ভূ-রাজনীতি ও টেকবাজারে দেশের আইসিটি খাতের বাস্তবতা
সোহেল মৃধা: বর্তমান বিশ্ব এক অভূতপূর্ব ও বহুমুখী সংকটের আবর্তে আটকা পড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা কেন্দ্রিক সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এখন আর কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ এবং বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়াকে আমূল বদলে দিয়েছে।
আধুনিক বিশ্বের অর্থনীতি এখন আর আগের মতো সহজ নেই; যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনীতিই এখন ব্যবসার গতিপথ নির্ধারণ করছে। বিশ্ববাজার এখন লাভের চেয়ে নিরাপত্তার দিকে বেশি নজর দিচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশের প্রযুক্তি বাজারে। আজকের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমরা যখন এই প্রতিবেদনটি লিখছি, তখন বিশ্ববাজারের অস্থিরতা আমাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে।
উৎপাদন ব্যবস্থার রূপান্তর ও কাঁচামাল সংকট
আইসিটি পণ্য (যেমন: সেমিকন্ডাক্টর, কমপিউটার, চিপ, সার্ভার) তৈরির ক্ষেত্রে আমরা তিনটি বড় পরিবর্তন দেখছি-
কাঁচামালের তীব্র সংকট: মাইক্রোচিপ তৈরির লেজার প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য নিয়ন গ্যাস, যার ৫০ শতাংশ সরবরাহ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। আবার মেমোরি কার্ড ও সেন্সর তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্যালাডিয়াম ধাতুর বৃহত্তম উৎস রাশিয়া। যদিও এসব কাঁচামাল সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে না আসলেও, ইরান-আমেরিকা উত্তেজনায় বিশ্বজুড়ে তেলের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় এই কাঁচামালগুলো প্রক্রিয়াজাত করার খরচ ১৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
উৎপাদন কেন্দ্রের স্থানান্তর (চিপ তৈরির বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা): সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আমেরিকা, ইউরোপ এবং জাপান এখন নিজেদের দেশে চিপ কারখানা তৈরি করছে। এতে পণ্যের নিরাপত্তা বাড়লেও উৎপাদনের গড় ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
লজিস্টিক জটিলতা ও সরবরাহ শৃঙ্খলার বিঘ্ন: বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগর। ইরান-আমেরিকা উত্তেজনায় এই রুটে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় জাহাজগুলোকে এখন আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে। এতে এশিয়া থেকে বাংলাদেশে পণ্য পৌঁছাতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় বেশি লাগছে এবং কনটেইনার ভাড়া ও বিমা খরচ ১৫০ শতাংশ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণ: সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতা
বর্তমানে আইসিটি বাজারের চাহিদা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে
এআই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদা: সাধারণ পণ্যের চাহিদা কমলেও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিপ ও সার্ভারের জন্য বিশ্বজুড়ে কাড়াকাড়ি চলছে। বড় কোম্পানিগুলো সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার আগেভাগেই মজুদ করে রাখছে, যা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
ভোক্তা পর্যায়ে অনীহা ও মূল্যস্ফীতির প্রভাব: মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলার সংকটের কারণে বাংলাদেশে ল্যাপটপ ও কমপিউটারের খুচরা মূল্য গত এক বছরে ৩০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন নতুন ডিভাইস কেনার চেয়ে পুরনোটা বেশিদিন ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এর ফলে ফ্রিল্যান্সিং ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার উৎস বা রেমিট্যান্সের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাস্তবতা হলো, নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে।
সাংগঠনিক স্থবিরতা ও নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা।
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মূল চালিকাশক্তি যেমন- বাংলাদেশ কমপিউটার সমিতি (বিসিএস), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) এবং ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) বর্তমানে এক কঠিন সাংগঠনিক ক্রান্তিকাল পার করছে। যদিও বিসিএস ও আইএসপিএবি নতুন নেতৃত্ব পেয়েছে।
প্রতিনিধিত্বের অভাব: অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন বা আইনি জটিলতায় অনেক সংগঠনেই বর্তমানে নিয়মিত নির্বাচিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি বা সক্রিয় নেতৃত্ব নেই। নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে আইসিটি খাতের সমস্যাগুলো যেমন বিশেষ ডলার কোটা বা আমদানিতে বিশেষ ছাড়ের দাবি জোরালোভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না।
কার্যকর তদারকির অনুপস্থিতি: প্রতিনিধিহীনতার কারণে আমদানিকারকরা এলসি খুলতে গিয়ে এককভাবে লড়াই করছেন। সংগঠনগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারায় আন্তর্জাতিক ভেন্ডরদের সঙ্গে দর কষাকষি ব্যাহত হচ্ছে।
নীতিনির্ধারণী চ্যালেঞ্জ ও কৌশলগত অবস্থান
বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল রুপান্তর গড়তে স্থানীয় অ্যাসেম্বলিং শিল্পে জোর দিলেও বর্তমান বৈশ্বিক ধাক্কা সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে-
পলিসি রিফর্ম: সরকারকে হার্ডওয়্যারকে বিলাসী পণ্য তালিকা থেকে বের করে জরুরি সেবা বা অপরিহার্য পণ্য হিসেবে ঘোষণা করতে এখনই সাহসী হতে হবে।
রাজস্ব ও শুল্ক সমন্বয়: শিক্ষা ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের জন্য ব্যবহৃত ডিভাইসের ওপর শুল্ক সাময়িকভাবে কমিয়ে সমন্বয় করা জরুরি।
সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি: হার্ডওয়্যারের উচ্চমূল্যের কারণে বাজারে নিম্নমানের বা ক্লোন পণ্যের অনুপ্রবেশ বাড়তে পারে, যা জাতীয় ডেটা নিরাপত্তা ও ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
উত্তরণের পথ: সিডিসিআরএ-এর কৌশলগত সুপারিশ
ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম (সিডিসিআরএ) বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ প্রদান করেছে-
জাতীয় বাফার স্টক গঠন: অন্তত ৬ মাসের প্রয়োজনীয় চিপ ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের একটি সরকারি মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
চিপ ডিজাইন ও ফ্যাবল্যাস শিল্পে বিনিয়োগ: শুধুমাত্র আমদানিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ফ্যাবল্যাস চিপ ডিজাইনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমে।
রিফারবিশড বাজার নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা: সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় গ্রেড-এ রিফারবিশড পণ্যের জন্য একটি স্বচ্ছ আইনি ও মান নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা দ্রুত তৈরি করতে হবে।
মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব নিশ্চিতকরণ: আইসিটি সংগঠনগুলোতে অতি দ্রুত স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে যাতে তারা বৈশ্বিক সংকটে সরকারের সঙ্গে সমান্তরালভাবে কাজ করতে পারে।
আগামীর প্রস্তুতি ও দূরদর্শী পদক্ষেপ
যুদ্ধ এখন আর কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আপনার হাতের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে অফিসের সার্ভার পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য এখন কেবল ব্যবসার বিষয় নয়, এটি এখন বৈশ্বিক রাজনীতির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। প্রশ্ন জাগে, লক্ষ লক্ষ উদ্যোক্তা যারা একটি স্মার্ট ইকোসিস্টেমের স্বপ্ন দেখছে, এই বৈশ্বিক ঝড়ে তাদের সুরক্ষা দেবে কে? যদি তাইওয়ান প্রণালীতে বড় কোনো সংঘর্ষ শুরু হয়, তবে বিশ্বের ৬০ শতাংশ উন্নত চিপের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে এবং পুরো বিশ্ব ভয়াবহ প্রযুক্তিগত মন্দায় পড়বে।
বাংলাদেশের জন্য এখনকার চ্যালেঞ্জ হলো আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানো এবং একটি স্মার্ট ও দূরদর্শী লজিস্টিক রোডম্যাপ তৈরি করা। সঠিক সময়ে সাহসী সিদ্ধান্ত ও দক্ষ নেতৃত্বই পারে আমাদের এই বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত ঝড় থেকে সুরক্ষিত রাখতে। আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, একজন তরুণ ফ্রিল্যান্সার যখন একটি ল্যাপটপের জন্য দ্বিগুণ মূল্য দিচ্ছে, তখন আসলে তার স্বপ্নটাই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এই লেখাটি সেই রূঢ় বাস্তবতারই প্রতিফলন।
তথ্যসূত্র: গ্লোবাল ডেটা- ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন এবং আইইএ; পলিসি ও বাজার বিশ্লেষণ: সিডিসিআরএ; মাঠ পর্যায়ের তথ্য: বাংলাদেশের আইটি রিটেইল মার্কেট সার্ভে (২০২৪-২৬)।





