‘সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) বিল, ২০২৬’: কমল কিছু সাজা, বাড়ল ডিজিটাল নিরাপত্তার সুরক্ষা
ক.বি.ডেস্ক: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ক্ষতিকর, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের বিধান সংযোজন এবং বিদ্যমান আইনের বিতর্কিত কয়েকটি ধারা সংশোধনের মাধ্যমে ‘সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে। সংশোধিত আইনে কয়েকটি ধারার শাস্তি পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পরিবর্তে অর্থদণ্ড বা অপেক্ষাকৃত কম শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
সংশোধিত আইনের মাধ্যমে একদিকে যেমন এআই-সৃষ্ট ক্ষতিকর কনটেন্ট মোকাবিলায় নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যমান আইনের জুয়া-সংক্রান্ত ধারা বাতিল করে বিষয়টি নতুন আইনের আওতায় নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোতে সাইবার হামলা, সরকারি তথ্যব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ, পরিচয় চুরি, আর্থিক জালিয়াতি, র্যানসমওয়্যার হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবায় বিঘ্ন সৃষ্টি এসব অপরাধের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বিলটি উত্থাপন করলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে তা পাস হয়।
মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘‘সংশোধনীর মাধ্যমে মেটা সহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বিতর্কিত, ক্ষতিকর ও মানহানিকর কনটেন্ট অপসারণ করতে হবে। সংশোধনীর মাধ্যমে ভুল তথ্য (মিসইনফরমেশন) এবং মানহানির সংজ্ঞা হালনাগাদ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এ ধরনের অপরাধের জন্য আরও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে মেটার মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আপত্তিকর কনটেন্ট অপসারণে বাধ্য করার আইনি বিধান রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে এমন কার্যকর প্রয়োগ ব্যবস্থা নেই। নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করা হবে।’’
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, বিশেষ করে জেনারেটিভ এআইয়ের মাধ্যমে ভুয়া ছবি, ভিডিও, ডিপফেক এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় আইনে নতুন বিধান যুক্ত করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে অনলাইন জুয়া ও বেটিং-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন হওয়ায় বিদ্যমান আইনের সঙ্গে দ্বৈততা দূর করতেও এই সংশোধনী আনা হয়েছে।
সংশোধিত আইনে যেসব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে
১. এআই-সৃষ্ট ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ
নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি ক্ষতিকর, বিভ্রান্তিকর, প্রতারণামূলক বা মানহানিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সরকারের মতে, ডিপফেক ও এআই-নির্ভর ভুয়া তথ্যের বিস্তার ঠেকাতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
২. জুয়া-সংক্রান্ত ধারা বাতিল
সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২০ নম্বর ধারা, যেখানে অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত বিধান ছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। কারণ, একই বিষয়ে পৃথক জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ প্রণীত হওয়ায় একই অপরাধ নিয়ে দুই আইনের দ্বৈততা দূর করার প্রয়োজন দেখা দেয়।
৩. কোটি টাকা জরিমানার বিধান বাদ
সংশোধনের মাধ্যমে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় থাকা সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধানও বাতিল করা হয়েছে। ফলে শাস্তির কাঠামো নতুন আইনি ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে।
বিলের ওপর আলোচনায় বিভিন্ন সংসদ সদস্য সাইবার অপরাধ, বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি, ভুয়া তথ্য প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সাইবার আইন যেন কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার বা নাগরিক হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না হয়। তারা আইনের প্রয়োগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মানবাধিকার বিবেচনায় রাখার আহ্বান জানান।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া অডিও, পরিচয় জালিয়াতি এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই ক্ষতিকর এআই কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের আইনি ভিত্তি তৈরি হওয়া সময়োপযোগী উদ্যোগ। ক্ষতিকর বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের সংজ্ঞা, অপসারণের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা যেন স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে বৈধ মতপ্রকাশ ও সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না হয়।
সংশোধিত আইন কার্যকর হলে- এআই ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া বা ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের আইনি ভিত্তি শক্তিশালী হবে। অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত অপরাধ পৃথক আইনের আওতায় পরিচালিত হবে। আইনের কিছু বিতর্কিত শাস্তিমূলক বিধান পুনর্বিন্যাস হওয়ায় পূর্বের আইনের সঙ্গে থাকা দ্বৈততা কমবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার বিষয়টি ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) বিল, ২০২৬ বাংলাদেশের সাইবার আইন কাঠামোকে নতুন প্রযুক্তিগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে এআই-সৃষ্ট বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধান সংযোজন এবং জুয়া-সংক্রান্ত ধারার পুনর্বিন্যাস আইনের অন্যতম বড় পরিবর্তন। তবে আইনটির সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে এর স্বচ্ছ প্রয়োগ, মানবাধিকার সংরক্ষণ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর।





