অন্যান্য মতামত

ই-ক্যাবের নেতৃত্ব সংকট ও উত্তরণের পথ: আইনি ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ

সোহেল মৃধা: ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিগত এক দশকেরও বেশি সময়ে সংগঠনটি অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছে, কিন্তু ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে বর্তমানে যে পরিস্থিতি অতিবাহিত করছে, তা এর আগে কখনোই ঘটেনি। ই-ক্যাবের ইতিহাসে এটিই প্রথম এবং দীর্ঘতম সময় যেখানে সংগঠনটি পুরোপুরি নেতৃত্বশূন্য এবং একজন অনির্বাচিত প্রশাসক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

বিগত সময়ে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বহু সংকট এলেও ই-ক্যাব কখনোই এভাবে অভিভাবকহীন বা দিকনির্দেশনাহীন ছিল না। এই নজিরবিহীন পরিস্থিতি কেবল সংগঠনের প্রশাসনিক কাঠামোকেই দুর্বল করেনি, বরং পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ৫ লাখ উদ্যোক্তার অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে এই বিশ্লেষণাত্মক নিবন্ধটি উপস্থাপন করছি।

প্রেক্ষাপট ও প্রথম প্রশাসকের উদ্যোগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ই-ক্যাবের নির্বাচিত কমিটি পদত্যাগ করলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য সংগঠন আইন-২০২২-এর ১৭ ধারা অনুযায়ী একজন প্রশাসক নিয়োগ করে। যদিও এই নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য ছিল ১২০ দিনের মধ্যে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা, কিন্তু ২০২৫ সালের মাঝামাঝি এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এই নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া ই-কমার্স খাতের নীতি-নির্ধারণী ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে একটি বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে।

উল্লেখ্য যে, প্রথম প্রশাসক কিন্তু নির্বাচন আয়োজনের সব রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন এবং নির্বাচনী তফসিলও ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু একটি রিট পিটিশনের কারণে সেই নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। পর পর দুজন প্রশাসক নিয়োগ হলেও আইনি জটিলতা এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের অভাবে আজ পর্যন্ত ই-ক্যাব একটি নির্বাচিত কমিটির মুখ দেখেনি। ৫ লাখের অধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা যারা অনলাইনে ব্যবসা করছেন, তাদের সবারই চাওয়া, দাবি ও আকাঙ্ক্ষা এখন এই সংগঠনের নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল।

রিট মামলা ও সরকারের নিস্পৃহতা
নির্বাচন আয়োজনে দীর্ঘসূত্রতার মূলে রয়েছে রিট পিটিশন নং: ৯৫১৬/২০২৪। এই রিটের কারণে নির্বাচন স্থগিত থাকায় ইন্ডাস্ট্রিতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না এমন যুক্তি প্রশাসকের পক্ষ থেকে দেয়া হলেও, এখানে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে। ৫ লাখ উদ্যোক্তার ভাগ্য যেখানে একটি সংগঠনের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে সরকার কেন স্বপ্রণোদিত হয়ে এই রিট দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে না, সপ্রণোদিত হয়ে উদ্যোগ নিলে সেটা হয়তো ইন্ডাস্ট্রির জন্য ভালো হতো।

উচ্চ আদালতে সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শক্তিশালী আইনি টিম থাকতেও বছরের অধিক সময় একটি রিট ঝুলে থাকা এবং সেই অজুহাতে নির্বাচন না দেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি কি কেবল আইনি জটিলতা, নাকি নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার কোনো কৌশল সেই প্রশ্ন এখন সাধারণ সদস্যদের মুখে মুখে। আমরা চাই সরকার অতি দ্রুত এই রিট বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করুক।

সহায়ক কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
সম্প্রতি প্রশাসককে সহযোগিতা করার জন্য একটি সহায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমান সংকটময় সময়ে নির্বাচন না দিয়ে কেন এই কমিটি গঠন করা হলো, তা নিয়ে সদস্যদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এই কমিটির সদস্যরা সাধারণ সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নন। ফলে তাদের গৃহীত কোনও সিদ্ধান্ত বা নীতি ৩,০০০ সদস্য বা ৫ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।

বাণিজ্য সংগঠন আইনে প্রশাসকের কাজ হলো নির্বাচন আয়োজন করা, সহায়ক কমিটি দিয়ে দীর্ঘ সময় সংগঠন পরিচালনা করা নয়। এই কমিটি কেন দ্রুত বিলুপ্ত করে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে না, তা নিয়ে সাধারণ সদস্যদের মধ্যে ব্যবসায়িক মন্দার কারণে অস্বস্তি বিরাজ করছে। অনির্বাচিত এই কমিটি ই-ক্যাবের স্থায়ী কোনও সমাধান হতে পারে না।

সরাসরি পদভিত্তিক নির্বাচন (বিধিমালা-২০২৫)
২০২৫ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্দেশিত নতুন নীতিমালা অনুযায়ী নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ করা হয়েছে। আমাদের দাবি এই বিধিমালা মেনেই দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে-

স্বচ্ছ ভোটার তালিকা ও অডিট: নির্বাচনের আগে একটি ত্রুটিমুক্ত এবং স্বচ্ছ ভোটার তালিকা প্রকাশ করা এখন সবচেয়ে বড় দাবি। ভোটার তালিকায় কোনও ভুয়া সদস্য বা অস্তিত্বহীন কোম্পানি থাকতে পারবে না। সদস্যদের যথাযথ অডিট রিপোর্ট এবং নিয়মিত কার্যক্রম যাচাইয়ের মাধ্যমে একটি ক্লিন ভোটার লিস্ট তৈরি করতে হবে যাতে কোনও বিশেষ প্যানেল বা সিন্ডিকেট ভুয়া ভোটার ব্যবহার করে ফলাফল প্রভাবিত করতে না পারে। অডিট রিপোর্ট বিহীন কোনও কোম্পানি ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানেই নির্বাচনের স্বচ্ছতা নষ্ট করা।

সরাসরি পদভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা: ই-ক্যাবের পদ কাঠামো অনুযায়ী সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং অর্থ সম্পাদক এই প্রতিটি পদে প্রার্থীরা সরাসরি সদস্যদের ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। শুধুমাত্র ডিরেক্টর হিসেবে ভোট নিয়ে ভেতরে পদ ভাগাভাগি করার পুরনো পদ্ধতি এখন রহিত করা হয়েছে।
মেয়াদের সীমাবদ্ধতা: নতুন বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো পর পর দুই মেয়াদের বেশি নির্বাচিত কোনও ব্যক্তি পরবর্তীতে নির্বাচন করতে পারবেন না। এটি নেতৃত্বের একচেটিয়া আধিপত্য বন্ধ করবে।

অর্থনৈতিক প্রভাব ও নেতৃত্বহীনতার ক্ষয়ক্ষতি
৫ আগস্টের পর থেকে ই-কমার্স খাতে যে অভিভাবকহীনতা তৈরি হয়েছে, তার ফলে উদ্যোক্তারা ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। আমাদের তথ্য ও বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী-
পলিসি প্যারালাইসিস: সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নীতি-নির্ধারণী আলোচনা থমকে থাকায় গত দেড় বছরে ই-কমার্স খাতে প্রায় ২০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে।

আর্থিক ক্ষতি: স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নেগোসিয়েশন করার মতো নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় ই-কমার্স লজিস্টিক ও ডেলিভারি চেইনগুলোতে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতি শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ৫ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি বা ব্যাংকিং জটিলতা নিরসনে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

অরাজনৈতিক ও দক্ষ নেতৃত্বের গুরুত্ব
ই-কমার্স খাতের স্থিতিশীলতার জন্য আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিচয় বড় করে না দেখে ইন্ডাস্ট্রিতে অভিজ্ঞ, দক্ষ এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে দাবি-দাওয়া আদায়ের নেগোসিয়েশন দক্ষতা সম্পন্ন নেতৃত্বকে প্রাধান্য দিতে হবে। অ্যাসোসিয়েশনকে হতে হবে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এবং পেশাদারদের বিচরণক্ষেত্র।

পরিশেষে বলা যায়, ই-ক্যাব বর্তমানে তার ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময় পার করছে। ভূমিকা এবং উপসংহার একটি সুন্দর ও তথ্যসমৃদ্ধ লেখার অলঙ্কার হলেও, আমাদের মূল লক্ষ্য হলো বাস্তব পরিবর্তন। আমরা চাই আগামীর ই-ক্যাব হোক সম্পূর্ণ সদস্য-বান্ধব। ২০২৫-এর নতুন নির্বাচনী আইন মেনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।

বর্তমান প্রশাসনের উচিত রিট পিটিশনটির দ্রুত আইনি সমাধান নিশ্চিত করা এবং অনির্বাচিত সহায়ক কমিটির মেয়াদ সংক্ষিপ্ত করে ২০২৫-এর নতুন বিধিমালা অনুযায়ী সরাসরি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা। অরাজনৈতিক ও দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমেই কেবল ই-ক্যাব তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে এবং ৫ লাখ উদ্যোক্তার আস্থার প্রতীকে পরিণত হতে পারে। সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দ্রুত নির্বাচনের কোনও বিকল্প নেই।

সোহেল মৃধা- ই-কমার্স উদ্যোক্তা এবং বিশ্লেষক

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *