আমরা কি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছি, নাকি সোশ্যাল মিডিয়াই আমাদেরকে ব্যবহার করছে?
ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ: সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম কাজ কী? অনেকের উত্তর হবে মোবাইল ফোন হাতে নেয়া। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ইমো, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, কিংবা এক্সে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়া। দিনের বিভিন্ন সময়ে কয়েক মিনিটের জন্য অ্যাপ খুললেও কখন যে ঘণ্টাখানেক কেটে যায়, তা অনেকেই টের পান না। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছি, নাকি সোশ্যাল মিডিয়াই আমাদের আচরণ, সিদ্ধান্ত ও সময়কে নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘এই প্রশ্ন এখন আর কেবল দার্শনিক বিতর্ক নয়; এটি প্রযুক্তি, মনোবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং গণতন্ত্র সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। মনোযোগই এখন সবচেয়ে মূল্যবান পণ্য।’
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ‘অনেকেই মনে করেন, ফেসবুক বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মের প্রধান পণ্য হলো সামাজিক যোগাযোগ। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন, এসব প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসা বিজ্ঞাপন। আর বিজ্ঞাপন বিক্রির জন্য প্রয়োজন ব্যবহারকারীর মনোযোগ। আপনি যত বেশি সময় একটি প্ল্যাটফর্মে থাকবেন, তত বেশি বিজ্ঞাপন দেখবেন এবং প্রতিষ্ঠানটির আয়ও তত বাড়বে। এ কারণেই প্রতিটি প্ল্যাটফর্ম এমনভাবে নকশা করা হয়, যাতে ব্যবহারকারী যতটা সম্ভব বেশি সময় সেখানে কাটান।’
সোশ্যাল মিডিয়ার নকশায় মানুষের মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে ব্যবহার করা হয়। যখন একটি পোস্টে লাইক, মন্তব্য বা নতুন নোটিফিকেশন আসে, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন নামের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়। এটি আনন্দ ও প্রত্যাশার অনুভূতি তৈরি করে।
এ কারণেই অনেক ব্যবহারকারী অজান্তেই বারবার ফোন হাতে নেন, নতুন কিছু এসেছে কি না তা দেখার জন্য। অবিরাম স্ক্রল (ইনফিনিট স্ক্রল), স্বয়ংক্রিয় ভিডিও চালু হওয়া, ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট সাজিয়ে দেয়া এবং নোটিফিকেশনের মতো ফিচারগুলো ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই তৈরি।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম শুধু আপনি কী পোস্ট করেন, তা নয়; আপনি কোন ভিডিও কতক্ষণ দেখলেন, কোথায় থামলেন, কী লাইক করলেন, কী এড়িয়ে গেলেন এসব তথ্যও বিশ্লেষণ করে। এই তথ্যের ভিত্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিটি ব্যবহারকারীর জন্য আলাদা কনটেন্ট নির্বাচন করে। ফলে একই ঘটনার জন্য দুই ব্যক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের তথ্য দেখতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা একে ‘ফিল্টার বাবল’ বা ‘ইকো চেম্বার’ বলে থাকেন। এতে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের মতের সঙ্গে মিল থাকা তথ্যই বেশি দেখতে শুরু করে।
সোশ্যাল মিডিয়া শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি এখন জনমত গঠনেরও শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। নির্বাচন, সামাজিক আন্দোলন, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য কিংবা আন্তর্জাতিক সংঘাত সব ক্ষেত্রেই সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা বাড়ছে। কিন্তু একই সঙ্গে ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে কোন তথ্য সত্য, আর কোনটি নয় তা নির্ধারণ করা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে ওঠেছে।
শিশু-কিশোরদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘শিশু ও কিশোরদের মস্তিষ্ক তখনও বিকাশমান থাকে। তাই সামাজিক স্বীকৃতি, তুলনা এবং অনলাইন প্রতিক্রিয়া তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সঙ্গে উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি এবং আত্মসম্মানবোধ কমে যাওয়ার সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে গবেষকেরা এটিও বলছেন, সব ধরনের ব্যবহার ক্ষতিকর নয়। ব্যবহারের ধরন, সময় এবং উদ্দেশ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সামাজিক মনোবিজ্ঞানী জোনাথন হেইড্ট মনে করেন, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব শুধু কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নয়, মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার সক্ষমতার ওপরও পড়ছে। স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের মনোযোগকে ক্রমাগত খণ্ডিত করছে, যা ব্যক্তিগত উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক সম্পর্ক দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সপ্তাহে অন্তত এক দিন ‘ডিজিটাল বিরতি’ নেয়া এবং শিশু-কিশোরদের জন্য ফোনমুক্ত বিদ্যালয় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা নির্ধারণের পক্ষে মত দিয়েছেন।’’
আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ)-এর প্রেসিডেন্ট ডা. থেরেসা এম মিসকিমেন রিভেরা বলেছেন, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বাড়ছে, যা ইতিবাচক। তবে এসব তথ্য অবশ্যই বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক কি না, তা যাচাই করা জরুরি। প্রয়োজনে সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্যের ওপর নির্ভর না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবাদাতার পরামর্শ নেয়া উচিত। এপিএর ২০২৫ সালের জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারী ইতোমধ্যে নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সময় কমিয়েছেন।’’
কম্পিউটেশনাল সামাজিক বিজ্ঞানী ড. মুনমুন দে চৌধুরীর গবেষণা বলছে, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়া স্বাস্থ্য গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হলেও, একই সঙ্গে এটি গোপনীয়তা, পক্ষপাত, ভুল সিদ্ধান্ত এবং নৈতিক ঝুঁকির নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হলে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা এখন বড় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে পরিচয় চুরি, সামাজিক প্রকৌশল, ভুয়া বিনিয়োগ, ফিশিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে। তাই ব্যবহারকারীদের দ্বি-ধাপ যাচাইকরণ (টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন) চালু রাখা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা এবং ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে সংযমী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।’
সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক দিকও কম নয়
সমালোচনার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক দিকও রয়েছে। দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, অনলাইন শিক্ষা, ব্যবসা ও উদ্যোক্তা তৈরি, জরুরি পরিস্থিতিতে তথ্য ছড়িয়ে দেয়া এবং দক্ষতা প্রদর্শন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়াকে কেন্দ্র করেই সফল ব্যবসা গড়ে তুলেছেন।
তাহলে সমাধান কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া ত্যাগ নয়; সচেতন ব্যবহারই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। এর জন্য কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে- নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার না করা। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন ব্যবহার কমানো। তথ্য শেয়ার করার আগে সত্যতা যাচাই করা। মাঝে মাঝে ডিজিটাল বিরতি নেয়া। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অফলাইন সময় বাড়ানো।
বিশ্বজুড়ে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও উন্নত হচ্ছে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমও আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠছে। আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা হতে পারে মানুষের সময়, মনোযোগ এবং সিদ্ধান্তকে ঘিরে।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, এতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রযুক্তি যেন আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ না করে, সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায় আমরা কি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছি, নাকি সোশ্যাল মিডিয়াই আমাদের ব্যবহার করছে? এর উত্তর নির্ভর করছে আমরা কতটা সচেতনভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, তার ওপর।





