ডিজিটাল ভূমি সেবায় বদলে যাচ্ছে নাগরিক অভিজ্ঞতা
ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ: একসময় জমির খতিয়ান তোলা, নামজারি (মিউটেশন) সম্পন্ন করা কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ ছিল সাধারণ মানুষের জন্য দীর্ঘসূত্রতা, হয়রানি ও অতিরিক্ত খরচের এক দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা। ইউনিয়ন ভূমি অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস কিংবা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যেত না। তথ্যের অস্বচ্ছতা, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হত নিয়মিত।
তবে তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই চিত্র। সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর কার্যক্রম এবং ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ধীরে ধীরে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। ফলে এখন ঘরে বসেই মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ বা কমপিউটারের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে অধিকাংশ ভূমি সেবা। এতে যেমন সময় ও খরচ কমছে, তেমনি বাড়ছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।
ঘরে বসেই মিলছে ভূমি সেবা
ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (ডিএলআরএস) গত কয়েক বছরে অনলাইনভিত্তিক বেশ কয়েকটি সেবা চালু করেছে। বর্তমানে নাগরিকরা অনলাইনে নামজারি আবেদন, ই-নামজারি নিষ্পত্তি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ সংগ্রহ, অভিযোগ দাখিল এবং ভূমি সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করতে পারছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগে একটি নামজারি সম্পন্ন করতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেত। এখন অনলাইন প্রক্রিয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে। প্রতিটি ধাপে এসএমএস নোটিফিকেশন চালু থাকায় আবেদনকারী তাৎক্ষণিকভাবে অগ্রগতির তথ্য জানতে পারছেন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, অটোমেশনের ফলে জনগণকে এখন আর সরাসরি ভূমি অফিসে যেতে হয় না। ঘরে বসেই অধিকাংশ সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এতে দুর্নীতি যেমন কমেছে, তেমনি সেবা প্রাপ্তিও সহজ হয়েছে। তবে জনগণকে সচেতন হতে হবে, যাতে তারা মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালচক্রের ফাঁদে না পড়েন।
অনলাইনে খাজনা পরিশোধে বাড়ছে স্বস্তি
আগে ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধ করতে ভূমি অফিসে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। অনেক সময় একাধিকবার যাতায়াত করতে হত। এতে সময় ও অর্থ দুইয়েরই অপচয় হত। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং এবং অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে ঘরে বসেই ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা যাচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ নাগরিক অনলাইনে খাজনা পরিশোধ করছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিও রয়েছেন, যারা বিদেশে বসেই নিজেদের জমির কর পরিশোধ করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ই-খাজনা ব্যবস্থার ফলে কর আদায়ে স্বচ্ছতা বেড়েছে এবং রাজস্ব আহরণও বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে জাল রসিদ বা অননুমোদিত অর্থ আদায়ের সুযোগ কমেছে।
নামজারিতে কমছে দালাল নির্ভরতা
জমি কেনাবেচার পর মালিকানা হালনাগাদ করতে নামজারি বা মিউটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। অতীতে এই প্রক্রিয়া ছিল সবচেয়ে জটিল এবং হয়রানিপূর্ণ। আবেদনকারীদের অনেকেই দালালের সহায়তা নিতে বাধ্য হতেন এবং সরকারি ফি’র চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা ব্যয় করতেন।
বর্তমানে অনলাইনে নামজারি আবেদন চালুর ফলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আবেদনকারী নিজেই অনলাইনে আবেদন করতে পারছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড করতে পারছেন এবং মোবাইল ফোনে আবেদনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটির বেশি ই-নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পেন্ডিং আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মাঠ প্রশাসনকে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) নাসরিন জাহান বলেন, অনলাইনে নামজারির আবেদন চালুর ফলে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে।
খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ এখন হাতের নাগালে
ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ ও প্রতারণা প্রতিরোধে খতিয়ান এবং মৌজা ম্যাপ যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে এসব তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হত। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনাও ঘটত। বর্তমানে অনলাইনে জমির মালিকানা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং জমির পরিমাণ যাচাই করা যাচ্ছে। ফলে জমি কেনাবেচার আগে তথ্য যাচাই সহজ হয়েছে এবং প্রতারণার ঝুঁকিও কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবস্থার ফলে জমি সংক্রান্ত বিরোধ, জাল দলিল তৈরি এবং একই জমি একাধিকবার বিক্রির মতো অপরাধ কমে আসবে।
দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমছে
একসময় ভূমি অফিসকে ঘিরে গড়ে ওঠা দালালচক্র সাধারণ মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করত। তথ্যের অভাব এবং জটিল প্রক্রিয়ার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে তাদের সহায়তা নিতেন। বর্তমানে নির্ধারিত ফি, সময়সীমা এবং আবেদন প্রক্রিয়া অনলাইনে উন্মুক্ত থাকায় অতিরিক্ত অর্থ দাবি বা অযৌক্তিক বিলম্বের সুযোগ কমেছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার কারণে কোন কর্মকর্তা কতদিন ধরে একটি আবেদন আটকে রেখেছেন, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
গড়ে ওঠছে সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজ
ভূমি মন্ত্রণালয় দেশের সব ভূমি রেকর্ড, খতিয়ান এবং মৌজা ম্যাপ একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলার পুরোনো রেকর্ড স্ক্যান করে ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে জিআইএস (জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম) প্রযুক্তির মাধ্যমে মানচিত্রভিত্তিক জমির তথ্য দেখার সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ কমবে এবং মামলা-মোকদ্দমাও হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাল কাগজপত্র শনাক্তকরণ, একই জমি একাধিকবার বিক্রির চেষ্টা প্রতিরোধ এবং আবেদন দ্রুত যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তোফাজ্জল হোসেন বলেন, অটোমেশনের মাধ্যমে ভূমি সেবার ডেটাবেজ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানচিত্রভিত্তিক তথ্যসেবা চালু হলে জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও মামলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
যদিও ডিজিটাল ভূমি সেবা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি এনে দিয়েছে, তবুও এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে অনেক মানুষ অনলাইন সেবা ব্যবহারে অভ্যস্ত নন। ইন্টারনেট সুবিধার সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব এবং সাইবার প্রতারণার ঝুঁকিও উদ্বেগের বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তিগত সহায়তা জোরদার করতে পারলে ভূমি ব্যবস্থাপনায় আরও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। ভূমি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং রাজস্ব বিভাগের তথ্য সমন্বিত একটি প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে জমি কেনাবেচার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিকানা হালনাগাদ করা সম্ভব হবে। এতে ভূমি ব্যবস্থাপনা হবে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব।





