আনুষাঙ্গিক প্রযুক্রির পণ্য

লজিটেকের মালিকানাধীন পাঁচ জনপ্রিয় টেক ব্র্যান্ড

ক.বি.ডেস্ক: কমপিউটার মাউস, কিবোর্ড, ওয়েবক্যাম ও বিভিন্ন ধরনের পিসি পেরিফেরাল তৈরির জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত লজিটেক। ১৯৮১ সালে সুইজারল্যান্ডে যাত্রা করা প্রতিষ্ঠানটি সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি খাতের অন্যতম বড় নাম হয়ে ওঠেছে। নিজেদের উদ্ভাবনের পাশাপাশি কৌশলগত অধিগ্রহণের মাধ্যমে লজিটেক বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্র্যান্ডকে নিজেদের আওতায় এনেছে।

স্ট্রিমিং সফটওয়্যার থেকে শুরু করে গেমিং হেডসেট, স্টুডিও-মানের মাইক্রোফোন এবং ফিটনেস-কেন্দ্রিক ওয়্যারলেস ইয়ারবাড বিভিন্ন খাতে লজিটেকের উপস্থিতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এসব অধিগ্রহণ। এমনকি অনেক সময় পণ্যে লজিটেকের নাম সরাসরি না থাকলেও সেটি হতে পারে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানাধীন কোনও ব্র্যান্ডের তৈরি। চলুন দেখে নেয়া যাক লজিটেকের মালিকানাধীন এমন পাঁচটি উল্লেখযোগ্য টেক ব্র্যান্ড।

স্ট্রিমল্যাবস
অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রিমিং সফটওয়্যারের বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। এই খাতের পরিচিত নাম স্ট্রিমল্যাবস। লাইভ স্ট্রিমিং নিয়ন্ত্রণ, অডিও ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন প্লাগইন এবং ডেস্কটপভিত্তিক স্ট্রিমিং টুলের জন্য প্রতিষ্ঠানটি পরিচিত। স্ট্রিমল্যাবসের সবচেয়ে পরিচিত সফটওয়্যারগুলোর একটি ছিল স্ট্রিমল্যাবস ওবিএস, যা পরবর্তীতে স্ট্রিমল্যাবস ডেস্কটপ নামে পরিচিত হয়। বর্তমানে স্ট্রিমল্যাবস বিভিন্ন স্ট্রিমিং সফটওয়্যার ও টুল নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

২০১৯ সালে প্রায় ৮৯ মিলিয়ন ডলারে নগদ অর্থের বিনিময়ে স্ট্রিমল্যাবস অধিগ্রহণ করে লজিটেক। এর পাশাপাশি কর্মীদের জন্য আরও ২৯ মিলিয়ন ডলারের স্টক অপশন ছিল। এই অধিগ্রহণের মাধ্যমে গেমিং ও লাইভ স্ট্রিমিং খাতে লজিটেকের সফটওয়্যার উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হয়।

লুপডেক
আধুনিক লাইভ স্ট্রিমিং বা কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে শুধু সফটওয়্যারই যথেষ্ট নয়। দ্রুত বিভিন্ন শর্টকাট, ম্যাক্রো, অডিও ইফেক্ট কিংবা ভিজ্যুয়াল কন্ট্রোল ব্যবহারের জন্য বিশেষ হার্ডওয়্যারের প্রয়োজন হয়। এই খাতে পরিচিত একটি নাম লুপডেক। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত লুপডেক স্ট্রিমিং, ভিডিও ও অডিও এডিটিংয়ের জন্য বিভিন্ন কনসোল তৈরি করেছে। এর উল্লেখযোগ্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে লুপডেক লাইভ ও লুপডেক সিটি।

২০২৩ সালে অপ্রকাশিত অর্থের বিনিময়ে লুপডেক অধিগ্রহণ করে লজিটেক। অধিগ্রহণের পরও প্রতিষ্ঠানটি কিছু সময় নিজস্ব ব্র্যান্ডে পণ্য বিক্রি চালিয়ে যায়। তবে ২০২৫ সালে লুপডেক জানায়, তারা নিজস্ব হার্ডওয়্যার উৎপাদন ও বিক্রি থেকে সরে এসে লজিটেকের এমএক্স ক্রিয়েটিভ কনসোল এবং সংশ্লিষ্ট ইকোসিস্টেমে বেশি গুরুত্ব দেবে। আগের লুপডেক পণ্যগুলোর জন্য সহায়তা অব্যাহত থাকলেও নতুন প্রজন্মের লুপডেক হার্ডওয়্যার আর বাজারে আসবে না।

ব্লু মাইক্রোফোনস
পডকাস্ট, লাইভ স্ট্রিমিং, ইউটিউব কনটেন্ট কিংবা সংগীত তৈরির ক্ষেত্রে ভালো মানের অডিও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই খাতে একসময় অত্যন্ত জনপ্রিয় নাম ছিল ব্লু মাইক্রোফোনস। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্লু সাধারণ ব্যবহার থেকে শুরু করে পেশাদার মানের রেকর্ডিংয়ের জন্য বিভিন্ন মাইক্রোফোন তৈরি করত। ব্র্যান্ডটির সবচেয়ে পরিচিত পণ্যের মধ্যে ছিল স্নোবল ও ইয়েতি সিরিজের মাইক্রোফোন। ২০১৮ সালে ১১৭ মিলিয়ন ডলারে ব্লু মাইক্রোফোনস অধিগ্রহণ করে লজিটেক। কয়েক বছর নিজস্ব ব্র্যান্ড হিসেবে কার্যক্রম চালানোর পর ২০২৩ সালে ব্লু ব্র্যান্ডকে ধীরে ধীরে লজিটেকের সঙ্গে একীভূত করা হয়।

বর্তমানে ব্লুর জনপ্রিয় কিছু পণ্য ও প্রযুক্তি লজিটেক এবং বিশেষ করে লজিটেক জি ব্র্যান্ডের আওতায় পাওয়া যায়। অর্থাৎ ব্লু নামটি আগের মতো স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড হিসেবে সক্রিয় না থাকলেও এর জনপ্রিয় মাইক্রোফোন প্রযুক্তি এখনও লজিটেকের পণ্যসারির অংশ।

অ্যাস্ট্রো গেমিং
পেশাদার গেমিং ও ই-স্পোর্টসের জন্য উন্নতমানের হেডসেটের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এই বাজারকে লক্ষ্য করেই দীর্ঘদিন কাজ করেছে অ্যাস্ট্রো গেমিং। গেমিং হেডসেট ও অডিও ডিভাইস তৈরিতে বিশেষভাবে পরিচিত ছিল প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি গেমারদের জন্য বিভিন্ন ধরনের পেরিফেরালও তৈরি করেছে তারা।

২০১৭ সালে ৮৫ মিলিয়ন ডলারে অ্যাস্ট্রো গেমিং অধিগ্রহণ করে লজিটেক। মূল লক্ষ্য ছিল পেশাদার গেমিং হার্ডওয়্যার বাজারে লজিটেক জি ব্র্যান্ডের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে অ্যাস্ট্রোর স্বতন্ত্র ব্র্যান্ডিং অনেকটাই লজিটেক জির সঙ্গে একীভূত করা হয়। বর্তমানে অ্যাস্ট্রো নামটি মূলত লজিটেক জির উচ্চমানের গেমিং হেডসেট সিরিজের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

জেবার্ড
লজিটেকের অডিও প্রযুক্তির বিস্তার শুধু গেমিং বা স্টুডিও-মানের মাইক্রোফোনেই সীমাবদ্ধ নয়। ফিটনেস ও সক্রিয় জীবনধারার ব্যবহারকারীদের জন্য ওয়্যারলেস ইয়ারবাডের বাজারেও প্রবেশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি জেবার্ড অধিগ্রহণের মাধ্যমে। জেবার্ড মূলত খেলাধুলা ও ফিটনেস-কেন্দ্রিক ওয়্যারলেস ইয়ারবাড এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পণ্য তৈরি করত। দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাথলেট ও ব্যায়ামপ্রেমীদের মধ্যে ব্র্যান্ডটির পরিচিতি ছিল।

২০১৬ সালে ৫০ মিলিয়ন ডলারে জেবার্ড অধিগ্রহণ করে লজিটেক। ব্যবসার নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সাপেক্ষে আরও ৪৫ মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থাও ছিল। অধিগ্রহণের পর কয়েক বছর জেবার্ড ব্র্যান্ডের পণ্য বাজারে পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে ব্র্যান্ডটির কার্যক্রম অনেকটাই লজিটেকের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। বর্তমানে লজিটেকের ওয়েবসাইটে জেবার্ড ব্র্যান্ডের নতুন পণ্য দেখা যায় না এবং বাজারে পাওয়া পণ্যগুলোর বেশির ভাগই পুরোনো বা ব্যবহৃত।

একটি সাধারণ কমপিউটার পেরিফেরাল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে লজিটেক এখন গেমিং, স্ট্রিমিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন ও অডিও প্রযুক্তির বড় একটি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। স্ট্রিমল্যাবস, লুপডেক, ব্লু মাইক্রোফোনস, অ্যাস্ট্রো গেমিং এবং জেবার্ডের মতো ব্র্যান্ড অধিগ্রহণে সেই যাত্রা আরও শক্তিশালী হয়েছে।

এর মধ্যে কিছু ব্র্যান্ড এখনও স্বতন্ত্র পরিচয়ে কার্যক্রম চালালেও কয়েকটি পুরোপুরি লজিটেকের মূল ব্র্যান্ড বা লজিটেক জির সঙ্গে একীভূত হয়েছে। ফলে প্রযুক্তিপ্রেমীরা যে পণ্যটি কিনছেন, সেটির গায়ে লজিটেকের নাম না থাকলেও এর পেছনে থাকতে পারে এই সুইস প্রযুক্তি জায়ান্টের মালিকানা।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *