রানারদের জন্য কোন গ্যালাক্সি ওয়াচ সেরা? আল্ট্রা নাকি আল্ট্রা২
একসময় দৌড়ানোর সময় হাতে থাকা ঘড়ির প্রধান কাজ ছিল শুধু সময় মাপা। কত মিনিটে কত কিলোমিটার দৌড়ানো হলো এই হিসাবই ছিল রানারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ২০০৩ সালের দিকে বাজারে জিপিএস সুবিধাযুক্ত ঘড়ি আসার পর বদলে যায় দৌড়ের পারফরম্যান্স ট্র্যাকিংয়ের ধারণা। দূরত্ব, রুট ও গতির হিসাব রাখা সম্ভব হয় আরও নির্ভুলভাবে।
সময়ের সঙ্গে জিপিএস প্রযুক্তি যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনি স্মার্টওয়াচও হয়ে ওঠেছে আরও আধুনিক ও বহুমুখী। এখন একটি স্মার্টওয়াচ দিয়েই দৌড়ের দূরত্ব ও গতি মাপার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা, হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণ, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন ধরনের ওয়ার্কআউট ট্র্যাক করা যায়।
স্যামসাং-এর গ্যালাক্সি ওয়াচ সিরিজেও রানারদের জন্য রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। বিশেষ করে গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা এখনও দৌড়বিদদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য মডেল। ২০২৪ সালে বাজারে আসা এই ঘড়িটি নতুন গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা২-এর তুলনায় কম মূল্যে পাওয়া গেলেও রানিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বেশিরভাগ মৌলিক সুবিধা এতে রয়েছে।
গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা বনাম আল্ট্রা২
নতুন গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা২-এ রানারদের জন্য কিছু বাড়তি সুবিধা যোগ করা হয়েছে। এটি আগের মডেলের তুলনায় কিছুটা পাতলা এবং এতে আরও উজ্জ্বল ডিসপ্লে রয়েছে। পাশাপাশি নতুন ট্রায়াল রানিং মোড যুক্ত হয়েছে, যা পাহাড়ি বা দুর্গম পথে দৌড়ানো ব্যক্তিদের জন্য বিশেষভাবে কাজে আসতে পারে।
তবে শুধু নিয়মিত রানিং ও পারফরম্যান্স ট্র্যাকিংয়ের জন্য স্মার্টওয়াচ ব্যবহার করতে চাইলে গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা এখনও যথেষ্ট সক্ষম। বিশেষ করে আল্ট্রা২-এর মূল্য প্রায় ৭০০ ডলার হওয়ায় বাজেটের বিষয়টি বিবেচনা করলে আগের প্রজন্মের মডেলটি অনেকের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। অন্যদিকে যারা নিয়মিত পাহাড়ি ট্রেইলে দৌড়ান এবং এ ধরনের পরিবেশে রুট ট্র্যাকিংয়ের বাড়তি সুবিধা চান, তাদের কাছে আল্ট্রা২-এর নতুন ফিচারগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ডুয়াল-ফ্রিকোয়েন্সি জিপিএস
রানারদের জন্য গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ডুয়াল-ফ্রিকোয়েন্সি জিপিএস। বিশেষ করে শহরের বাইরে, গ্রামাঞ্চলে কিংবা অপরিচিত এলাকায় দৌড়ানোর সময় সঠিক দূরত্ব ও রুটের হিসাব রাখতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ।
ঘড়িটি এল১ এবং এল৫ দুই ধরনের জিপিএস ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে। দুটি আলাদা সিগন্যাল থেকে তথ্য নেয়ার মাধ্যমে অবস্থান নির্ণয় ও রুট ট্র্যাকিং আরও নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হয়। ২০২৪ সালে গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা উন্মোচনের সময় এটি ছিল স্যামসাংয়ের প্রথম গ্যালাক্সি স্মার্টওয়াচ, যাতে ডুয়াল-ফ্রিকোয়েন্সি জিপিএস প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়। নতুন গ্যালাক্সি আল্ট্রা২-তেও এই প্রযুক্তি রয়েছে। ফলে দুই মডেলের ক্ষেত্রেই শহরের বাইরে বা তুলনামূলক জটিল পরিবেশে দৌড়ের রুট ও দূরত্ব ট্র্যাক করার সুবিধা পাওয়া যায়।
রোদেও দেখা যাবে ডিসপ্লে
দিনের বেলায় দৌড়ানোর ক্ষেত্রে স্মার্টওয়াচের ডিসপ্লে কতটা উজ্জ্বল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তীব্র রোদে স্ক্রিনের তথ্য পড়তে সমস্যা হলে গতি, দূরত্ব বা সময় সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। গ্যালাক্সি আল্ট্রা২-এর ডিসপ্লে দিনের আলোতেও যথেষ্ট দৃশ্যমান। ফলে প্রচণ্ড রোদের মধ্যেও দৌড়ের সময় স্ক্রিনে প্রয়োজনীয় তথ্য দেখা সম্ভব। যদিও আল্ট্রা২-এর ডিসপ্লে আগের মডেলের তুলনায় আরও উজ্জ্বল, নিয়মিত দিনের বেলার রানিংয়ের জন্য আল্ট্রা-এর স্ক্রিনও কার্যকর।
গরম-ঠান্ডায়ও ব্যবহারযোগ্য
বাংলাদেশের মতো গরম আবহাওয়ায় নিয়মিত দৌড়ানো ব্যক্তিদের জন্য স্মার্টওয়াচের তাপমাত্রা সহনশীলতাও বিবেচনার বিষয়। গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা মাইনাস ৪ থেকে ১৩১ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার মধ্যে ব্যবহারের জন্য তৈরি। আল্ট্রা২-তেও একই তাপমাত্রা পরিসরে কাজ করার সক্ষমতা রয়েছে। ফলে গরম কিংবা ঠান্ডা বিভিন্ন পরিবেশে দৌড়ের সময় ঘড়িটি ব্যবহার করা সম্ভব। বিশেষ করে যারা শুধু জিম বা ট্রেডমিলে নয়, বাইরেও নিয়মিত দৌড়ান, তাদের জন্য এই সক্ষমতা বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
রানিং কোচ দিয়ে তৈরি হবে ব্যক্তিগত পরিকল্পনা
নতুন করে দৌড় শুরু করেছেন কিংবা দীর্ঘদিন ধরে রানিং করেও পারফরম্যান্সে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না, এমন ব্যবহারকারীদের জন্য স্যামসাংয়ের রানিং কোচ ফিচারটি কার্যকর হতে পারে। গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা-এ স্যামসাং হেলথ অ্যাপের এক্সারসাইজ বিভাগ থেকে রানিং কোচ। এরপর ব্যবহারকারীর দৌড়ের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে কিছু তথ্য দিতে হয়। সবশেষে ১২ মিনিটের একটি পরীক্ষামূলক দৌড়ের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সক্ষমতার একটি প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করে অ্যাপটি।
এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রানিং ব্যবহারকারীর সক্ষমতা ও ফিটনেস লেভেল অনুযায়ী একটি প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করে। ফলে প্রত্যেক ব্যবহারকারীর জন্য একই ধরনের রুটিন না দিয়ে ব্যক্তিগত সক্ষমতার ভিত্তিতে দৌড়ের পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়। গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা২-তেও রানিং কোচ সুবিধা রয়েছে।
ব্যাটারি লাইফ কেমন
দীর্ঘ সময় দৌড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যাটারি লাইফও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের পাশাপাশি গান শোনা বা অন্যান্য ফিচার ব্যবহার করলে স্মার্টওয়াচের ব্যাটারি তুলনামূলক দ্রুত শেষ হতে পারে। গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা-এর সাধারণ ব্যবহারে এক থেকে তিন দিন পর্যন্ত ব্যাটারি ব্যাকআপ পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বিভিন্ন ব্যবহারকারী জানিয়েছেন। আর জিপিএস ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় হাইকিং বা ট্রেনিংয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যাটারি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
দৌড়ের সময় মিউজিক প্লে করলেও ব্যাটারি নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়েননি, এমন অভিজ্ঞতাও কিছু ব্যবহারকারী জানিয়েছেন। তবে প্রকৃত ব্যাটারি ব্যাকআপ ব্যবহার, জিপিএস, স্ক্রিন, মিউজিক সহ বিভিন্ন সেটিংসের ওপর নির্ভর করবে।
কোন গ্যালাক্সি ওয়াচ বেছে নেবেন
রানিংকে কেন্দ্র করে স্মার্টওয়াচ বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা এখনও বেশ সক্ষম একটি মডেল। ডুয়াল-ফ্রিকোয়েন্সি জিপিএস, উজ্জ্বল ডিসপ্লে, রানিং কোচ এবং ভালো ব্যাটারি ব্যাকআপ রানারদের প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ ফিচারগুলো এতে রয়েছে।
অন্যদিকে গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা২ একই ভিত্তির ওপর আরও উজ্জ্বল ডিসপ্লে, কিছুটা পাতলা নকশা এবং ট্রায়াল রানিং-এর মতো নতুন সুবিধা যোগ করেছে। তাই পাহাড়ি ট্রেইল বা আরও বিশেষায়িত রানিংয়ের প্রয়োজন থাকলে আল্ট্রা২-এর বাড়তি ফিচারগুলো বিবেচনায় আসতে পারে।
তবে নিয়মিত শহর, গ্রামাঞ্চল বা সাধারণ রুটে দৌড়ানো এবং পারফরম্যান্স ট্র্যাক করাই যদি মূল লক্ষ্য হয়, তাহলে আল্ট্রা-এর ফিচার সেট এখনও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। ফলে নতুন মডেলের সব সুবিধা প্রয়োজন না হলে আগের প্রজন্মের এই ঘড়িটি রানারদের জন্য একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।





