ই-ফাইলিংয়ের ছোঁয়ায় স্মার্ট হচ্ছে সরকারি দপ্তর, বাড়ছে দক্ষতা ও জনআস্থা
ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ: দেশের সরকারি প্রশাসনে শুরু হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর এক বড় পরিবর্তন। কাগজনির্ভর জটিলতা কমিয়ে দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করতে ই-ফাইলিং ও স্মার্ট অফিস ব্যবস্থাপনা এখন হয়ে ওঠছে মূল ভরকেন্দ্র। ডিজিটাল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ফলে সরকারি সেবায় সময় ও ব্যয় কমছে। পাশাপাশি নাগরিক সেবা আগের তুলনায় অনেক সহজ ও কার্যকর হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, আইসিটি বিভাগ এবং এটুআই কর্মসূচির তথ্য বলছে, দেশের অধিকাংশ মন্ত্রণালয়, বিভাগ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে ই-নথি বা ই-ফাইলিং চালু হয়েছে। এর ফলে কর্মকর্তারা অফিসে উপস্থিত না থাকলেও অনলাইনে নথি অনুমোদন, নিষ্পত্তি ও দাপ্তরিক যোগাযোগ করতে পারছেন, যা প্রশাসনিক কার্যক্রমে এনেছে উল্লেখযোগ্য গতি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গণি জানান, বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ সরকারি ফাইল ডিজিটালভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবির বলেন, আগে একটি ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে যেতে সপ্তাহ পার হয়ে যেত, এখন অনেক ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাজ শেষ হচ্ছে। ফলে দেরি, জটিলতা ও দুর্নীতির সুযোগ কমেছে।
ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনার আরেকটি বড় সুবিধা হলো স্বচ্ছতা। আগে ফাইলের নোটশিট পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও এখন তা প্রায় অসম্ভব। ফলে অনিয়ম কমছে এবং জবাবদিহিতা বাড়ছে। একই সঙ্গে দেশের বাইরে থেকেও কর্মকর্তারা ফাইলে সই করতে পারায় সময় অপচয় কমছে।
ডিজিটাল রুপান্তর লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকারি অফিসগুলোকে ধাপে ধাপে স্মার্ট অফিসে রূপান্তর করা হচ্ছে। এর আওতায় ই-ফাইলিংয়ের পাশাপাশি অনলাইন মিটিং, ভার্চুয়াল যোগাযোগ, ডিজিটাল হাজিরা, ছুটি ব্যবস্থাপনা এবং সেবার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার ই-নথি নিষ্পত্তির ফলে কাগজ, প্রিন্টিং ও পরিবহন ব্যয় কমছে। এতে যেমন সরকারের ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি পরিবেশ সংরক্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-ফাইলিং শুধু প্রশাসনিক আধুনিকায়ন নয়, এটি সরকারি সেবার সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন এনেছে। আগে একটি ফাইলের অগ্রগতি জানতে নাগরিকদের বারবার অফিসে যেতে হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনেই তা জানা সম্ভব হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনগুলোতে ভূমিসেবা, নামজারি, সনদ প্রদান, লাইসেন্স নবায়ন সহ বিভিন্ন সেবায় স্মার্ট অফিস ব্যবস্থার ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। অনলাইনভিত্তিক সেবা বাড়ায় নাগরিকদের অফিসে উপস্থিতির প্রয়োজন কমছে এবং ভোগান্তিও হ্রাস পাচ্ছে। ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনার ফলে জরুরি নির্দেশনা দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো যাচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকিতেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ এবং দক্ষ জনবল ছাড়া ই-ফাইলিং ব্যবস্থার পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। পাশাপাশি সব দপ্তরে সমন্বিত ডেটা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাও জরুরি। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যুক্ত হলে সরকারি সেবা আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নাগরিকদের জন্য এই পরিবর্তন ইতোমধ্যে স্বস্তি বয়ে এনেছে। এখন আবেদন জমা, নথি আপলোড বা অগ্রগতি জানা সবই অনেক ক্ষেত্রে ঘরে বসে করা সম্ভব। এতে সময়, খরচ এবং ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ই-ফাইলিং ও স্মার্ট অফিস ব্যবস্থাপনা দেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও গতিশীল ও আধুনিক করে তুলছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই রূপান্তর শুধু সরকারি কাজের গতি বাড়াচ্ছে না, বরং নাগরিক সেবাকে করছে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী।





