মেধা পাচার রোধ ও নতুন ইকোসিস্টেম, তরুণ উদ্যোক্তাদের পাশে সরকার
সোহেল মৃধা: আজকের বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে তরুণ প্রজন্মের এক বিশাল জোয়ারের ওপর, কারণ দেশের জনসংখ্যার সিংহভাগই এখন অফুরন্ত সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজ। এই বিপুল তারুণ্যের মেধা, উদ্ভাবনী শক্তি ও উদ্যোক্তা হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে টেকসই রূপ দেয়া না গেলে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর অসম্ভব।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত ‘তারুণ্য, স্টার্টআপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের এই নতুন অর্থনীতির মূল রূপরেখাটি স্পষ্ট করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, “আমরা চাই না দেশের মেধা বাইরে চলে যাক, বরং দেশের মাটিতেই যেন তারা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে।”
তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতি সরকারের এই নীতিগত অবস্থান এবং আইসিটি বিভাগের উদ্যোগে একই দিনে উন্মোচিত হওয়া ‘জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম’ দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে।
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও তরুণদের স্বপ্নপূরণ
বর্তমান সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে সম্পূর্ণ একটি ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। দুঃখজনক মেধা পাচার রোধে বর্তমান সরকার একটি কঠোর ও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে তাঁর নিজের জীবনের দীর্ঘ প্রতিকূলতা, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং ব্যবসার বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তরুণদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘‘আত্মবিশ্বাস ও সততা থাকলে যেকোনও সংকটে পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব’’।
তরুণদের এই আত্মবিশ্বাসকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬-এর প্রধান প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ স্টার্টআপ ফান্ড বা তহবিল গঠন করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য কেবল কিছু তরুণকে টাকা দেয়া নয়, বরং এমন একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করা যেখানে একটি নতুন আইডিয়া বা স্টার্টআপ খুব সহজেই বেড়ে ওঠতে পারে এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।
নতুন প্ল্যাটফর্মের রূপরেখা ও পুরনো ধাঁচের অবসান
আইসিটি বিভাগের বিশেষ প্রজ্ঞাপন ও সরকারের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সদ্য গঠিত ‘জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম’ নিয়ে দেশের ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এটি কি অতীতে থাকা ‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড’-এরই অন্য রূপ কি না। এর সহজ উত্তর হলো, এটি আগের কাঠামোর একটি উন্নত, পরিবর্ধিত ও সর্বজনীন সংস্কার।
এই নতুন ‘জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম’ একটি সমন্বিত ছাতা বা অভিভাবক ইকোসিস্টেম। এটি কেবল বড় কোম্পানি নয়, বরং একদম প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্ভাবনী ভাবনা, ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা, অনলাইন ও ফেসবুক ভিত্তিক ই-কমার্স এবং দেশের ঐতিহ্যবাহী কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পকে একই ছাদের নিচে নিয়ে এসেছে। এই প্ল্যাটফর্মটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সরাসরি অনুদান, জামানতহীন ঋণ এবং একই সঙ্গে আইনি ও লজিস্টিকস সহায়তা দিতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দায়বদ্ধ।
জামানত ছাড়াই মিলবে ঋণ: সহজ হচ্ছে ব্যাংকিং নিয়ম
বাংলাদেশের তরুণ বা নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসার পথে সবচেয়ে বড় পাহাড় ছিল ব্যাংকিং খাতের প্রথাগত ঋণ ব্যবস্থা। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলেই জামানত, স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক এবং শত পদের নথিপত্রের জন্য নতুন উদ্যোক্তাদের বছরের পর বছর ঘুরতে হতো, যা তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নকে শুরুতেই শেষ করে দিত। এই পুঞ্জীভূত সংকট দূর করতে বর্তমান সরকার ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিং মডেলে এক আমূল ও যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। সংসদে পাস হওয়া নীতিমালার আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ এবং এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের বিশেষ পরিপত্রের অধীনে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই নতুন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
এই নতুন আইনের অধীনে, যোগ্য উদ্যোক্তারা তাদের প্রজেক্টের সম্ভাবনা এবং মেধার ওপর ভিত্তি করে সর্বনিম্ন ৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সরাসরি সরকারি আর্থিক সহায়তা ও ঋণ পাবেন। এর সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি হলো, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ মিলবে সম্পূর্ণ বিনা জামানতে। সরকারের নিজস্ব ৫০০ কোটি টাকার প্রাথমিক তহবিলের একটি বড় অংশ ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম হিসেবে কাজ করবে, যা ব্যাংকগুলোর ঋণ ঝুঁকি সম্পূর্ণ হ্রাস করবে। ফলে ব্যাংকগুলো নতুন উদ্যোক্তাদের মাত্র ৪% থেকে ৭% সুদে জামানতহীন ঋণ দিতে আইনগতভাবে বাধ্য থাকবে এবং কোনোভাবেই কোনও স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক চাইতে পারবে না।
সরকারি সহায়তায় প্রাধান্য পাবে যে ৪টি খাত
নতুন এই উদ্যোগের আওতা কেবল আইটি সেক্টরেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরং দেশের অর্থনীতির বাস্তব চাহিদাকে বিবেচনা করে এই প্ল্যাটফর্মের সুযোগ-সুবিধাকে প্রধান চারটি খাতে বিন্যস্ত করা হয়েছে-
১. তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রজেক্ট-ভিত্তিক স্টার্টআপ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফিনটেক (আর্থিক প্রযুক্তি), এডুটেক (শিক্ষামূলক প্রযুক্তি) এবং বিশেষ করে লজিস্টিকস ও ডেটা অ্যানালিটিক্স নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো এর আওতাভুক্ত। যেসব তরুণ নতুন সফটওয়্যার বা প্রযুক্তিনির্ভর সেবা তৈরি করছেন, তাদের প্রাথমিক কোডিং, প্রোটোটাইপ বা বেটা ভার্সন তৈরির সব খরচ এই প্ল্যাটফর্ম থেকে দেয়া হবে।
২. ই-কমার্স ও অনলাইন উদ্যোক্তা: বর্তমান দেশের একটি বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী এবং বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তারা ফেসবুক ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, ডিজিটাল কমার্স পরিচালনাকারী এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের এই প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধনের মাধ্যমে সরাসরি বৈধ প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা ‘উদ্যোক্তা আইডি’ দেয়া হবে। এর ফলে তারা কোনও জটিলতা ছাড়াই পেমেন্ট গেটওয়ে, ব্যাংকিং কারেন্ট অ্যাকাউন্ট এবং সরকারি সব ধরনের লজিস্টিকস ও প্রণোদনার সুবিধা পাবেন।
৩. কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র শিল্প: উৎপাদনশীল ও সেবা খাতের নতুন বা সম্ভাবনাময় ছোট উদ্যোগ, যারা হয়তো শতভাগ প্রযুক্তিনির্ভর নয় কিন্তু প্রযুক্তির সহায়তায় নিজেদের ব্যবসা বড় করতে চায়, যেমন- দেশীয় ফ্যাশন ও বুটিকস, হস্তশিল্প, চামড়াজাত পণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনকারী। তাদের এই প্ল্যাটফর্মের আওতায় এনে মূলধারার ঋণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হবে।
৪. উদ্ভাবনী সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্প: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা সামাজিক কোনও বড় সমস্যা সমাধানে নিয়োজিত নতুন ও অপ্রাতিষ্ঠানিক আইডিয়াধারী যেকোনও উদ্যোগকে এই তালিকায় রাখা হয়েছে, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভূমিকা রাখবে।
নীতিমালার আধুনিকায়ন ও বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ
‘জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম’-এর অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো এটি বিচ্ছিন্ন কোনও সরকারি প্রকল্প নয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান ‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা’ এবং সরকারের সর্বশেষ ‘জাতীয় লজিস্টিকস পলিসি’-এর সঙ্গে একে সুনির্দিষ্টভাবে সমন্বিত করা হয়েছে। এর ফলে অনলাইন উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট নিবন্ধন ও লজিস্টিকস সংক্রান্ত জটিলতা এক দরজায় সমাধান হবে।
একই সঙ্গে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও চিপ ক্রাইসিসের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে যে তহবিল সংকট চলছে, তা মোকাবিলায় এই প্ল্যাটফর্মটি দেশীয় ফান্ডের সঙ্গে বৈশ্বিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মগুলোকে যুক্ত করার একটি নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সেতু হিসেবে কাজ করবে। এটি সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করতেও সহায়ক হবে।
আমলাতন্ত্রের বাইরে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জুরি বোর্ড
নতুন এই প্ল্যাটফর্মটির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রথাগত সরকারি আমলাতন্ত্রের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা হয়েছে। এটি মূলত সরকারের আইসিটি বিভাগের একটি বিশেষায়িত স্বায়ত্তশাসিত উইং বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে, তবে এর পরিচালনায় থাকবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, ‘‘এই স্বাধীন জুরি বা মূল্যায়ন কমিটিতে কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তি, মন্ত্রী বা সরকারি আমলাদের একক প্রভাব থাকবে না। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইসিটি বিশেষজ্ঞ, সফল ও প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা এবং অর্থায়ন খাতের পেশাদারদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বনামধন্য ও স্বাধীন প্যানেলই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে প্রকল্পগুলো পর্যবেক্ষণ, স্ক্রিনিং ও ঋণ অনুমোদন করবে। এর ফলে তদবির বা রাজনৈতিক পরিচয়ের উর্ধ্বে ওঠে প্রকৃত মেধাবীরাই রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের সুযোগ পাবেন।’’
স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন ও ঝরে পড়া উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা
গত মঙ্গলবারের অনুষ্ঠানে নির্বাচিত যে ছয়টি স্টার্টআপের হাতে অনুদানের চেক তুলে দেয়া হয়েছে, তাদের নির্বাচন প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ। কোনও ধরণের মানবিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই একটি আধুনিক অনলাইন স্ক্রিনিং পদ্ধতির মধ্য দিয়ে জুরি বোর্ডের মাধ্যমে তাদের নির্বাচিত করা হয়েছে। মূলত তিনটি প্রধান দিক বিবেচনা করে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে- ব্যবসায়িক স্থায়িত্ব (আইডিয়াটি বাস্তবে লাভজনক ও টেকসই হবে কিনা), প্রযুক্তির নতুনত্ব এবং সমাজে বা জাতীয় অর্থনীতিতে প্রজেক্টটির ইতিবাচক প্রভাব। সফল স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্ব ‘গল্প নয়, সত্যি’-এর মাধ্যমে তাদের এই সাফল্যের নেপথ্য কাহিনী অনুষ্ঠানে সবার সামনে তুলে ধরা হয়, যা তরুণদের অনুপ্রাণিত করেছে।
এই প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে যুগান্তকারী এবং মানবিক দিকটি হলো- ঝরে পড়া উদ্যোক্তাদের জন্য সুরক্ষা কবচ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক জার্নাল ও গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯০ শতাংশ স্টার্টআপ বা নতুন ব্যবসা শুরুর প্রথম তিন বছরের মধ্যে নানা কারণে বন্ধ বা ব্যর্থ হয়ে যায়। প্রথাগত ব্যাংকিং নিয়মে ব্যবসা ব্যর্থ হলে উদ্যোক্তাকে মামলার মুখোমুখি হতে হয় বা দেউলিয়া হতে হয়।
কিন্তু ‘জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম’ শুধু সফলদেরই পুরস্কৃত করবে না, বরং আসল কোনও কারণে ব্যবসা লোকসান বা সংকটে পড়া উদ্যোক্তাদের দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচাতে এবং পুনরায় নতুন আইডিয়া নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে একটি বিশেষ ‘ব্যর্থতার সুরক্ষা কবচ’ বা এক্সিট পলিসি যুক্ত করার আইনি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করছে।

সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের বাজার ও কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের স্টার্টআপ এবং ডিজিটাল কমার্স খাতের বাজার এখন আর ছোট কোনও খাত নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ই-কমার্স ও স্টার্টআপ খাতের মার্কেট সাইজ প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত দেশের জিডিপিতে অন্যতম বড় অবদানকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা।
তবে এই সম্ভাবনার সমান্তরালে কিছু বাস্তব সংকটও বিদ্যমান। উচ্চ লজিস্টিকস ও ডেলিভারি ব্যয়, সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট, বৈশ্বিক চিপ সংকটের কারণে আইটি হার্ডওয়্যারের মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ না পাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কৃতি এই খাতের গতিকে মন্থর করছে। এই সংকটগুলো দূর করতে সরকার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ‘একক উইন্ডো’ অনলাইন সেবার ব্যবস্থা করবে, যেখানে কোনও থার্ড-পার্টি বা মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ থাকবে না। টাকা দেয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক লজিস্টিকস ও গাইডলাইন সহায়তাও দেয়া হবে।
মহাপরিকল্পনা সফল করতে বিশেষজ্ঞদের একগুচ্ছ পরামর্শ
সরকার ঘোষিত এই মহাপরিকল্পনাটি মাঠপর্যায়ে শতভাগ সফল করতে এবং ব্যবসায়ীবান্ধব পরিবেশের পূর্ণ সুবিধা নিশ্চিত করতে অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ তুলে ধরা হলো-
তৃণমূল পর্যায়ে প্রচার ও সহজীকরণ: ৫০০ কোটি টাকার এই স্টার্টআপ ফান্ডের সুবিধা যাতে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না হয়ে ঢাকার বাইরের জেলা ও প্রান্তিক অঞ্চলের নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়, সেজন্য আঞ্চলিক উদ্যোক্তা মেলার আয়োজন করা প্রয়োজন। আবেদনের নথিপত্র ও ট্রেড লাইসেন্স প্রক্রিয়াকরণ আরও সহজ করতে হবে।
লজিস্টিকস ও সরবরাহ ব্যয়ের সমাধান: ই-কমার্স ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় খরচ হয় পণ্য ডেলিভারি ও লজিস্টিকসে। সরকারি ডাক বিভাগ বা বিআরটিসি-এর মতো রাষ্ট্রীয় পরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করে এই স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে, যেন নামমাত্র খরচে পণ্য দেশের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছানো যায়।
কর মওকুফ ও পরীক্ষামূলক ছাড়: নতুন ও ক্ষুদ্র স্টার্টআপগুলোর জন্য অন্তত প্রথম ৩ বছর সব ধরনের কর বা ভ্যাট মওকুফ করা হলে তারা অর্থনৈতিক ধাক্কা কাটিয়ে দ্রুত নিজেদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবে। পাশাপাশি নতুন আইডিয়া পরীক্ষার জন্য সাময়িক আইনি নমনীয়তা বা বিশেষ ছাড় দেয়া দরকার।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবন কেন্দ্র: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের প্রতিটি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিটি বিভাগের অধীনে ছোট ছোট গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র স্থাপন করা দরকার, যেন শিক্ষার্থীরা পাস করার আগেই তাদের আইডিয়াগুলোকে ব্যবসায় রূপ দেয়ার প্রাথমিক মেন্টরশিপ পায়।
মেধা সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সংযোগ: দেশের মেধা যাতে বাইরে চলে না যায়, সেজন্য শুধু ফান্ডের ব্যবস্থা করলেই হবে না; তাদের উৎপাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক পেটেন্ট বা মেধা স্বত্ব সুরক্ষায় সরকারকে আইনি সহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে দেশীয় স্টার্টআপের প্রবেশাধিকার বাড়াতে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
মেধাবীদের দেশে ধরে রাখা এবং ব্যবসায়ীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সরকারের এই ৫০০ কোটি টাকার নীতিগত সহায়তা ও ব্যাংকিং খাতের আইনি সংস্কার যদি তৃণমূল পর্যায়ের ই-কমার্স ও প্রান্তিক স্টার্টআপের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যায়, তবে ‘তারুণ্য, স্টার্টআপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বিশ্বমঞ্চে এক আত্মনির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র হয়ে ওঠবে।





