প্রতিবেদন

দেশে বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা, কমছে ব্যবহারের খরচ

শুল্কছাড়, জ্বালানি সাশ্রয় ও সরকারি নীতিগত সহায়তায় বাংলাদেশের গাড়ির বাজারে বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা। চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণ, ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং নতুন নতুন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের প্রবেশে সম্ভাবনাময় হয়ে ওঠছে দেশের ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) বাজার।

ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ (তুষার): পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পরিবহনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্য, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং পরিবেশদূষণ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি)। একসময় বিলাসবহুল ও সীমিতসংখ্যক মানুষের ব্যবহারের যান হিসেবে বিবেচিত হলেও শুল্কসুবিধা, নীতিগত সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর বাজার সম্প্রসারণের ফলে এখন ব্যক্তিগত গাড়ির ক্রেতাদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠছে এই প্রযুক্তি।

দেশে সবুজ পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা, টেকসই গাড়িশিল্পের বিকাশ এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকারও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার উৎসাহিত করছে। অন্যদিকে প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির তুলনায় কম পরিচালন ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা ক্রেতাদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

বৈদ্যুতিক গাড়িতে শুল্কসুবিধা, কমছে আমদানি ব্যয়
বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার সম্প্রসারণে শুল্ক ও করকাঠামোয় পরিবর্তন এনেছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক গাড়িতে প্রচলিত অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন না থাকায় এসব গাড়ির আমদানি শুল্ক নির্ধারণে সিলিন্ডার ধারণক্ষমতা বা সিসির পরিবর্তে অন্যান্য প্রযোজ্য মানদণ্ডের পাশাপাশি শুল্কায়নযোগ্য মূল্য বিবেচনা করা হয়।

বর্তমান করকাঠামোয় ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের আমদানিকৃত বৈদ্যুতিক গাড়ির মোট করভার (টিটিআই) ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ করা হয়েছে। ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের গাড়ির ক্ষেত্রে করভার নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০ শতাংশ। একই সঙ্গে ১ হাজার ৮০০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিনবিশিষ্ট প্লাগ-ইন হাইব্রিড বৈদ্যুতিক গাড়ির (পিএইচইভি) করভার কমিয়ে ৭৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ করা হয়েছে।

শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতেই নয়, চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও দেয়া হচ্ছে বিশেষ সুবিধা। দেশব্যাপী দ্রুত চার্জিং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ও কর শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। অন্যদিকে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসি ইঞ্জিনবিশিষ্ট প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির মোট করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে করনীতির দিক থেকেও বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে যাচ্ছে।

প্রতি কিলোমিটারে খরচ মাত্র দেড় থেকে আড়াই টাকা
বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ার অন্যতম বড় কারণ পরিচালন ব্যয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যের ওঠানামা এবং দেশের বাজারে পেট্রোল ও অকটেনের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব।

শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, প্রচলিত অকটেনচালিত গাড়ি চালাতে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ১২ থেকে ১৫ টাকা খরচ হয়। বিপরীতে চার্জ দেয়া বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে একই দূরত্ব অতিক্রম করতে খরচ হয় মাত্র ১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ জ্বালানিচালিত গাড়ির তুলনায় বৈদ্যুতিক গাড়িতে প্রতি কিলোমিটারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব। প্রতিদিন দীর্ঘ দূরত্বে গাড়ি ব্যবহার করেন, এমন ব্যক্তিদের জন্য এ সাশ্রয় দীর্ঘ মেয়াদে বড় সুবিধা তৈরি করতে পারে।

পরিচালন ব্যয়ের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণেও এগিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি। প্রচলিত গাড়িতে থাকা জটিল অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন, গিয়ারবক্স, রেডিয়েটর, পিস্টন ও স্পার্ক প্লাগের মতো যন্ত্রাংশ বৈদ্যুতিক গাড়িতে থাকে না। ফলে এসব যন্ত্রাংশের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনও নেই। প্রচলিত গাড়িতে প্রতি ৫ হাজার কিলোমিটার পরপর ইঞ্জিন অয়েল বা মবিল, এয়ার ফিল্টার ও অয়েল ফিল্টার পরিবর্তন করতে হয়। বৈদ্যুতিক গাড়িতে এ ধরনের নিয়মিত ব্যয় এড়ানো যায়। যদিও ব্রেক প্যাড, টায়ার, কুলিং সিস্টেম ও অন্যান্য কিছু যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন হয়, তবু সামগ্রিকভাবে এসব গাড়ির নিয়মিত সার্ভিসিং ব্যয় তুলনামূলক কম।

বাংলাদেশের বাজারে আসছে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ইভি
ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ির মডেল ও ব্র্যান্ডের সংখ্যাও বাড়ছে। বিওয়াইডি, চাঙ্গান ডিপাল, এমজির পাশাপাশি চীনের জিএসি ও ডংফেং, জার্মানির বিএমডব্লিউ ও অডি, মার্সিডিজ-বেঞ্জের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক গাড়ি দেশের বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো অনুমোদিত পরিবেশকদের মাধ্যমে দেশের বাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি করছে।

শোরুম থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাজারে নির্বাচিত কয়েকটি মডেলের তালিকাভুক্ত মূল্য হলো বিওয়াইডি সিল ৫ ডায়নামিক এর মূল্য ৩৫ লাখ টাকা। বিওয়াইডি সিলায়ন ৫ এসেনশিয়াল এর মূল্য ৪৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা। বিওয়াইডি সিল ৬ প্রিমিয়াম পিএইচইভি এর মূল্য ৫২ লাখ টাকা। বিওয়াইডি অ্যাটো ৩ সুপিরিয়র এর মূল্য ৫৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। চাঙ্গান ডিপাল এস০৫ এর মূল্য ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। চাঙ্গান ডিপাল এস০৭ এসইউভি এর মূল্য ৫৭ লাখ টাকা। এমজি জেডএস ইভি এর মূল্য ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা।

জিএসির এআইওএন ওয়াই এর মূল্য ৫০ লাখ টাকা। এআইওএন ভি এর মূল্য ৬২ লাখ টাকা। ডংফেংয়ের নামি বক্স এর মূল্য ৩৪ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। বিএমডব্লিউর আই৫ ইড্রাইভ৪০ সংস্করণের মূল্য ২ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং এম৬০ এক্সড্রাইভ সংস্করণের মূল্য ২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। অডির ই-ট্রন এর মূল্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এ ছাড়া মার্সিডিজ-বেঞ্জের ইকিউএ, ইকিউবি, ইকিউই, ইকিউএস, ইকিউই এসইউভি ও ইকিউএস এসইউভির মতো বৈদ্যুতিক মডেলও পাওয়া যাচ্ছে।

মূল্যের পাশাপাশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে ব্যাটারির ওয়ারেন্টিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমদানিকারকেরা উচ্চ ভোল্টেজের লিথিয়াম ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক মোটরের জন্য আট বছর অথবা ১ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত প্রস্তুতকারক-প্রদত্ত ওয়ারেন্টি দিচ্ছেন। তবে মডেল ও প্রস্তুতকারকভেদে ওয়ারেন্টির শর্তাবলিতে পার্থক্য থাকতে পারে।

গাড়ি নিবন্ধন ও বার্ষিক খরচেও সুবিধা
দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধনের জন্য বিআরটিএর বিদ্যমান ব্যবস্থার আওতায় নম্বরপ্লেট দেয়া হচ্ছে। প্রচলিত অকটেনচালিত গাড়ির তুলনায় বৈদ্যুতিক গাড়ির বার্ষিক ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেস ফি প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কম বলে জানা গেছে। সরকারি পর্যায়েও পরিবেশবান্ধব গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নতুন গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করার নীতিগত উদ্যোগ রয়েছে।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি পরিবহন ব্যবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমার পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজে জ্বালানি ব্যয়ও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়লে বেসরকারি খাত ও সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যেও এ প্রযুক্তি সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হবে।

ব্যাটারি প্রযুক্তি ও পুনর্ব্যবহারে গুরুত্ব
বৈদ্যুতিক গাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এর ব্যাটারি। গাড়ির মূল্য, একবার চার্জে চলার দূরত্ব, চার্জিং সময় এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার সবকিছুর ওপর ব্যাটারির প্রযুক্তি ও সক্ষমতা প্রভাব ফেলে। ব্যাটারির নিরাপত্তা ও দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পরিবেশগত মানদণ্ডের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। যাত্রীবাহী বৈদ্যুতিক গাড়িতে ক্ষতিকর সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন লিথিয়াম-আয়ন অথবা লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারি ব্যবহারে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে এলএফপি ব্যাটারি নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যথাযথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এসব ব্যাটারির কার্যকাল ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত হতে পারে। তবে ব্যাটারির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেগুলোর নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশসম্মতভাবে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার ও নিষ্পত্তি কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এ পরিকল্পনার আওতায় গাজীপুরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ডিপোও রয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে তৈরি হওয়া ব্যাটারিবর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে।

অ্যাপার্টমেন্ট ও বাণিজ্যিক ভবনে চার্জিং সুবিধা
বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়লেও শহরের বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে চার্জিং সুবিধা নিশ্চিত করা এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসকারী গাড়ির মালিকদের জন্য নিজস্ব চার্জিং ব্যবস্থা স্থাপন অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এ সমস্যা সমাধানে আবাসন ও নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণবিধি হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছে।

নতুন ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ইভি-উপযোগী পার্কিং ব্যবস্থা রাখার শর্ত চালু করেছে। এ ব্যবস্থার আওতায় ভবন নির্মাণের সময়ই নির্দিষ্ট উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক তার, নিরাপত্তামূলক সার্কিট ব্রেকার এবং বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনের প্যানেল স্থাপনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ফলে ভবন নির্মাণের পর আলাদা করে বড় ধরনের বৈদ্যুতিক অবকাঠামো পরিবর্তন ছাড়াই ফ্ল্যাটের মালিকেরা নিজস্ব বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জার স্থাপন করতে পারবেন।

দ্রুত চার্জিং স্টেশন ও বিদ্যুতের খরচ
বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার সম্প্রসারণে চার্জিং অবকাঠামো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দ্রুত চার্জিং স্টেশনের জন্য পাইকারি বিদ্যুতের মূল্য প্রতি ইউনিট ১১ টাকা ৩৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। বেসরকারি চার্জিং স্টেশন পরিচালকেরা সেবামূল্য সহ প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে ১৬ থেকে ১৯ টাকা নিয়ে থাকেন।

গাড়ির মডেল, ব্যাটারির ধারণক্ষমতা ও চার্জারের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে দ্রুত চার্জিং স্টেশনে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিটে ব্যাটারির ৮০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ দেয়া সম্ভব। একটি সাধারণ বৈদ্যুতিক গাড়ি সম্পূর্ণ চার্জ করতে প্রায় ৩০০ থেকে ৭৫০ টাকা খরচ হতে পারে। ব্যাটারির ধারণক্ষমতা ও গাড়ির মডেল অনুযায়ী একবার পূর্ণ চার্জে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব। তবে গাড়ির গতি, এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবহার, রাস্তার অবস্থা, আবহাওয়া ও চালানোর ধরনের কারণে প্রকৃত রেঞ্জে পার্থক্য হতে পারে।

বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দেশের মহাসড়কগুলোতে পর্যাপ্ত দ্রুত চার্জিং স্টেশন না থাকা। রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক চার্জিং সুবিধা থাকলেও দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রায় চার্জিং স্টেশনের স্বল্পতা ব্যবহারকারীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ সমস্যা সমাধানে ২০৩০ সালের মধ্যে সারা দেশে ১ হাজার ২০০টি বাণিজ্যিক দ্রুত চার্জিং স্টেশন স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে শহর থেকে দূরপাল্লার মহাসড়ক পর্যন্ত বৈদ্যুতিক গাড়ি চলাচলের সুযোগ বাড়বে।

পরিবেশদূষণ ও জ্বালানি আমদানি কমানোর সম্ভাবনা
বৈদ্যুতিক গাড়ির অন্যতম বড় সুবিধা হলো চলাচলের সময় সরাসরি কোনও দূষণকারী গ্যাস নির্গত না করা। প্রচলিত পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির তুলনায় এসব গাড়ি অনেক কম শব্দও সৃষ্টি করে। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়লে স্থানীয় বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ কমাতে সহায়তা করতে পারে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিদ্যুৎ বিভাগের যৌথ অর্থনৈতিক পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, সড়কে চলাচলকারী প্রতিটি ব্যক্তিগত বৈদ্যুতিক গাড়ি বছরে গড়ে ৪ দশমিক ৬ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ রোধ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকারের কৌশলগত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট যানবাহনের অন্তত ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎচালিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জিত হলে পরিবহন খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমবে। একই সঙ্গে পেট্রোল ও ডিজেল আমদানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারের সম্ভাবনা বাড়লেও এ খাতের টেকসই বিকাশে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে গাড়ির তুলনামূলক বেশি প্রাথমিক মূল্য, দেশব্যাপী চার্জিং স্টেশনের সীমিত উপস্থিতি, ব্যাটারি প্রতিস্থাপনের ব্যয় এবং দক্ষ সার্ভিসিং ও প্রযুক্তিগত জনবলের স্বল্পতা।

বিশেষ করে ব্যাটারির ওয়ারেন্টি শেষ হওয়ার পর প্রতিস্থাপন ব্যয় কত হবে, দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাটারির কার্যক্ষমতা কেমন থাকবে এবং দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে উচ্চ ভোল্টেজের ব্যাটারি কীভাবে নিরাপদে ব্যবস্থাপনা করা হবে এসব বিষয়ে ক্রেতাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ির পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস, ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

সব মিলিয়ে, শুল্কসুবিধা, কম পরিচালন ব্যয়, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের উপস্থিতি এবং সরকারি নীতিগত সহায়তায় বাংলাদেশের গাড়ির বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে বৈদ্যুতিক গাড়ি। চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণ, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ও বিক্রয়োত্তর সেবা নিশ্চিত করা গেলে আগামী কয়েক বছরে দেশের পরিবহন খাতে বৈদ্যুতিক গাড়ি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে। এতে শুধু ব্যক্তিগত পরিবহনেই পরিবর্তন আসবে না, বরং জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার পথও আরও সুগম হবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *