অন্যান্য

বাজেট ২০২৬-২৭: ‘স্মার্ট ইকোনমি’ গড়তে ই-কমার্স খাতের ২৫ দফা দাবি

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা): বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো ই-কমার্স বা অনলাইন ব্যবসা। বর্তমানে এই খাতের বার্ষিক বাজারের আকার প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা; যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ৫ লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং ২০ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান। সঠিক নীতিগত সহায়তা এবং কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ নিশ্চিত করা গেলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত দেশের জিডিপিতে ৫ শতাংশের বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বজেট আলোচনায় দেশের ই-কমার্স ও অনলাইন ব্যবসা খাতের অস্তিত্ব রক্ষা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং অবগতির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী মহলে একটি ২৫-দফা বিস্তারিত প্রস্তাবনা ও দাবি সনদ পেশ করা হয়েছে।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বিদ্যমান অর্থ আইন ও আয়কর আইনের কিছু জটিলতা এবং উচ্চ কর হারের কারণে আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, বিশেষত নারী উদ্যোক্তারা বর্তমানে অস্তিত্ব রক্ষার চরম সংকটে পড়েছেন। জাতীয় স্বার্থে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘স্মার্ট ইকোনমি’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের কাছে পেশকৃত ২৫ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ও দাবি নিচে তুলে ধরা হলো…

০১. ই-কমার্সকে পুনরায় আইটিইএস ভুক্ত করা
অর্থ আইন ২০১৬ (৫৪-গ) সংশোধন করে ই-কমার্সকে পুনরায় আইটি এনাবল্ড সার্ভিসেস (আইটিইএস) ভুক্ত করতে হবে এবং ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি দিতে হবে। এটি করা হলে আগামী ৫ বছরে এই খাতে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

০২. ন্যূনতম কর যৌক্তিকীকরণ
আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ অনুযায়ী লোকসানি প্রতিষ্ঠানের ওপরও ০.১ শতাংশ থেকে ০.৬ শতাংশ ন্যূনতম কর ধার্য রয়েছে। স্টার্টআপদের টিকে থাকার হার ৪০ শতাংশ বাড়াতে লাভ করার আগ পর্যন্ত এই কর ০.১ শতাংশে স্থির রাখতে হবে।

০৩. প্রচারণামূলক ব্যয় সীমা বৃদ্ধি
আয়কর আইনের ধারা ৫৫-ক অনুযায়ী বিজ্ঞাপনের ব্যয় সীমা টার্নওভারের মাত্র ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত বৈধ। ব্র্যান্ডিংয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে এই সীমা বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করতে হবে।

০৪. বাড়িওয়ালার রিটার্ন কপি জমার বাধ্যবাধকতা শিথিলকরণ
আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী ভাড়াটিয়াকে বাড়িওয়ালার রিটার্ন কপি সংগ্রহ করতে হয়, যা প্রায় অসম্ভব। প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে এই বাধ্যবাধকতা থেকে বিশেষ অব্যাহতি দিতে হবে।

০৫. অনলাইন রিটার্ন ও ট্রেড লাইসেন্স সহজীকরণ
ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য এনবিআর-এর এক পাতার সহজ রিটার্ন ফর্ম চালু করতে হবে। এ ছাড়া সারাদেশে ই-কমার্স ক্যাটাগরিতে অভিন্ন ও সর্বোচ্চ ১,০০০ টাকা ট্রেড লাইসেন্স ফি নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছি।

০৬. ডিজিটাল পেমেন্টে ভ্যাট রেয়াত
নগদ ও ডিজিটাল লেনদেনে ভ্যাট হার সমান হওয়ায় মানুষ ক্যাশলেস পেমেন্টে আগ্রহী হচ্ছে না। ডিজিটাল পেমেন্টে সরাসরি ৩ থেকে ৫ শতাংশ ভ্যাট রেয়াত বা ক্যাশব্যাক দিলে ক্যাশলেস লেনদেন ৩০ শতাংশ বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব ফাঁকি বছরে ২০০ কোটি টাকা কমবে।

০৭. গেটওয়ে চার্জ সমন্বয়
পেমেন্ট গেটওয়ের ১.৫ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ চার্জ উদ্যোক্তাদের মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে। এই চার্জে সরকার কর্তৃক ১.৫ শতাংশ সাবসিডি বা ইন্সেন্টিভ প্রদান করা উচিত, যা ব্ল্যাক মানি লেনদেন কমিয়ে অর্থনীতিকে ফরমাল করবে।

০৮. রিফান্ড অটোমেশন ও ব্যাংক চার্জ মওকুফ
পেমেন্ট রিফান্ড প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল কমার্সে এখনও জটিল। রিফান্ড প্রসেস সম্পূর্ণ অটোমেশন করতে হবে এবং রিফান্ড ব্যাংক চার্জ সম্পূর্ণ মওকুফ নিশ্চিত করতে হবে।

০৯. নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ কর সুবিধা
ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা করজালের জটিলতায় নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বার্ষিক ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার থাকা নারী উদ্যোক্তাদের সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখা হোক। এতে ২ লক্ষাধিক নারী মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত হবেন।

১০. ডিবিআইডি-এর মাধ্যমে ফাইন্যান্সিং
ফেসবুক ভিত্তিক হাজারও উদ্যোক্তা ট্রেড লাইসেন্সের অভাবে লোন পাচ্ছেন না। ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন বা ডিবিআইডি থাকলেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংক লোন ও আইনি স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।

১১. জামানতবিহীন স্মার্ট লোন
ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড দেখে ছোট, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের ৫-১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করা হলে এই খাতে তাদের অংশগ্রহণ ৫০ শতাংশ বাড়বে।

১২. স্মার্ট লজিস্টিকসে শুল্ক সুবিধা
লজিস্টিকস সর্টিং ও অটোমেশন যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ শুল্ক বিদ্যমান। এই শুল্ক শূন্য করা হলে পণ্য ডেলিভারি খরচ ২০ শতাংশ কমবে।

১৩. ডেলিভারি চার্জে ভ্যাট প্রত্যাহার
ডেলিভারি চার্জের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ক্রেতাকে অনলাইন বিমুখ করছে। নিজস্ব ডেলিভারির ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ও ৩য় পক্ষের ক্ষেত্রে তা ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হোক।

১৪. অফিস ও গোডাউন ভাড়ার ভ্যাট মওকুফ
ই-কমার্স ও লজিস্টিকস হাবের জন্য ভাড়ার ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ মওকুফ করা হলে উদ্যোক্তাদের পরিচালন ব্যয় ১০ শতাংশ কমবে।

১৫. ই-কমার্স জোন ও ভিলেজ
ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে এবং গ্রাম পর্যায়ে ডিজিটাল কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে হাইটেক পার্কের মতো ‘ই-কমার্স ভিলেজ’ গঠন করা হোক।

১৬. জোগানদার ও মূসক অব্যাহতি
প্রজ্ঞাপন (এসআরও ২৪০-আইন/২০২১) দ্বারা অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যেও জোগানদার হিসেবে উৎসে ভ্যাট কাটা হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ রহিত করলে সাপ্লাই চেইনে স্বচ্ছতা আসবে ও পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল থাকবে।

১৭. রপ্তানিতে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা
ই-কমার্স রপ্তানিতে সফটওয়্যারের মতো স্পষ্ট নগদ সহায়তা নেই। সরাসরি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ও সহজ শুল্কায়ন দিলে ২০২৭ সালের মধ্যে ই-কমার্স রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো সম্ভব।

১৮. বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা
রপ্তানিমুখী ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য ‘বন্ডেড ওয়্যারহাউস’ সুবিধা দিলে হস্তশিল্প ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বহুগুণ বাড়বে।

১৯. ডাক বিভাগে বিশেষ ছাড়
আন্তর্জাতিক কুরিয়ার খরচ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অসহনীয়। ডাক বিভাগের মাধ্যমে পণ্য বিদেশে পাঠাতে চার্জে ৫০ শতাংশ বিশেষ সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হোক।

২০. আন্তর্জাতিক পেমেন্টে শিথিলতা
ক্ষুদ্র পেমেন্টে পাসপোর্ট কপির বাধ্যবাধকতা থাকায় বৈশ্বিক ক্রেতারা বিমুখ হচ্ছেন। ১,০০০ ডলার পর্যন্ত লেনদেনে পাসপোর্ট কপির বাধ্যবাধকতা রহিত করা হোক।

২১. এগ্রি-ই-কমার্স প্রণোদনা
এগ্রি-উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও কোল্ড চেইন সাবসিডি দিলে পচনশীল পণ্যের অপচয় ৩০ শতাংশ কমবে এবং কৃষক সরাসরি ন্যায্যমূল্য পাবে।

২২. পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ে ভ্যাট ছাড়
প্লাস্টিক বর্জ্য কমাতে পাটজাত বা পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ব্যবহারে বিশেষ ভ্যাট ছাড় দিলে পাটের অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙ্গা হবে।

২৩. অনলাইন বিজ্ঞাপনে ভ্যাট হ্রাস
দেশীয় প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপনে ১৫ শতাংশ ভ্যাট থাকায় বিজ্ঞাপনের ৭০ শতাংশ টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করলে ৫০০ কোটি টাকার ফরেক্স বা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

২৪. ডিজিটাল কমার্স রিস্ক ফান্ড ও সাইবার ইনস্যুরেন্স
সাইবার আক্রমণ বা ব্যবসায়িক বিপর্যয় থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বাঁচাতে বাজেটে একটি বিশেষ ‘রিস্ক ফান্ড’ গঠন করা হোক। পাশাপাশি সাশ্রয়ী ‘সাইবার রিস্ক ইনস্যুরেন্স’ চালু করা প্রয়োজন।

২৫. দক্ষ জনবল ও ইনোভেশন ফান্ড
কারিগরি ও উচ্চশিক্ষায় ‘ডিজিটাল কমার্স ম্যানেজমেন্ট’ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং নতুন আইডিয়া ও গবেষণার জন্য বাজেটে বিশেষ ‘ইনোভেশন ফান্ড’ গঠন করতে হবে।

উপরোক্ত ৩০-দফা দাবি কোনও একক বা ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার জন্য নয়; বরং এটি দেশের ৫ লক্ষ উদ্যোক্তা ও ২০ লক্ষ কর্মজীবীর বেঁচে থাকার এবং ডিজিটাল রুপান্তর বিনির্মাণের একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক রোডম্যাপ। এই প্রস্তাবনাসমূহ বাস্তবায়িত হলে ই-কমার্স খাত শুধু নিজের পায়েই দাঁড়াবে না, বরং ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জিডিপিতে ৫ শতাংশ-এর বেশি অবদান রেখে একটি শক্তিশালী ও টেকসই ‘স্মার্ট ইকোনমি’ বিনির্মাণে নেতৃত্ব দেবে।

লেখক: মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা)- ই-কমার্স বিশ্লেষক এবং ই-ক্যাব এর ফাউন্ডিং মেম্বার

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *