অন্যান্য মতামত

এআইয়ের যুগে ই-কমার্স, বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটুকু?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা): ​বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের পেছনে বড় কোনও রাজনৈতিক ঘটনা নেই, কাজ করছে প্রযুক্তির সূচকীয় গতি। অতীতে বিভিন্ন সময়ে শিল্পবিপ্লব দেখেছে বিশ্ব তা ছিল বাষ্পীয় ইঞ্জিন, বিদ্যুৎ কিংবা কমপিউটারের প্রাথমিক ব্যবহার। কিন্তু আজকের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রধান চালিকাশক্তি দুটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডিজিটাল কমার্স।

চায়ের কাপের আড্ডা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী টেবিল কিংবা করপোরেট অফিসের মিটিং রুম সবখানেই এখন বড় প্রশ্ন একটাই- এই প্রযুক্তি কীভাবে আমাদের ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতির হিসাব বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন আরও বেশি জরুরি। এক সময়ের শ্রমভিত্তিক অর্থনীতির এই দেশ আজ এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মেধা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে পা না বাড়ানো ছাড়া প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব।

বাজার ও অর্থনীতির চালচিত্র: পরিসংখ্যানের আয়নায় বাংলাদেশ
কোনও দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বুঝতে হলে তার অর্থনীতির সংখ্যা ও ডেটাগুলো দেখা দরকার। বিশ্বব্যাংক, ইউএনসিটিএডি এবং দেশীয় আইসিটি খাতের তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে আইসিটি খাতের আকার বর্তমানে প্রায় ৯.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। বার্ষিক ৬ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে এই খাতের রাজস্ব ১২.৮ থেকে ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ই-কমার্স ও ডিজিটাল কমার্সের ব্যাপক বিস্তার।

করোনার সময় থেকে শুরু হওয়া অনলাইন কেনাকাটার অভ্যেস এখন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। দেশের ই-কমার্স খাতের বার্ষিক বাজার আকার ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ইলেকট্রনিক্স, ফ্যাশন, পার্সোনাল কেয়ার এবং গ্রোসারি এই বাজারের প্রধান ভিত্তি, যার মধ্যে কেবল ইলেকট্রনিক্স খাত থেকেই আসে প্রায় ২৪ শতাংশ রাজস্ব। এর পাশাপাশি বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) এবং কুরিয়ার লজিস্টিকসের কারণে এই কেনাকাটা আর ঢাকা-চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ নেই, পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায়েও।

ই-কমার্স ও সোশ্যাল কমার্সে নারী উদ্যোক্তাদের অবদান
​বাংলাদেশের ডিজিটাল কমার্সের সবচেয়ে বড় ও মানবিক দিক হলো সোশ্যাল কমার্স বা এফ- কমার্স এর বিস্তার। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করে দেশের লাখ লাখ নারী ঘর থেকে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ঘরের তৈরি খাবার, পোশাক, বুটিক, হস্তশিল্প কিংবা সাজসজ্জার পণ্য বিক্রি করে তারা কেবল নিজেদের আত্মনির্ভরশীল করছেন না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আনছেন। এমএফএস পেমেন্টের সহজলভ্যতা এবং এআই-চালিত ডিজিটাল মার্কেটিং টুলস ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ায় এই ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা খুব অল্প খরচে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন। ই-কমার্স এখন আর শুধু বড় করপোরেটদের জায়গা নয়, এটি নারী ক্ষমতায়ন ও প্রান্তিক অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেছে।

কর্মসংস্থানে আঘাত ও গিগ ইকোনমির নতুন সমীকরণ
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেনারেটেড এআই এবং উন্নত অটোমেশনের কারণে আগামী ৫ বছরের মধ্যে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি কাজের ধরন বদলে যাবে। গ্লোবাল আইটি কোম্পানিগুলোতে এআই টুলসের ব্যবহার কাজ করার ক্ষমতা ৫০ থেকে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আমাদের মতো দেশের শ্রমবাজারের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। এত দিন আমাদের তরুণরা ডেটা এন্ট্রি, সাধারণ গ্রাফিক ডিজাইন, বেসিক কন্টেন্ট রাইটিং বা ওয়েবসাইটের কাজের ওপর ভিত্তি করে ফ্রিল্যান্সিং করতেন।

কিন্তু চ্যাটজিপিটি, মিডজার্নি বা ক্লড-এর মতো এআই টুলস দিয়ে এখন এসব কাজ খুব কম সময়ে করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী আউটসোর্সিং কাজে ধস নামছে। তবে পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে গিগ ইকোনমি বা প্রজেক্ট-ভিত্তিক স্বাধীন কাজের নতুন সুযোগ। প্রথাগত কাজের বাজার হারালেও এআই প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেটা অ্যানালাইসিস এবং এআই মডেল ট্রেনিংয়ের মতো জায়গায় নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

ই-কমার্সে এআইয়ের বাস্তব প্রয়োগ ও পরিচালন দক্ষতা
ই-কমার্স খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল একটি কথা নয়, এটি এখন প্রতিদিনের ব্যবসায়িক হাতিয়ার। বর্তমানে শীর্ষস্থানীয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো এআই ব্যবহার করে কাস্টমারদের কেনাকাটার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে। একে বলা হচ্ছে অতি-ব্যক্তিগতকরণ। একজন ক্রেতা আগে কী কিনেছেন বা কী খুঁজেছেন, তা বিশ্লেষণ করে এআই তাকে নিখুঁতভাবে তার পছন্দের পণ্য দেখাচ্ছে, যা বিক্রির সম্ভাবনা দ্বিগুণ করে দিচ্ছে। রাত বারোটায় পণ্য সম্পর্কিত কোনও প্রশ্ন থাকলে এআই চ্যাটবট মানুষ কাস্টমার কেয়ারের মতো প্রাঞ্জল ভাষায় তাত্ক্ষণিক সমাধান দিচ্ছে। এ ছাড়া লজিস্টিকস ও গুদাম ব্যবস্থাপনায় এআই ব্যবহার করে ডেলিভারি রুট ছোট করা এবং পরিচালন ব্যয় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে।

অবকাঠামো, সেমিকন্ডাক্টর কূটনীতি ও গ্রিন ডেটা সেন্টার
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে এখন চলছে সেমিকন্ডাক্টর চিপ রাজনীতি বা চিপ যুদ্ধ। এআই চালানোর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী জিপিইউ এবং মাইক্রোচিপ। বিশ্বজুড়ে চিপের যে সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক টানাটানি চলছে, তা আমাদের মতো প্রযুক্তিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বড় বার্তা। বাংলাদেশ সফটওয়্যার তৈরিতে এগোলেও আমাদের এখনও সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, রোবোটিক্স ও আইওটি হার্ডওয়্যার অ্যাসেম্বলিংয়ের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি, এআই ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ও পানির বিশাল চাহিদার কথা মাথায় রেখে আমাদের গ্রিন ডেটা সেন্টার তৈরির নীতি গ্রহণ করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে কীভাবে প্রযুক্তি অবকাঠামো চালানো যায়, সেই চিন্তাও পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়নের অংশ হতে হবে।

সাইবার সিকিউরিটি, ডিপফেক ও ডেটা প্রাইভেসি ঝুঁকি
প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঝুঁকি। জেনারেটিভ এআই আসার পর বিশ্বজুড়ে ডিপফেক বা ভুয়া ছবি-ভিডিও তৈরি, ভয়েস ক্লোনিং ও অনলাইন প্রতারণা বহুগুণ বেড়েছে। আমাদের দেশে মানুষের ডিজিটাল সচেতনতা কম থাকায় ডিজিটাল পেমেন্ট জালিয়াতি বা সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া খবর ছড়ানোর ঝুঁকি আরও বেশি। দেশের ই-কমার্স লেনদেন ও ফিনটেক খাতকে সুরক্ষিত রাখতে হলে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য এআই পলিসির পাশাপাশি কঠোর ডেটা প্রাইভেসি অ্যান্ড প্রোটেক্শন অ্যাক্ট প্রয়োজন, যাতে সাধারণ নাগরিক ও গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের কোনো অপব্যবহার না হতে পারে।

নীতিনির্ধারণী চ্যালেঞ্জ ও আমাদের করণীয়
প্রযুক্তির এই আধুনিক সময়ে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে কেবল প্রযুক্তির ভোক্তা হয়ে থাকলে চলবে না, আমাদের ইনোভেশন ও কনটেন্টের মালিকানা নিতে হবে। এর জন্য অবিলম্বে কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন-

বাংলা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল উন্নয়ন: বিশ্ববাজারের এআইগুলো ইংরেজি-ভিত্তিক। প্রান্তিক কৃষক, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য নিজস্ব ডেটা ব্যবহার করে উচ্চমানের বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই টুলস তৈরি করতে হবে।

​শিক্ষায় দক্ষতা বৃদ্ধি ও পুনঃদক্ষতা অর্জন: মুখস্থভিত্তিক শিক্ষা দিয়ে এআই যুগের মুখোমুখি হওয়া যাবে না। উচ্চ মাধ্যমিক থেকেই প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইবার সিকিউরিটি ও ডেটা সায়েন্স কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

​গবেষণা ও স্বতন্ত্র পলিসি অ্যাডভোকেসি: ডিজিটাল কমার্স খাতের টেকসই উন্নয়নে স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি (সিডিসিআরএ)-এর মতো স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে ই-কমার্স খাতের সংকট উত্তরণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা এবং জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট পলিসি প্রস্তাবনা দিয়ে আসছে। এআই বিপ্লব ও ই-কমার্সের এই নতুন রূপান্তরে কেবল সরকারি উদ্যোগ নয়, বরং এ ধরনের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পলিসি ইনপুট বা সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা জরুরি।

​জাতীয় এআই পলিসি: দ্রুত একটি যুগোপযোগী এআই নীতিমালা ও নীতিগত কমিটি গঠন করতে হবে, যা গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াবে।

সম্ভাবনার নতুন পথ
​প্রযুক্তি কোনও ভয় পাওয়ার মতো বিষয় নয়, এটি একটি সুযোগ। এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নিতে আসেনি, এসেছে কাজের গতি বাড়াতে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের কথায়, এআই হয়তো সরাসরি আপনার চাকরি নেবে না, কিন্তু এআই ব্যবহার করতে জানা একজন মানুষ আপনার জায়গাটি নিয়ে নেবে। বাংলাদেশ আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে সঠিক জাতীয় পলিসি, সরকারি সমর্থন এবং তরুণদের মেধা কাজে লাগাতে পারলে এই এআই বিপ্লব ও ই-কমার্সের বিস্তার আমাদের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। প্রথাগত শ্রমনির্ভরতার খোলস ছেড়ে প্রযুক্তির আধুনিক যুগে প্রবেশ করার সঠিক সময় এখনই।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা): ফাউন্ডিং মেম্বার, ই-ক্যাব; উদ্যোক্তা ও ই-কমার্স বিশ্লেষক

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *