এআই-প্রস্তুত কর্মশক্তি গড়তে শিক্ষা ও শিল্পখাতের সমন্বয়ের আহ্বান
ক.বি.ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্র ও দক্ষতার চাহিদায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের তরুণ পেশাজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কীভাবে প্রস্তুত করা যায়, তা নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা সময়োপযোগী উদ্যোগ, নৈতিক নেতৃত্ব এবং শিক্ষা ও শিল্পখাতের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
সম্প্রতি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি) ক্যাম্পাসে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষ সপ্তাহ’ উপলক্ষে “নৈতিক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তোলা: শিক্ষা–শিল্প সংলাপ” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে দ্য এআই কালেক্টিভ বাংলাদেশ চ্যাপ্টার।
বৈঠকের সঞ্চালনা করেন এআইইউবির কমপিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (স্নাতক) ড. মুহাম্মদ ফিরোজ মৃধা। তিনি বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শেখার বিকল্প নয়, বরং শেখার সক্ষমতা বাড়ানোর একটি সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এজন্য শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান, গবেষণামুখী মানসিকতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।”
দ্য এআই কালেক্টিভ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চ্যাপ্টার লিড মোহাম্মদ আসিফ বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি অভূতপূর্ব হলেও এর সুফল এখনও বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির সুবিধা সবার কাছে পৌঁছে দিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ প্রয়োজন।”
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মেজর জেনারেল ইবনে ফজল শায়েখুজ্জামান (অব.) এআই ব্যবহারে তথ্য নিরাপত্তা ও সুশাসনের বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি বলেন, “বিনামূল্যের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ব্যবহারকারীর তথ্য একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী নীতিমালা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রয়োজন।”
এআইইউবির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. দীপ নন্দী জানান, “বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতোমধ্যে পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে তিনি শিক্ষার্থীদের এআই-এর ওপর অতিনির্ভরশীল না হয়ে নিজস্ব বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন। পাশাপাশি শিল্পখাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের আহ্বান জানান তিনি।”
হুয়াওয়ে টেকনোলজিসের অপারেশনাল ডিরেক্টর মাহফুজ কায়সার আপু বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবকিছু শেখার চেষ্টা না করে নির্দিষ্ট কোনও ক্ষেত্রে গভীর দক্ষতা অর্জন করাই বেশি কার্যকর। তাঁর মতে, এআই-ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের যাত্রা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শুরু হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি সরকার-সমর্থিত এআই-সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।”
এআইইউবির গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের প্রধান ড. তাবিন হাসান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও মানবকেন্দ্রিক করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “মানুষ তখনই এআই প্রযুক্তির প্রতি আস্থা তৈরি করবে, যখন প্রযুক্তিটি মানুষের প্রয়োজন, মূল্যবোধ ও কল্যাণকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হবে এবং এর বাস্তব উপকারিতা সহজেই উপলব্ধি করা যাবে।”
এসিআই পিএলসির এআই ব্যবসা বিভাগের পরিচালক ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মোহাম্মদ ওলি আহাদ বলেন, “এআই প্রযুক্তি অনেক দূর এগোলেও মানুষের স্বাভাবিক অভিযোজন ক্ষমতা ও সংবেদনশীলতার বিকল্প এখনো হয়ে উঠতে পারেনি। তিনি শিশুদের প্রযুক্তি থেকে দূরে না রেখে দায়িত্বশীল ও নৈতিকভাবে এআই ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে শিক্ষকদের শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন।”
এআইইউবির ড. মো. সাইফ উল্লাহ মিয়া বলেন, “এআই যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতার একটি হলো সঠিক প্রশ্ন করার ক্ষমতা এবং প্রযুক্তি থেকে পাওয়া তথ্যকে সমালোচনামূলকভাবে যাচাই করার দক্ষতা। তিনি মুখস্থনির্ভর মূল্যায়নের পরিবর্তে সমস্যা সমাধান ও বিশ্লেষণী দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। পাশাপাশি এআই ব্যবহারে সুশাসন ও তথ্য সুরক্ষার কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।”
প্রাইম নাউ-এর ডেটা সায়েন্স ও এআই বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট খ. এহসানুর রহমান বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু একটি প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম হিসেবে নয়, বরং মানব সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত। তাঁর মতে, ভবিষ্যৎকে ‘এআই বনাম মানুষ’ হিসেবে নয়, বরং ‘এআই ও মানুষের সহযোগিতা’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই সহযোগিতাই অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের পথকে আরও শক্তিশালী করবে।”
বৈঠকের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশে এআই-প্রস্তুত কর্মশক্তি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় মেধা, উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও সম্ভাবনার কোনও ঘাটতি নেই। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শিক্ষা, শিল্পখাত, সরকার ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি নৈতিকতা, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।





