অন্যান্য মতামত

সুইডেন কেন স্কুল থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার কমিয়ে আবার বই-খাতায় ফিরছে?

শ্রেণিকক্ষে ল্যাপটপ ও ট্যাবলেটের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ, গুরুত্ব বাড়ছে মুদ্রিত বই, হাতে লেখা ও গভীর মনোযোগ দিয়ে শেখার ওপর

ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ তুষার: একসময় শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছিল সুইডেন। শ্রেণিকক্ষে প্রচলিত পাঠ্যবইয়ের জায়গা দখল করেছিল ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট। এমনকি প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের হাতেও তুলে দেয়া হয়েছিল ডিজিটাল ডিভাইস। পাঠদান কার্যক্রম ক্রমেই অনলাইননির্ভর হয়ে ওঠছিল। মনে করা হচ্ছিল, ডিজিটাল প্রযুক্তিই শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।

তবে সময়ের সঙ্গে এই প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠতে শুরু করে। ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সুইডেনের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পঠনদক্ষতায় অবনতি দেখা যায়। শিক্ষাবিদ ও গবেষকেরা শিশুদের মনোযোগ, পাঠের গভীর অনুধাবন এবং ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে দেশটি।

সুইডেনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়ার বিষয়টি এখানেই। প্রযুক্তি ও প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি না করে বরং দুটির কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে হবে

বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল বিবিসি ‘ব্যাক টু বুকস-সুইডেন্স স্কুলস কাটিং ব্যাক অন ডিজিটাল লার্নিং’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে সুইডেনের স্কুলগুলোতে ডিজিটাল শিক্ষার ব্যবহার কমিয়ে মুদ্রিত বই, কাগজ-কলম ও প্রচলিত পাঠদানে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। এর আগে একই বছরের ২ এপ্রিল ইউনেস্কো ‘সুইডেন: দ্য আনমেট প্রমিসেস অব দ্য ডিজিটাল ক্লাসরুম’ শিরোনামে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে সুইডেনের ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থার অভিজ্ঞতা ও নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি থেকে বই-খাতায় ফেরার উদ্যোগ
এই বাস্তবতায় শিক্ষানীতিতে পরিবর্তন আনছে সুইডেন। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার আর বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি। শিক্ষার্থীদের জন্য মুদ্রিত পাঠ্যবই ও শিক্ষকদের সহায়ক নির্দেশিকা সরবরাহে ২১০ কোটি সুইডিশ ক্রোনারের বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি হাতে লেখার অভ্যাস, বই পড়ার নির্দিষ্ট সময় এবং প্রচলিত শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হলেই চলবে না; তাদের মধ্যে কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও মৌলিক গবেষণার আগ্রহও তৈরি করতে হবে

বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সুইডেন প্রযুক্তি গ্রহণ ও ব্যবহারে বিশ্বের অগ্রগামী দেশগুলোর একটি। সেই দেশই শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলাফল পর্যালোচনা করে মুদ্রিত বই ও প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির গুরুত্ব পুনরায় উপলব্ধি করছে। এটি প্রযুক্তির প্রতি ভীতি নয়; বরং শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতি কতটা কার্যকর, তা বাস্তব অভিজ্ঞতা ও গবেষণার আলোকে মূল্যায়নের একটি উদ্যোগ। ডিজিটাল ডিভাইসের নোটিফিকেশন, স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ এবং অনলাইন কনটেন্টের মধ্যে বারবার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের গভীরভাবে শেখার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন ব্যবহারে ভারসাম্য
অবশ্যই শিশুদের ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন করতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ছাড়া এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। কিন্তু তাই বলে প্রতিটি পাঠের জন্য একটি শিশুর হাতে ট্যাবলেট তুলে দেয়ার প্রয়োজন আছে কি না, সেটি ভেবে দেখা জরুরি। শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো গভীর মনোযোগ। কোনও নোটিফিকেশন বা ডিজিটাল বিঘ্ন ছাড়াই একটি বিষয় পড়া, বোঝা, বিশ্লেষণ করা এবং নিজের চিন্তা দিয়ে নতুন কিছু তৈরি করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে মুদ্রিত বইয়ের ভূমিকা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে হাতে লেখার অভ্যাস শিক্ষার্থীদের চিন্তাকে সুসংগঠিত করতে এবং নিজস্বভাবে ধারণা প্রকাশ করতে সহায়তা করে।

এটি প্রযুক্তির প্রতি ভীতি নয়; বরং শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতি কতটা কার্যকর, তা বাস্তব অভিজ্ঞতা ও গবেষণার আলোকে মূল্যায়নের একটি উদ্যোগ

শিক্ষার্থীদের শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হলেই চলবে না; তাদের মধ্যে কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও মৌলিক গবেষণার আগ্রহও তৈরি করতে হবে। কাগজ-কলমে লেখালেখি, নিজ হাতে ছবি, নকশা ও গ্রাফিকস আঁকা এবং প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে পর্যবেক্ষণের অভ্যাস এসব দক্ষতা বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া যেতে পারে।

প্রযুক্তির ব্যবহার কমানোও হতে পারে উদ্ভাবনী সিদ্ধান্ত
আজকের বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমেই গবেষণা, জ্ঞান উৎপাদন ও সৃজনশীলতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠছে। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু তার প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নয়; বরং নাগরিকদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করাই সব সময় উদ্ভাবনের একমাত্র পথ নয়। কখন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, আর কখন সেটি সরিয়ে রেখে বই, খাতা ও কলমের সাহায্যে মনোযোগ দিয়ে শেখা প্রয়োজন সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারাও একধরনের প্রজ্ঞা।

সুইডেনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়ার বিষয়টি এখানেই। প্রযুক্তি ও প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি না করে বরং দুটির কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিতে দক্ষ করার পাশাপাশি চিন্তাশীল, সৃজনশীল ও জ্ঞাননির্ভর মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দেবে তারাই, যারা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করতে জানবে না, বরং নিজেদের জ্ঞান ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে প্রযুক্তিকে নতুন কিছু সৃষ্টির কাজে লাগাতে পারবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *