অন্যান্য মতামত

অরাজনৈতিক বেসিস ও নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ

ইকবাল আহমেদ ফখরুল হাসান (রাসেল): ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনোই কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না, কিংবা কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শ আমাকে পরিচালিত করেনি। স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় কোনও পর্যায়েই আমি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম না। আমার পুরো সময়টিই কেটেছে পড়াশোনা এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনী দিয়ে। প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কখনোই আমার মনে হয়নি যে রাজনীতি করা আমার জন্য প্রয়োজনীয়। তবে আমি এটিও বিশ্বাস করি, সবার ক্ষেত্রে ব্যাপারটি এক রকম হবে না- প্রযুক্তি ব্যবসা করার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতি যারা করতে পারেন তারা আমার চাইতে দক্ষই হবেন।

প্রায় ছয় মাস বাংলাদেশ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)- এর পরিচালনা পর্ষদে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই সময়ও আমার অবস্থান একই ছিল, যেখানে কোনও সিদ্ধান্ত আইসিটি ইন্ডাস্ট্রি ও সদস্যদের জন্য ভালো মনে হয়েছে, সেটি গ্রহণ করেছি। আবার যেখানে কোনও সিদ্ধান্ত এই খাতের জন্য ক্ষতিকর মনে হয়েছে, সেখানে কোনও দ্বিধা ছাড়াই তার বিরোধিতা করেছি। আপনাদের কাছে পরিচালক হিসেবে আমার নেতৃত্বের মূল্যায়ন আছে বলে আমি মনে করি। আমার কাছে ব্যক্তি বা দল নয়, বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নেয়া এবং এই ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থে কাজ করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বেসিস-এর মতো একটি সংগঠনের জন্য সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের কোনও বিকল্প নেই

বেসিস- এর জন্ম যে উদ্দেশ্যে
আমি সব সময়ই বেসিসকে একটি অরাজনৈতিক, পেশাদার এবং উদ্যোক্তাদের সংগঠন হিসেবে দেখে এসেছি। দেশের আইসিটি খাতের স্বপ্নদ্রষ্টারা অনেক দূরদর্শী চিন্তা থেকেই এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও আইসিটি শিল্পকে এগিয়ে নেয়া, উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। তাই বেসিস-এর পরিচয় সব সময়ই একটি মেধাভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠনের, কোনও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের নয়।

রাজনৈতিক না হয়ে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক
একটি ব্যবসায়ী সংগঠন হিসেবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেই হয়। নীতিমালা, ক্যাশ ইনসেনটিভ, কর-সংক্রান্ত বিষয়, রপ্তানি, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, বিদেশি বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা আইসিটি শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান এসব ক্ষেত্রেই সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। তাই সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা কোনও রাজনৈতিক বিষয় নয়; এটি সদস্যদের স্বার্থ রক্ষা এবং ইন্ডাস্ট্রি উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

বেসিস-এর পরিচয় সব সময়ই একটি মেধাভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠনের, কোনও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের নয়

বেসিস পরিচালকদের দায়িত্ব
বেসিস পরিচালকদের কাজ শুধু বোর্ড মিটিংয়ে অংশ নেয়া নয়। সদস্যদের জন্য কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা, নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে অংশগ্রহণ, পর্যালোচনা ও সদস্য তথা ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থ রক্ষা, ইনসেনটিভ ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সংক্রান্ত সুবিধা নিয়ে কাজ করা, দেশি-বিদেশি এক্সপো ও ট্রেড মিশনে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা, সদস্যদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করে নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি করাও পরিচালনা পর্ষদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বেসিস-এর আসল শক্তি
আজ বেসিসে প্রায় ৩,০০০ সদস্যপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ১০,০০০ তরুণ উদ্যোক্তা এবং ৩ লক্ষেরও বেশি মেধাবী কর্মকর্তা ও কর্মচারী। তারা প্রতিদিন প্রযুক্তি, সফটওয়্যার এবং আইটি সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। এই কমিউনিটির বেশিরভাগই প্রযুক্তিনির্ভর মানুষ। তাই তারা নেতৃত্ব নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা এবং কাজ করার সক্ষমতাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।

সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা কোনও রাজনৈতিক বিষয় নয়; এটি সদস্যদের স্বার্থ রক্ষা এবং ইন্ডাস্ট্রি উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য

ব্যক্তিস্বার্থের জন্য নয়
১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত বেসিস-এর পরিচালনা পর্ষদে ৫০ জনেরও বেশি পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, তাঁদের অধিকাংশই কখনও ব্যক্তিস্বার্থে এই দায়িত্ব নেননি। তারা এই ইন্ডাস্ট্রি, এই সংগঠন এবং সদস্যদের জন্য কিছু করার ইচ্ছা নিয়েই নেতৃত্বে এসেছিলেন। একজন পরিচালকের পদ আমার কাছে কোনও ব্যক্তিগত পরিচয় বা সুবিধা অর্জনের জায়গা নয়; এটি একটি দায়িত্ব এবং সদস্যদের বিশ্বাসের প্রতিফলন।

গত দুই বছরের শিক্ষা
গত দুই বছর আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তে প্রশাসক ও সহায়ক কমিটি দিয়ে একটি সদস্যভিত্তিক সংগঠনকে দীর্ঘদিন পরিচালনা করা কতটা কঠিন, সেটা আমরা দেখেছি। সহায়ক কমিটির সদস্যরা নিশ্চয়ই এই বাস্তবতাটা সবচেয়ে কাছ থেকে অনুভব করেছেন। অনেক সিদ্ধান্তের জন্য নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের ম্যান্ডেট দরকার হয়, অনেক উদ্যোগও সেই কারণে এগোতে পারে না। এই অভিজ্ঞতা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে বেসিসের মতো একটি সংগঠনের জন্য সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের কোনও বিকল্প নেই।

আমার কাছে ব্যক্তি বা দল নয়, বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নেয়া এবং এই ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থে কাজ করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

নির্বাচনই সমাধান
সরকার নিযুক্ত প্রশাসকের কাজ কোনও ব্যবসায়ী সংগঠনকে দীর্ঘদিন পরিচালনা করা নয়। তাদের মূল দায়িত্ব হলো সংগঠনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করে দায়িত্ব নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের হাতে তুলে দেয়া। যারা এই সময়ে বিভিন্ন সহায়ক কমিটির মাধ্যমে কাজ করেছেন, তারাও নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছেন যে নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ ছাড়া বেসিসকে তার পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই যাঁদের নেতৃত্ব দেয়ার সামর্থ্য আছে, তারা নির্বাচনে আসুন। নিজেদের পরিকল্পনা সদস্যদের সামনে তুলে ধরুন। সদস্যরা যদি আপনাকে যোগ্য মনে করেন, তাহলে অবশ্যই তারা আপনাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন।

সর্বোপরি, বেসিস আমাদের সবার প্রাণের সংগঠন। এখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে, নির্বাচনও হবে। কিন্তু আমাদের সবার লক্ষ্য একটাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও আইসিটি শিল্পকে আরও শক্তিশালী করা। আমি বিশ্বাস করি, একটি অরাজনৈতিক, পেশাদার, সদস্যকেন্দ্রিক এবং সদস্যদের ভোটে পরিচালিত বেসিসই সেই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি। এই ঐতিহ্য, এই সংস্কৃতি এবং এই গণতান্ত্রিক চর্চা আমাদের সবাইকে মিলেই রক্ষা করতে হবে।

লেখক: ইকবাল আহমেদ ফখরুল হাসান (রাসেল)- প্রতিষ্ঠাতা, ডিভাইন আইটি লিমিটেড

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *