অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তায় এআইনির্ভর পুলিশিং
ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ: ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সাইবার জালিয়াতি, ডিপফেক, অনলাইন প্রতারণা, আর্থিক অপরাধ, পরিচয় চুরি কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা এসব এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা জোরদারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং ব্যবস্থার ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, প্রযুক্তিনির্ভর এই রূপান্তরের লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত প্রতিক্রিয়া, নির্ভুল তদন্ত, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা। তবে একইসঙ্গে মানবাধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও গণনজরদারির ঝুঁকি নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ডিএমপির ডিজিটাল রূপান্তর
গত ২৯ এপ্রিল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) পুলিশিং আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে নয়টি নতুন ডিজিটাল সেবা ও এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে স্থাপন করা স্মার্ট ক্যামেরাগুলো উন্নত ভিডিও অ্যানালিটিক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, সন্দেহজনক আচরণ ও যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে।
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার ও বিজয় সরণির মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চালু হওয়া এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ সংগ্রহ, নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ এবং ই-প্রসিকিউশন কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে। এতে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবীয় হস্তক্ষেপ কমবে এবং দুর্নীতি বা পক্ষপাতের ঝুঁকিও কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, “আধুনিক ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে উন্নত প্রযুক্তির সংযোজন এখন অপরিহার্য হয়ে ওঠেছে। অপরাধ ক্রমেই জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠছে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। স্মার্ট পুলিশিং এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি প্রয়োজন।”
স্মার্ট নজরদারি ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর অনেকগুলোতেই এআইভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। এসব ক্যামেরা শুধু ভিডিও ধারণই করে না, বরং সন্দেহজনক চলাফেরা, পরিত্যক্ত বস্তু, সহিংস আচরণ কিংবা অস্ত্র শনাক্ত করার সক্ষমতাও রাখে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত ভিডিও রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ, অপরাধীর গতিপথ বিশ্লেষণ এবং জনসমাগমে ঝুঁকি নিরূপণও সম্ভব হবে। এ ছাড়া সেন্সরভিত্তিক গানশট ডিটেকশন প্রযুক্তি গুলির শব্দ শনাক্ত করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে, যা দ্রুত অভিযান পরিচালনায় সহায়তা করবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে স্মার্ট সিটি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এআইনির্ভর নজরদারি প্রযুক্তি যুক্ত করেছে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে সেই মডেলের দিকে এগোচ্ছে।
ডিপফেক ও সাইবার অপরাধ নতুন হুমকি
জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির বিস্তার নতুন ধরনের অপরাধেরও জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা ও নরসিংদীতে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে ডিপফেক ভিডিও তৈরি, জাল সরকারি নথি প্রস্তুত এবং অনলাইন ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি, সামাজিক অস্থিরতা, আর্থিক প্রতারণা ও ব্যক্তিগত মানহানি ঘটানোর ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। এজন্যই সরকার এআই-সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া ডিপফেক তৈরি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, ডিজিটাল চাঁদাবাজি বা বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণায় এআই ব্যবহারের দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে।
আর্থিক অপরাধ শনাক্তে এআই
বাংলাদেশে অর্থপাচার ও আর্থিক জালিয়াতি প্রতিরোধেও এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা জোরদার করা হয়েছে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রিয়েল এস্টেট ও জুয়েলারি খাতের অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তে ডেটা অ্যানালিটিক্স ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত পদ্ধতিতে কোটি কোটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এআইভিত্তিক সিস্টেম সন্দেহজনক লেনদেনের ধরন বিশ্লেষণ করে দ্রুত ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারে। ফলে অর্থপাচার, ভুয়া হিসাব কিংবা জালিয়াতির নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা সহজ হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘বিশেষ করে ব্যাংকিং, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রিয়েল এস্টেট ও জুয়েলারি মার্কেটের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে অর্থপাচার ও আর্থিক জালিয়াতি শনাক্তে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে কঠোর নজরদারি, নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং নিয়ম ও বিধি মেনে চলার ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।’’
নাগরিকবান্ধব ডিজিটাল নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম
সরকার জননিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও অংশগ্রহণমূলক করতে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। ‘হ্যালো সিটি’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিকরা গোপনে সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ, সাইবার অপরাধ বা মাদকসংক্রান্ত তথ্য জানাতে পারছেন। ‘রিপোর্ট টু বিজিবি’ সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সহায়তা করছে।
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে চালু করা হয়েছে ‘হেল্প’ প্ল্যাটফর্ম, যেখানে গণপরিবহনে হয়রানির অভিযোগ জানানো যায়। অভিযোগ পাওয়ার পর তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়। ‘বিডি পুলিশ হেল্পলাইন’-এর মাধ্যমে অনলাইনে জিডি করা এবং ‘৯৯৯ জাতীয় জরুরি সেবা’র মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সহায়তা নেয়ার সুযোগ ইতোমধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে।
সাইবার নিরাপত্তায় বিশেষ ইউনিট
প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর অধীন সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি), বিডিজি ই-গভ সার্ট এবং অন্যান্য বিশেষায়িত ইউনিট কাজ করছে। এসব ইউনিট ডিজিটাল ফরেনসিকস, হ্যাকিং তদন্ত, অনলাইন প্রতারণা শনাক্তকরণ এবং জাতীয় তথ্য অবকাঠামো সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে।
মানবাধিকারকর্মী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এআইভিত্তিক সাইবার ডিফেন্স সিস্টেম চালু হলে সাইবার হামলা শনাক্ত ও প্রতিরোধ আরও দ্রুত হবে। যদিও এআইনির্ভর পুলিশিংকে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবুও এর ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। পর্যাপ্ত নীতিমালা ও জবাবদিহিতা ছাড়া এ ধরনের প্রযুক্তি গণনজরদারি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তির ভুল শনাক্তকরণ, তথ্যের অপব্যবহার, প্রযুক্তিগত পক্ষপাত এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের কারণে নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হতে পারেন বলে আশঙ্কা রয়েছে। এআই ব্যবহারে স্বচ্ছ নীতিমালা, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা, তথ্য সুরক্ষা আইন এবং মানবাধিকারসম্মত নৈতিক কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশে স্মার্ট পুলিশিং আরও বিস্তৃত হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অপরাধ পূর্বাভাস, ড্রোন নজরদারি, বর্ডার সিকিউরিটি এবং ডিজিটাল ফরেনসিকস সব ক্ষেত্রেই এআইয়ের ব্যবহার বাড়বে।
তবে প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করবে এর সঠিক ব্যবহার, দক্ষ জনবল, আইনি কাঠামো এবং নাগরিক আস্থার ওপর। প্রযুক্তি যেন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিক অধিকারও সুরক্ষিত রাখে সেই ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।





