প্রতিবেদন

প্রশাসক বদল, সহায়ক কমিটি, তফসিল- কেন বারবার থমকে যাচ্ছে বেসিস নির্বাচন?

বি.এম. ইমরাদ তুষার: বাংলাদেশের সফটওয়্যার খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)। দেশের সফটওয়্যার ও আইটি সেবা খাতের উদ্যোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি নীতিনির্ধারণ, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতকে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কিন্তু গত প্রায় দুই বছরে বেসিসের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয়েছে একের পর এক জটিলতা। নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তে প্রশাসক দিয়ে সংগঠন পরিচালনা, প্রশাসক পরিবর্তন, সহায়ক কমিটি গঠন ও বিলুপ্তি, আবার নতুন কমিটি গঠন এরপর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেও ভোট না হওয়া; সব মিলিয়ে বেসিসের নেতৃত্বের প্রশ্নটি বারবার সামনে এসেছে।

সবশেষ ২০২৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বেসিস-এর কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই ৩০ জুন ঘোষিত তফসিল বাতিল করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এরপর সদস্যপদ ও ভোটার তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সাত সদস্যের সহায়ক কমিটি গঠন করা হলেও মাত্র ছয় দিনের মাথায় সেই কমিটির কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়। ফলে ৩ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত নতুন নির্বাচনী তফসিলও সামনে আসেনি।

শুরুটা যেভাবে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেসিসেও নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। ওই বছরের অক্টোবরে তৎকালীন সভাপতি রাসেল টি আহমেদ পদত্যাগ করেন। এরপর ৪ ডিসেম্বর সরকার বাংলাদেশ কমপিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)-এর নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ মেহেদি হাসানকে বেসিসের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়।

প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর মেহেদি হাসানকে সহযোগিতা করতে প্রকৌশলী রাফেল কবিরের নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি সহায়ক কমিটি গঠন করা হয়। প্রশাসক ও কমিটির দায়িত্বের মধ্যে ছিল সংগঠনের নিয়মিত কার্যক্রম সচল রাখা, সদস্যপদ-সংক্রান্ত সংস্কার, সাংগঠনিক বিধি সংশোধন এবং নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি।

তবে নির্ধারিত ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালের ৪ মে মেহেদি হাসান প্রশাসকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চাকরি থেকে অবসরের আগে বাকি সময়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ করে নির্বাচন আয়োজন ও নির্বাচিত পর্ষদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা সম্ভব হবে না। এর আগেই সহায়ক কমিটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রাফেল কবির ৩০ এপ্রিল পদত্যাগ করেন। পরদিন ১ মে প্রশাসক ওই কমিটি বিলুপ্ত করেন। ফলে একই সময়ে বেসিস কার্যত প্রশাসক ও সহায়ক কমিটি দুই স্তরের নেতৃত্বই হারায়।

চার মাস পর নতুন প্রশাসক
প্রথম প্রশাসকের পদত্যাগের পর প্রায় চার মাস বেসিসে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খানকে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তাঁর দায়িত্ব ছিল ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা।

নতুন প্রশাসক দায়িত্ব নেয়ার পর ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর আবারও ১০ সদস্যের একটি সহায়ক কমিটি গঠন করা হয়। আগের কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার প্রায় চার মাস পর এই কমিটি বেসিসের কার্যক্রম সচল রাখতে প্রশাসককে সহযোগিতা করার কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ২০২৫ সালের অক্টোবরেই সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে নতুন সহায়ক কমিটি গঠন হলেও বেসিসের নির্বাচনের তফসিল কবে হবে।

২০২৬ সালে নির্বাচনের পথে অগ্রগতি
দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর ২০২৬ সালে বেসিস নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া দৃশ্যমানভাবে এগোয়। নির্বাচন বোর্ড গঠন এবং প্রস্তুতি শেষে ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এপ্রিলের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৭ জুন। ১১টি পদে পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনের কথা ছিল। কিন্তু ২৭ জুনও ভোট হয়নি।

এরপর ৩০ জুন নতুন করে তফসিল ঘোষণা করা হয়। নতুন সময়সূচি অনুযায়ী ২৬ সেপ্টেম্বর ভোট গ্রহণের কথা ছিল। নির্বাচনে ১১টি পদে ২৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতিও এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, প্রায় দেড় বছরের প্রশাসক-নির্ভর পরিচালনার পর নির্বাচন এবার বাস্তবায়নের কাছাকাছি পৌঁছেছে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশাও শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি

প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরই নতুন মোড়
সেপ্টেম্বরের শুরুতে নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছিল। এর মধ্যেই ভোটার ও সদস্য তালিকা নিয়ে প্রশ্ন, সদস্য অন্তর্ভুক্তি এবং প্রতিনিধিত্বের বিষয় সামনে আসে। ৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৩০ জুন ঘোষিত নির্বাচনী তফসিল বাতিল করে। ফলে ২৬ সেপ্টেম্বরের নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করতে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি এবং বিদ্যমান সদস্য তালিকা যাচাই ও হালনাগাদ করা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তফসিল বাতিলের সময় নতুন নির্বাচনের কোনও নির্দিষ্ট তারিখ দেয়া হয়নি। সদস্য ও ভোটার তালিকা পুনর্মূল্যায়নের পর নতুন করে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করার কথা বলা হয়।

আবারও প্রশাসক বদল
নির্বাচনের তফসিল বাতিলের দিনই বেসিসে নতুন প্রশাসক নিয়োগের খবর সামনে আসে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-এর অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনকে বেসিসের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। এতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেসিসের প্রশাসনিক নেতৃত্বে অন্তত তিনটি পর্যায় তৈরি হয়- প্রথমে মুহম্মদ মেহেদি হাসান, পরে আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খান এবং সর্বশেষ খাদিজা নাজনীন। প্রশাসক পরিবর্তনের প্রতিটি পর্যায়েই মূল লক্ষ্য ছিল সংগঠনকে সচল রাখা এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া বারবার নতুন করে শুরু করতে হয়েছে।

সাত সদস্যের সহায়ক কমিটি, তারপর স্থগিত
তফসিল বাতিলের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ভিত্তিতে ২২ সেপ্টেম্বর সাত সদস্যের একটি নতুন সহায়ক কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির মূল কাজ ছিল নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি, বিদ্যমান সদস্যদের তথ্য যাচাই-বাছাই এবং সদস্য ও ভোটার তালিকা হালনাগাদে প্রশাসককে সহযোগিতা করা। কমিটির কর্মপরিধিও নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার দিন কোনো সদস্য নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইলে তাঁকে কমিটি থেকে পদত্যাগ করতে হবে এমন বিধানও রাখা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনী প্রস্তুতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এড়ানো।

কিন্তু নতুন জটিলতা তৈরি হতে বেশি সময় লাগেনি। ২২ সেপ্টেম্বর গঠিত কমিটির কার্যক্রম ২৮ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে স্থগিত করা হয়। অর্থাৎ কমিটি গঠনের মাত্র ছয় দিনের মাথায় তার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বেসিসের নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

কেন বারবার আটকে যাচ্ছে নির্বাচন?
বেসিসের নির্বাচন বারবার পিছিয়ে যাওয়ার পেছনে একক কোনও কারণকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করার মতো তথ্য নেই। বরং বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে।

প্রথমত, সদস্য ও ভোটার তালিকা: ২০২৬ সালের সর্বশেষ তফসিল বাতিলের ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সরাসরি সদস্য তালিকা যাচাই, হালনাগাদ ও নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, সাংগঠনিক সংস্কার: প্রথম প্রশাসকের সময়ে সদস্যপদ, গঠনতন্ত্র এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে এসব কাজ শেষ করতে গিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়নি বলে তৎকালীন প্রশাসকের পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

তৃতীয়ত, প্রশাসক ও সহায়ক কমিটির ধারাবাহিক পরিবর্তন: ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে বেসিসের প্রশাসনিক কাঠামোয় একাধিক পরিবর্তন হয়েছে। এক প্রশাসকের পদত্যাগের পর নতুন প্রশাসক, এক সহায়ক কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর নতুন কমিটি প্রতিবারই নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়াকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে।

চতুর্থত, নির্বাচন প্রক্রিয়া ঘিরে বিরোধ ও আস্থার প্রশ্ন: ২০২৬ সালের নির্বাচন ঘিরে প্রার্থী তালিকা, সদস্যপদ ও ভোটার তালিকা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের প্রশ্ন ও আপত্তি প্রকাশ্যে এসেছে। এসব বিষয় যাচাই করতেই সর্বশেষ তফসিল বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সদস্যদের জন্য এর অর্থ কী?
একটি বাণিজ্য সংগঠনের নিয়মিত নেতৃত্ব কেবল আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়। নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ থাকলে সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব, নীতিগত সিদ্ধান্ত, সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং নেতৃত্বের জবাবদিহির কাঠামোও নির্দিষ্ট থাকে। অন্যদিকে প্রশাসক-নির্ভর ব্যবস্থায় মূল লক্ষ্য থাকে সংগঠনের দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখা এবং নির্বাচন আয়োজনের পথ তৈরি করা। ফলে প্রশাসক যত দীর্ঘ সময় দায়িত্বে থাকেন, তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রশ্ন।

বেসিসের ক্ষেত্রে গত দুই বছরে ঠিক এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে, সহায়ক কমিটি করা হয়েছে, নির্বাচন বোর্ড গঠন হয়েছে, তফসিল ঘোষণা হয়েছে কিন্তু ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত পর্ষদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর এখনও সম্পন্ন হয়নি।

সামনে এখন কী?
সেপ্টেম্বরের তফসিল বাতিলের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল সদস্য ও ভোটার তালিকা যাচাই এবং হালনাগাদ করে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া। কিন্তু ২২ সেপ্টেম্বর গঠিত সহায়ক কমিটির কার্যক্রম ২৮ সেপ্টেম্বর স্থগিত হওয়ায় সেই প্রক্রিয়াও নতুন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

৩ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশ্যে নতুন নির্বাচনী তফসিলের নির্দিষ্ট তারিখ পাওয়া যায়নি। ফলে এখন মূল প্রশ্ন সদস্য তালিকা যাচাইয়ের কাজ কীভাবে এগোবে, স্থগিত সহায়ক কমিটির বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হবে এবং নতুন নির্বাচনের সময়সূচি কবে ঘোষণা করা হবে।

বেসিসের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন শুধু একটি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ নয়; বরং এমন একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, যাতে সদস্যপদ, ভোটার তালিকা, প্রার্থিতা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে পরবর্তী সময়ে আবার একই ধরনের প্রশ্ন না ওঠে। কারণ বারবার তফসিল ঘোষণা ও বাতিল হলে শুধু নির্বাচনই পিছিয়ে যায় না, সংগঠনের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও সদস্যদের আস্থার প্রশ্নটিও সামনে আসে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *