স্মার্টওয়াচ উপহার দেয়ার আগে জেনে নিন কোনটি কার জন্য
ক.বি.ডেস্ক: স্মার্টওয়াচ এখন শুধু সময় দেখার ডিভাইস নয়; শরীরচর্চা, ঘুমের হিসাব, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, নোটিফিকেশন, কল ও মেসেজ থেকে শুরু করে নানা ধরনের স্মার্ট ফিচারের কারণে এটি হয়ে ওঠেছে দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিপণ্য। তবে কাউকে স্মার্টওয়াচ উপহার দিতে গেলে শুধু ঘড়িটির ফিচার দেখলেই হবে না, যে ব্যক্তি ব্যবহার করবেন, তাঁর হাতে থাকা স্মার্টফোন ও অন্যান্য ডিভাইসের সঙ্গেও সেটি কতটা ভালোভাবে কাজ করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে থাকা বিভিন্ন মডেলের মধ্য থেকে ব্যবহারকারীর ধরন ও ডিভাইস ইকোসিস্টেম বিবেচনায় কয়েকটি স্মার্টওয়াচ উপহার হিসেবে বিশেষভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
বেশিরভাগ মানুষের জন্য: অ্যাপল ওয়াচ এসই ৩
আইফোন ব্যবহারকারীর জন্য স্মার্টওয়াচ উপহার দিতে চাইলে অ্যাপল ওয়াচ এসই ৩ হতে পারে কার্যকর একটি বিকল্প। অ্যাপলের সর্বশেষ ও সবচেয়ে দামি মডেলে থাকা সব সুবিধা সবার প্রয়োজন হয় না। ব্যায়াম ট্র্যাক করা, ঘুম পর্যবেক্ষণ, হার্ট রেট দেখা কিংবা মেসেজের উত্তর দেয়ার মতো দৈনন্দিন কাজের জন্য এটি যথেষ্ট সক্ষম।
এটি ৪০ ও ৪৪ মিমি দুই আকারে পাওয়া যায়। এতে রয়েছে অলওয়েজ-অন-ওলেড ডিসপ্লে, যা সর্বোচ্চ ১,০০০ নিট উজ্জ্বলতা দিতে পারে। হার্ট রেট, ঘুম, সাইকেল ও বিভিন্ন ভায়টালস ট্র্যাক করার সুবিধাও রয়েছে। এতে অ্যাপলের এস১১ চিপের বদলে এস১০ চিপ ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের জন্য এটি এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। নতুন ওয়াচওএস-এর বিভিন্ন স্মার্ট ফিচার ও সিরিভিত্তিক সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এটি সক্ষম।
ব্যাটারি লাইফ প্রায় ১৮ ঘণ্টা। লো পাওয়ার মুড ব্যবহার করলে তা ৩২ ঘণ্টা পর্যন্ত বাড়তে পারে। দ্রুত চার্জিং সুবিধায় ৪৫ মিনিটে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ করা যায়। তবে ইসিজি, উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সি ব্যাকগ্রাউন্ড হার্ট রেট পর্যবেক্ষণ, হাইপারটেনশন অ্যালার্ট, ব্লাড অক্সিজেন অ্যাপ এবং পানির তাপমাত্রা বা গভীরতা মাপার মতো কিছু উন্নত সুবিধা এতে নেই। সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য এসব সুবিধার প্রয়োজন নাও হতে পারে।
ক্রীড়াবিদদের জন্য: অ্যাপল ওয়াচ আল্ট্রা ৪
যিনি নিয়মিত কঠোর শরীরচর্চা করেন, দৌড়ান কিংবা আউটডোর ও অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রমে অংশ নেন, তাঁর জন্য অ্যাপল ওয়াচ আল্ট্রা ৪ বেশি উপযোগী হতে পারে। আল্ট্রা সিরিজ মূলত বেশি টেকসই ডিজাইন, বড় ডিসপ্লে ও দীর্ঘ ব্যাটারি লাইফের ওপর গুরুত্ব দেয়। এতে রয়েছে এস১১ চিপ, উন্নত হার্ট সেন্সর ও হেলথ সেন্সিং সিস্টেম। নতুন রেডিনেস ফিচার ব্যবহারকারীর শরীরের প্রস্তুতি বিবেচনায় নিয়ে ওয়ার্কআউটের মাত্রা নির্ধারণে সহায়তা করে।
অ্যাপলের দাবি অনুযায়ী, এটি প্রায় ৫০ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যাটারি ব্যাকআপ দিতে পারে। ওলেড ডিসপ্লের সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতা ৩,০০০ নিট। সঙ্গে রয়েছে ইসজি, রক্তে অক্সিজেন পর্যবেক্ষণ, ঘুম ট্র্যাকিং,পড়ে যাওয়া সনাক্তকরণ, ইমার্জেন্সি এসওএস এবং সেলুলার সংযোগ। পানির নিচে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এটি বেশ সক্ষম। ঘড়িটি ১০০ মিটার পর্যন্ত পানি প্রতিরোধী এবং ৪০ মিটার পর্যন্ত গভীরতা পরিমাপ করতে পারে।
পিক্সেল ব্যবহারকারীদের জন্য: গুগল পিক্সেল ওয়াচ ৪
গুগল পিক্সেল ফোন ব্যবহারকারীদের জন্য পিক্সেল ওয়াচ সিরিজের ঘড়িই সবচেয়ে স্বাভাবিক পছন্দ। সর্বশেষ মডেল থাকলেও পিক্সেল ওয়াচ ৪ এখনও মূল্য ও ফিচারের দিক থেকে আকর্ষণীয়। ৪১ ও ৪৫ মিমি দুই সংস্করণে পাওয়া যায় ঘড়িটি। অ্যামোলেড ডিসপ্লের সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতা ৩,০০০ নিট। হার্ট রেট, ইসজি, তাপমাত্রা সহ বিভিন্ন সেন্সর রয়েছে এতে।
স্ন্যাপড্রাগন ডব্লিউ৫ জেন ২ চিপের সঙ্গে রয়েছে ২ জিবি মেমোরি এবং ৩২ জিবি স্টোরেজ। ৪১ মিমি মডেলে ৩২৫এমএএইচ এবং ৪৫ মিমি মডেলে ৪৫৫এমএএইচ ব্যাটারি রয়েছে। মডেলভেদে ব্যাটারি ব্যাকআপ ৩০ থেকে ৪০ ঘণ্টা পর্যন্ত পাওয়া যায়। রয়েছে ডুয়াল-ব্যান্ড জিপিএস, জরুরি স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি, জেমিনি ইন্টিগ্রেশন, হেলথ কোচ, পালস না পাওয়ার উপস্থিতি সনাক্তকরণ এবং রেডিনেস স্কোরের মতো ফিচার।
স্যামসাং গ্যালাক্সি ব্যবহারকারীদের জন্য: গ্যালাক্সি ওয়াচ ৮
যার হাতে স্যামসাং গ্যালাক্সি ফোন, তার জন্য গ্যালাক্সি ওয়াচ ৮ হতে পারে উপযোগী উপহার। এতে রয়েছে এক্সিনস ডব্লিউ১০০০ চিপ, ২ জিবি মেমোরি এবং ৩২ জিবি স্টোরেজ। ঘড়িটি ৪০ ও ৪৪ মিমি সংস্করণে পাওয়া যায়; ক্ল্যাসিক সংস্করণ রয়েছে ৪৬ মিমিতে। অ্যামোলেড ডিসপ্লে সর্বোচ্চ ৩,০০০ নিট উজ্জ্বলতা দিতে পারে। অলওয়েজ-অন-ডিসপ্লে চালু রেখেও প্রায় ৩০ ঘণ্টা ব্যাটারি ব্যাকআপ পাওয়ার দাবি করেছে স্যামসাং।
ঘড়িটি আইপি৬৮ রেটেড এবং এতে ইমারজেন্সি এসওএস ও পড়ে যাওয়া শনাক্তকরণ সুবিধা রয়েছে। স্বাস্থ্য ও ফিটনেসের জন্য এতে রয়েছে স্লিপ কোচিং, রানিং কোচ, স্লিপ অ্যাপনিয়া ট্র্যাকিং, স্ট্রিজ অ্যালার্ট এবং সাইকেল ট্র্যাকিং। এনার্জি স্কোর ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন শারীরিক প্রস্তুতি সম্পর্কে ধারণা দেয়। পাশাপাশি গুগল জেমিনি ব্যবহারের সুবিধাও রয়েছে।
অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের ফিটনেসের জন্য: জেমিনি ভেনু ৪
ফিটনেস ও দৌড়ের ক্ষেত্রে জেমিনি-এর স্মার্টওয়াচগুলো বরাবরই আলাদা গুরুত্ব পেয়ে থাকে। যারা স্মার্টওয়াচের চেয়ে স্বাস্থ্য ও শরীরচর্চা ট্র্যাকিংকে বেশি গুরুত্ব দেন, তাঁদের জন্য জেমিনি ভেনু ৪ বিবেচনা করা যেতে পারে। ৪১ ও ৪৫ মিমি দুই সংস্করণেই ওলেড ডিসপ্লে রয়েছে। অলওয়েজ-অন-ডিসপ্লে চালু রাখলে ব্যাটারি প্রায় চার দিন এবং এটি বন্ধ রাখলে সর্বোচ্চ ১২ দিন পর্যন্ত ব্যাকআপ দিতে পারে। হার্ট রেট পর্যবেক্ষণ, ঘুম ও ন্যাপ ট্র্যাকিং, স্লিপ কোচ, দৈনিক ওয়ার্কআউট পরামর্শ, রানিং ও সাইক্লিং কোচ সবই রয়েছে এতে।
পাশাপাশি হার্ট রেট জোন, ক্যালোরি, রিকোভারি টাইম, ম্যাক্সিমাম অক্সিজেন কনজাম্পশন, জিপিএস দূরত্ব, স্ট্রাইড লেন্থ, রানিং পাওয়ার, গ্রাউন্ড কনটাক্ট টাইম এবং সম্ভাব্য রেস টাইমের মতো বিস্তারিত তথ্যও পাওয়া যায়। ভেনু ৪ অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোন দুই প্ল্যাটফর্মেই কাজ করে। তবে কিছু স্মার্ট ফিচার অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা বেশি পাবেন। যেমন অ্যান্ড্রয়েড ফোনে নোটিফিকেশন থেকে টেক্সটের উত্তর দেয়া ও ছবি দেখার সুবিধা রয়েছে, যা আইফোন ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে সীমিত।
কোন ব্যবহারকারীর জন্য কোনটি?
স্মার্টওয়াচ উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রাপকের স্মার্টফোন ও ব্যবহারের ধরন। সাধারণ আইফোন ব্যবহারকারীর জন্য অ্যাপল ওয়াচ এসই ৩, অ্যাথলেট বা আউটডোরপ্রেমীর জন্য অ্যাপল ওয়াচ আল্ট্রা ৪, পিক্সেল ফোন ব্যবহারকারীর জন্য পিক্সেল ওয়াচ ৪ এবং গ্যালাক্সি ফোন ব্যবহারকারীর জন্য গ্যালাক্সি ওয়াচ ৮ বিবেচনা করা যেতে পারে। আর যাদের মূল লক্ষ্য দৌড়, ফিটনেস ও দীর্ঘ ব্যাটারি ব্যাকআপ, তাঁদের জন্য জেমিনি ভেনু ৪ হতে পারে আকর্ষণীয় বিকল্প। স্মার্টওয়াচ উপহার দেয়ার আগে শুধু কোন ঘড়িটি সবচেয়ে বেশি ফিচার দেয় তা দেখার চেয়ে, সেটি কার জন্য এবং কোন ফোনের সঙ্গে ব্যবহার করা হবে এই দুটি বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।





