ্ট সেবা থাকা নিয়ে নয়; প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে এটা সত্যি। আসল মূল সমস্যা হলো দেশে ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কর্তৃক তৈরি কোনও বিকল্প ফ্রি সরকারি রাস্তা বা পাবলিক গুড না থাকা। রাষ্ট্র যদি ভারতের মতো দেশের সকল নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে সর্বজনীন ডিজিটাল পেমেন্টের অবকাঠামো তৈরি না করে, তবে সাধারণ মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির স্বপ্ন কেবল খাতায়-কলমেই রয়ে যাবে; আর প্রবাসীর পাঠানো রক্তঘামের টাকা থেকে এই নিরব প্রাইভেট টোল আদায়ের উৎসব চলতেই থাকবে।





