দীর্ঘ অপেক্ষার পর ই-ক্যাব নির্বাচন ১৯ ডিসেম্বর, ফিরছে সদস্যদের ভোটাধিকার
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা): দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অচলাবস্থা, আইনি জটিলতা ও নেতৃত্বহীনতার পর অবশেষে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ফিরেছে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক আদেশ এবং নির্বাচন বোর্ড ঘোষিত তফসিলের ফলে সাধারণ সদস্যদের মধ্যে নিজেদের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
২০১৪-১৫ সালে ই-ক্যাব প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় সরাসরি গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলেও সাধারণ সদস্যদের আন্দোলন, দাবি ও লেখালেখির পর ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো সরাসরি ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হয়। তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ সহজ করতে সে সময় মনোনয়ন ফি ৭৫ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকায় আনা হয়। এর ফলে তরুণ ও অরাজনৈতিক উদ্যোক্তাদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ তৈরি হয়।
২০২৪ সালের ২৭ জুলাই নির্ধারিত নির্বাচন তৎকালীন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে দুই দফায় সরকারি প্রশাসক নিয়োগ হলেও আইনি জটিলতায় আটকে যায় ই-ক্যাবের নির্বাচনী প্রক্রিয়া। এরপর বিগত সরকারের আমলে দুই দফায় সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হলেও ই-ক্যাব আইনি বেড়াজালে আটকে পড়ে। মূলত সরাসরি ব্যালটের লড়াই এড়াতে এবং পকেট কমিটি গঠনের অপকৌশল হিসেবেই রাজনৈতিক প্রভাব ও আইনি প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন ও আইনি প্রক্রিয়ার সাফল্য
ই-ক্যাবে অরাজনৈতিক পরিবেশ ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় সদস্যদের পক্ষ থেকে গত ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি দেয়া হয় (যার অনুলিপি বাণিজ্য মন্ত্রী ও সচিব সহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে পাঠানো হয়)। চিঠিতে রিট পিটিশনটির জরুরি শুনানির ব্যবস্থা করে আইনি বাধা দূর করা এবং বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২৫ অনুযায়ী সরাসরি ব্যালটে অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি জানানো হয়েছিল।
পরবর্তীতে হাইকোর্টে রিট পিটিশনটি (নং ১১৬০০/২০২৫) নিষ্পত্তি হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্বাচন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর (স্মারক নম্বর: ২৬.০০.০০০০.০০০.০৪৩.৯৯.০০১.২৫-১৬) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক আদেশে ডব্লিউটিও শাখা-৫ এর উপসচিব শরীফ মোস্তাফিজুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে ৩ সদস্যের নির্বাচন বোর্ড এবং যুগ্মসচিব সুফিয়া আক্তার রুমীকে চেয়ারম্যান করে ৩ সদস্যের অ্যাপিল আপিল বোর্ড গঠন করে।
পুনর্গঠিত নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান হলেন উপসচিব (ডব্লিউটিও শাখা-৫, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়) শরীফ মোস্তাফিজুর রহমান এবং সদস্যদ্বয় হলেন উপসচিব (পরিকল্পনা-১ শাখা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়) ফিরোজ আল মামুন ও উপনিয়ন্ত্রক (এফটিএ-৪, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়) মো. সিরাজুল ইসলাম।
পুনর্গঠিত নির্বাচন অ্যাপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান হলেন যুগ্মসচিব (টিএসএম অধিশাখা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়) সুফিয়া আক্তার রুমী এবং সদস্যদ্বয় হলেন যুগ্মসচিব (প্রশাসন-২ অধিশাখা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়) ও সিনিয়র সহকারী সচিব (টিএসএম-১ শাখা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়) মো. মাহবুবুর রহমান।
২০২৬-২০২৮ মেয়াদের নির্বাচনী সময়সূচী ও পদের তথ্য
গত ২৯ সেপ্টেম্বর স্মারক নম্বর ই-ক্যাব/নির্বাচন বোর্ড/২০২৬-২০২৮/০১ অনুযায়ী ১১টি পদের (সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক, অর্থ সম্পাদক ও ৫টি পরিচালক পদ) জন্য নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়।
২৯ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের তফসিল ও আচরণবিধি প্রকাশ করা হয়। সদস্যপদ নবায়ন, বকেয়া চাঁদা (৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত) পরিশোধ ও কাগজপত্র জমার শেষ সময় ১৯ অক্টোবর (সোমবার, বিকাল ৫টা)। প্রাথমিক ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে ২৯ অক্টোবর। প্রাথমিক ভোটার তালিকার ওপর অ্যাপিল বোর্ডে আপত্তি দাখিল ৩০ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর। নির্বাচন বোর্ড কর্তৃক চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে ৫ থেকে ৬ নভেম্বর।
নির্বাচন বোর্ড/সমিতি অফিস হতে নির্বাচনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিল করার সময় ৬ থেকে ১২ নভেম্বর। বৈধ প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে ২৫ নভেম্বর। লিখিতভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৬ থেকে ২৮ নভেম্বর। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে ২৮ নভেম্বর। ১৯ ডিসেম্বর (শনিবার) সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশ করা হবে। নির্বাচন বোর্ড কর্তৃক চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে ২৩ ডিসেম্বর।
মনোনয়নপত্র ফি (অফেরৎযোগ্য)
সভাপতি পদে ১,২০,০০০ টাকা; সিনিয়র সহসভাপতি পদে ১,১০,০০০ টাকা; সহসভাপতি পদে ১,০৫,০০০ টাকা; সাধারণ সম্পাদক পদে ১,০০,০০০ টাকা; যুগ্ম সম্পাদক পদে ৮০,০০০ টাকা; অর্থ সম্পাদক পদে ৭০,০০০ টাকা এবং পরিচালক (৫টি পদ) প্রতি পদের জন্য ৫০,০০০ টাকা।
নতুন নেতৃত্বের প্রতি শুভকামনা ও শুভ বুদ্ধি উদয়ের আহ্বান
এই নির্বাচনে যারা অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের সবাইকে আগাম অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। ই-ক্যাবে অরাজনৈতিক ও সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন-
মনোনয়ন ফি কমানোর আকুল আবেদন: ই-ক্যাবের ৯৯ ভাগ সদস্যই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা। তফসিলে সভাপতি পদে ১ লাখ ২০ হাজার ও পরিচালক পদে ৫০ হাজার টাকা ফি রাখা হয়েছে, যা ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বড় আর্থিক চাপ। ২০২২ সালের মতো ফি কমিয়ে এটি সাধ্যের মধ্যে আনার জন্য নির্বাচন বোর্ডের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
প্রার্থীদের প্রতি শুভকামনা: নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া প্রতিটি প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রতি শুভকামনা রইল। কোনও দলীয় কাদা ছোড়াছুড়ি না করে সবাই যেন ই-কমার্স খাতের সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিযোগিতা করেন।
আইনি ও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ বন্ধের অনুনয়: অতীতে যেমন রিটের অজুহাতে ও রাজনৈতিক প্রভাবে সাধারণ সদস্যদের ভোটাধিকার আটকে দেয়া হয়েছিল, এবার যেন কোনও ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে আর সেই চেষ্টা করা না হয়। কোনও অপশক্তি যেন নির্বাচন পণ্ড করতে না পারে, সেজন্য সব সদস্যকে সজাগ থাকতে হবে।
স্বচ্ছ ভোটার তালিকা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ভোট: বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী ভুয়া প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে কেবল প্রকৃত উদ্যোক্তাদের নিয়ে নির্ভুল ভোটার তালিকা করতে হবে। যেকোনও দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া গোপন ব্যালটে নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা নির্বাচন বোর্ডের দায়িত্ব।
ই-ক্যাবকে একটি অরাজনৈতিক, স্বাবলম্বী ও পেশাদার সংগঠন হিসেবে বাঁচিয়ে রাখা এবং ৫ লাখ উদ্যোক্তার স্বপ্ন সুরক্ষিত করা আমাদের যৌথ দায়িত্ব। নতুন সরকারের ব্যবসাবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিলিয়ে নির্বাচন বোর্ড ও অ্যাপিল বোর্ড একটি সম্পূর্ণ দলীয় প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ নির্বাচন উপহার দেবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। আসুন, সব বাধা দূর করে আগামী ১৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আমরা সবাই মিলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিই। জয় হোক মেম্বারদের অধিকারের, ই-ক্যাবে ফিরে আসুক যোগ্য, পেশাদার ও অরাজনৈতিক নতুন নেতৃত্ব!
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা)- ফাউন্ডিং মেম্বার, ই-ক্যাব; উদ্যোক্তা ও ই-কমার্স বিশ্লেষক





