ই-কমার্স টাস্কফোর্স: উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতির নতুন ভরসা
সোহেল মৃধা: বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির মানচিত্রে ই-কমার্স এখন আর কোনও সমান্তরাল শক্তি নয়, বরং এটি ৫ লাখেরও বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং ই-ক্যাব-এর ৩ হাজারেরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক সদস্যের জীবন-জীবিকার প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২৬ সাল নাগাদ ১.৫ ট্রিলিয়ন টাকার বিশাল বাজারের যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আমরা এগোচ্ছি, তার পূর্ণ সফলতায় প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ-এর ৭ দিনের মধ্যে ‘ই-কমার্স টাস্কফোর্স’ গঠনের ঘোষণাটি একটি বৈপ্লবিক ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
তবে এই উদ্যোগের সার্থকতা নির্ভর করছে কেবল একটি কমিটি গঠনের ওপর নয়, বরং আমলাতান্ত্রিক বেড়াজাল ভেঙে একটি সমন্বিত, ডেটা-নির্ভর এবং উদ্যোক্তাবান্ধব ইকোসিস্টেম ও নীতিমালা গড়ে তোলার ওপর। যখন দেশের ৫ লাখ উদ্যোক্তা বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে, তখন এই টাস্কফোর্সকে হতে হবে সেই স্বপ্নের অতন্দ্র প্রহরী। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার নতুন এক হাতিয়ার।
অর্থনৈতিক ডেটা ও বাজারের প্রবৃদ্ধির গভীর বিশ্লেষণ
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতের বার্ষিক লেনদেন বর্তমানে ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যার প্রবৃদ্ধি প্রতি বছর গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। কিন্তু বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেখানে উন্নত দেশগুলোতে খুচরা বাণিজ্যের প্রায় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ অনলাইনে সম্পন্ন হয়, সেখানে বাংলাদেশে এটি এখনও মাত্র ৩ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ। এই বিশাল ব্যবধানটিই প্রমাণ করে আমাদের সামনে উন্নয়নের কত বড় বাজার পড়ে আছে।
টাস্কফোর্স যদি ৫ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তবে ই-কমার্স হবে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম বৃহত্তম খাত। ২০২৭ সালের মধ্যে ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সের মাধ্যমে ১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা অর্জনে টাস্কফোর্সকে কাস্টমস ও শুল্কায়নের এনালগ বাধাগুলো দ্রুত উপড়ে ফেলতে হবে।
ডিবিআইডি ও পরিচয়পত্রের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন
উদ্যোক্তাদের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ও হয়রানির জায়গা হলো পরিচয়ের আধিক্য। একজন উদ্যোক্তার যদি বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, টিন এবং বিন থাকে, তবে তাকে কেন আবার ডিবিআইডি নামক নতুন একটি জটিল প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হবে? এই বহুস্তরীয় নিবন্ধন প্রক্রিয়া প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের মধ্যে তীব্র অনীহা সৃষ্টি করছে।
৫ লাখ উদ্যোক্তার বড় অংশই প্রান্তিক; তাদের জন্য এতগুলো সনদের বোঝা না চাপিয়ে এনআইডিভিত্তিক একটি ‘ইউনিক আইডি’ বা ট্রেড লাইসেন্সকেই ডিজিটাল আইডেন্টিটি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া সময়ের দাবি। আলাদাভাবে ডিবিআইডি বাধ্যতামূলক করা মানে হলো নতুন এক ধরণের আমলাতান্ত্রিক রাজত্ব কায়েম করা। তাই অ্যাসোসিয়েশন মেম্বারশিপ বা সরকারি যেকোনও একটি নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজকে ভিত্তি ধরেই সকল সুবিধা ওয়ান-পয়েন্ট সার্ভিসের আওতায় আনা উচিত।
ডিসিআরএএফ: ডেটানির্ভর নীতিনির্ধারণের অপরিহার্যতা
ই-কমার্স খাতের যেকোনও সংস্কারের জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিসংখ্যান ও নিবিড় গবেষণা, যা এতদিন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনুপস্থিত ছিল। এখানেই ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম (ডিসিআরএএফ) একটি বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করতে পারে। ডিসিআরএএফ-এর সংগৃহীত লজিস্টিকস ডেটা , ডেলিভারি ফেইলর রেট এবং প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের সমস্যা সংক্রান্ত পরিসংখ্যানই বলে দেবে প্রকৃত সংকট কোথায়।
টাস্কফোর্স যদি কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নীতিমালা তৈরি করে, তবে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। সরকারি দপ্তরের সিদ্ধান্তগুলো যখন গবেষণার ওপর ভিত্তি করে এবং ডিসিআরএএফ-এর মতো বিশেষায়িত ফোরামের উপাত্তের আলোকে তৈরি হবে, তখনই তা ৫ লাখ উদ্যোক্তার বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে পারবে। এই ফোরামকে টাস্কফোর্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রাখা হলে নীতিমালার মধ্যে মাঠ পর্যায়ের গবেষণার প্রতিফলন ঘটবে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কারিগরি বাস্তবায়ন
ই-কমার্স খাতের উন্নয়ন কেবল আইসিটি বিভাগের একক দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর এবং ডাক বিভাগের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। এই সমন্বয় নিশ্চিত করতে টাস্কফোর্সকে একটি সেন্ট্রাল ডিজিটাল কমার্স গেটওয়ে বা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস পোর্টাল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে-
সমন্বিত ডিজিটাল উইন্ডো: এনবিআরকে কাস্টমস অটোমেশনের মাধ্যমে রপ্তানি প্রক্রিয়াকে পেপারলেস করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে এই ওয়ান-স্টপ উইন্ডোর মাধ্যমে দ্রুত পেমেন্ট রিলিজ ও উদ্যোক্তাবান্ধব ডলার রেট নিশ্চিত করতে হবে।
এপিআই ইন্টিগ্রেশন: প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের ডেটাবেজ এই কেন্দ্রীয় পোর্টালে এপিআই-এর মাধ্যমে যুক্ত থাকবে, যাতে একজন উদ্যোক্তাকে একই তথ্য বারবার দিতে না হয়।
আইনি ক্ষমতা: আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে টাস্কফোর্সকে এমন আইনি ক্ষমতা দিতে হবে যাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এই ডিজিটাল পোর্টালে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা দিতে বাধ্য থাকে।
ইকোসিস্টেমের আমূল পরিবর্তন: লজিস্টিকস ও পেমেন্ট অটোমেশন
যদি আমরা লজিস্টিকস ও পেমেন্ট ইকোসিস্টেমকে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের আওতায় না আনি, তবে উন্নয়ন স্থবির হয়ে থাকবে।
স্মার্ট লজিস্টিকস ও ডাক বিভাগ: ডাক বিভাগের বিশাল নেটওয়ার্ককে এই সিস্টেমের লজিস্টিকস পার্টনার হিসেবে যুক্ত করে ডেলিভারি খরচ অন্তত ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে। পোস্টাল সার্ভিসকে আধুনিকায়ন করে ‘ফুলফিলমেন্ট সেন্টার’ বা ই-কমার্স হাব হিসেবে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।
অটোমেটেড সেটেলমেন্ট: পেমেন্ট গেটওয়েগুলোকে ওয়ান-স্টপ সিস্টেমের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করতে হবে যেন পণ্য ডেলিভারির তথ্য কুরিয়ার থেকে আসার সঙ্গে সঙ্গেই উদ্যোক্তার টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্যাশ-ফ্লো নিশ্চিত করবে।
আন্তর্জাতিক গেটওয়ে: ক্রস-বর্ডার বাণিজ্যের জন্য স্ট্রাইপ বা পে-প্যাল সমমান আন্তর্জাতিক গেটওয়ে ইন্টিগ্রেশন এবং শিপমেন্টে ৫ থেকে ১০ শতাংশ সরকারি প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।
নীতিগত সংস্কার ও কৌশলগত রোডম্যাপ
টাস্কফোর্স গঠন কেবল একটি সূচনামাত্র; এর স্থায়ীত্বের জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাহসী কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন-
ডিজিটাল কমার্স অ্যাক্ট: ই-কমার্স খাতের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন পাস করা।
রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স: নতুন উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির (যেমন স্মার্ট লকার বা ড্রোন ডেলিভারি) পরীক্ষামূলক ব্যবহারের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা।
লাইভ ড্যাশবোর্ড: টাস্কফোর্সের অধীনে ৫ লাখ উদ্যোক্তার কার্যক্রম এবং ই-ক্যাব সদস্যদের ডেটা রিয়েল-টাইমে মনিটর করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় লাইভ পোর্টাল রাখা।
ফিনটেক ইন্টিগ্রেশন: পেমেন্ট গেটওয়ে ও লজিস্টিকসকে ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্ত করে দ্রুত পেমেন্ট ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিত করা।
ইকোসিস্টেমের নিরাপত্তায় অতিরিক্ত কৌশলগত প্রস্তাবনা
ই-কমার্স ইকোসিস্টেমকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে নিচের পয়েন্টগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি
ডেলিভারি ইনস্যুরেন্স: লজিস্টিকস কোম্পানিগুলোর জন্য একটি বাধ্যতামূলক বিমা ব্যবস্থা চালু করা, যাতে পণ্য নষ্ট বা হারিয়ে গেলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণ পান।
ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিং: উদ্যোক্তাদের লেনদেনের ডেটা ব্যবহার করে ব্যাংক ঋণের জন্য একটি ‘ক্রেডিট স্কোরিং’ ব্যবস্থা চালু করা, যাতে ৫ লাখ উদ্যোক্তা জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা পান।
স্মার্ট রিফান্ড ভল্ট: ক্রেতার আস্থা ফেরাতে এসক্রো পেমেন্টের অধীনে একটি অটোমেটেড রিফান্ড ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
শেয়ার্ড ফুলফিলমেন্ট সেন্টার: জেলা পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে সাধারণ গুদাম বা ওয়্যারহাউস সুবিধা তৈরি করা, যা প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের লজিস্টিকস খরচ কমাবে।
সাম্প্রতিক নীতিগত উন্নয়ন ও টাস্কফোর্সের এজেন্ডা
৭ দিনের ঐতিহাসিক আল্টিমেটাম: চলতি মাসের গত ৬ মে রাজধানীর আইসিটি ভবনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ আগামী ৭ দিনের মধ্যে ই-কমার্স টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেন। এই ৫ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর এখন ৫ লাখ উদ্যোক্তা অধীর আগ্রহে সেই প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষা করছে।
ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স নীতিমালা: বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে একটি আধুনিক খসড়া তৈরি করেছে যেখানে দেশীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য সরাসরি বিদেশের বাজারে পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
এসক্রো পেমেন্ট অটোমেশন: বাংলাদেশ ব্যাংক এসক্রো সিস্টেমকে আরও বিকেন্দ্রেকরণ করার কাজ শুরু করেছে, যাতে উদ্যোক্তাদের টাকা ব্যাংকগুলোতে আটকে না থাকে এবং পেমেন্ট রিলিজ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অটোমেটেড হয়।
এখন বা কখনও নয়
বাংলাদেশের ৫ লাখ উদ্যোক্তা এবং ৩ হাজার ই-ক্যাব সদস্যের দীর্ঘদিনের দাবি ও আন্দোলনের ফসল এই টাস্কফোর্স। এই টাস্কফোর্স যদি ডিবিআইডি-র মতো জটিলতা দূর করে ‘ওয়ান আইডি’ পলিসি গ্রহণ করে এবং ডিসিআরএএফ-এর গবেষণালব্ধ ডেটা ব্যবহার করে নীতি প্রণয়ন করে, তবেই ২০২৬ সালের মধ্যে আমরা একটি স্মার্ট ই-কমার্স ইকোসিস্টেম দেখতে পাব। এটি কেবল একটি কমিটি নয়, বরং আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার নতুন হাতিয়ার।
নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে টাস্কফোর্স হলো ‘ইঞ্জিন’, কিন্তু সাহসী ও আধুনিক নীতিমালা হলো সেই ‘মহাসড়ক’ যার ওপর দিয়ে ৫ লাখ উদ্যোক্তার স্বপ্ন ও বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি এগিয়ে যাবে। সঠিক পরিকল্পনা এবং দ্রুত বাস্তবায়নই পারে বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারে একটি শক্তিশালী ই-কমার্স হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, এই ৫ লাখ উদ্যোক্তাই আগামী দিনের ডিজিটাল রুপান্তরের মূল কারিগর।
সোহেল মৃধা- ই-কমার্স উদ্যোক্তা এবং বিশ্লেষক





