প্রতিবেদন

ডিজিটাল রূপান্তরে বদলে যাচ্ছে সরকারি সেবা

ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ: সরকারি সেবা আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও সহজলভ্য করতে বড় পরিসরে ডিজিটাল রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, রাজস্ব, বিনিয়োগ, প্রবাসী কল্যাণ এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনা সহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতেই প্রযুক্তিনির্ভর সেবার সম্প্রসারণ শুরু হয়েছে। জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনায় ওঠে এসেছে এই ডিজিটাল রূপান্তরের বিস্তৃত চিত্র।

সরকারের লক্ষ্য, নাগরিককে সরকারি সেবা পেতে আর দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হবে না বা বারবার অফিসে যেতে হবে না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘরে বসেই অধিকাংশ সরকারি সেবা পাওয়া নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে কাগজনির্ভর প্রশাসন কমিয়ে তথ্যভিত্তিক, দ্রুত ও জবাবদিহিমূলক সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবায় আসছে ইউনিভার্সাল হেলথ কার্ড
স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় উদ্যোগগুলোর একটি হচ্ছে ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কার্ড’। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী এই ডিজিটাল কার্ড দেশের সমন্বিত রোগী ব্যবস্থাপনা ও রেফারেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এর ফলে দেশের যেকোনও সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগীর পূর্বের চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রেসক্রিপশন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাবে। এতে চিকিৎসার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও পুনরাবৃত্ত প্রেসক্রিপশন কমবে। এ ছাড়া দেশের ২২টি নিউক্লিয়ার মেডিসিন ইনস্টিটিউটকে একটি সমন্বিত অনলাইন তথ্যব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘‘ইউনিভার্সাল হেলথ কার্ড চালুর মাধ্যমে দেশের যেকোনও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগীর আগের চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে। এতে চিকিৎসার মান উন্নত হবে, চিকিৎসাগত ভুল ও অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্ত প্রেসক্রিপশন কমবে। রোগীরা আরও দ্রুত, সুশৃঙ্খল ও কার্যকর সেবা পাবেন। দেশের ২২টি নিউক্লিয়ার মেডিসিন ইনস্টিটিউটকে একটি সমন্বিত অনলাইন নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে সমন্বিত নিউক্লিয়ার মেডিসিন তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।’’

শিক্ষায় প্রযুক্তির বিস্তার
শিক্ষা খাতেও ডিজিটাল রূপান্তরের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো হবে। পাশাপাশি মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, ফ্রি ওয়াই-ফাই, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য স্বতন্ত্র এডু-আইডি, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিক্স, কোডিং ও ডিজিটাল সাক্ষরতার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগগুলো শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও ভবিষ্যৎমুখী করে তুলবে বলে মনে করছে সরকার।

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব- কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, ফ্রি ওয়াই-ফাই, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য স্বতন্ত্র এডু-আইডি, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিক্স, কোডিং ও ডিজিটাল সাক্ষরতার সঙ্গে পরিচিত করানো হবে।’’

সামাজিক নিরাপত্তা
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকেও পুরোপুরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হচ্ছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে উপকারভোগীদের কাছে সরাসরি সরকারি ভাতা পৌঁছে দেয়া হবে। এ ছাড়া ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ চালুর মাধ্যমে দেশের যেকোনও স্থান থেকে অনলাইনে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য আবেদন করা যাবে। প্রায় ৪ কোটি উপকারভোগীর তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেম গড়ে তোলা হচ্ছে, যা একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা গ্রহণ রোধ করবে এবং লক্ষ্যভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করবে।

বিনিয়োগ ও ব্যবসা হবে আরও সহজ
দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির অংশ হিসেবে চালু হচ্ছে ডিজিটাল সিঙ্গেল উইন্ডো। এর মাধ্যমে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত আবেদন, অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন হবে। আবেদন জমা দেয়ার সাত দিনের মধ্যে সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসা সহজ করতে চালু হয়েছে ‘বাংলাবিজ’ প্ল্যাটফর্ম। একই সঙ্গে বিজনেস সিঙ্গেল উইন্ডো (বিএসডব্লিউ)-এর মাধ্যমে রপ্তানিকারকেরা ইলেকট্রনিক সার্টিফিকেট অব অরিজিন (সিওও) এবং অন্যান্য সেবা অনলাইনে পাচ্ছেন। এ ছাড়া কোম্পানির নাম ছাড়পত্র ও নিবন্ধন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ব্যবসা সহজীকরণ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘বাণিজ্য সহজ করতে বিজনেস সিঙ্গেল উইন্ডো (বিএসডব্লিউ) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক সার্টিফিকেট অব অরিজিন (সিওও) প্রদানসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণসংক্রান্ত সেবা রপ্তানিকারকদের অনলাইনে দেয়া হচ্ছে।’’

কর ব্যবস্থায় ‘ফেসলেস’ সেবা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় চালু হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় ‘ফেসলেস’ ট্যাক্স রিফান্ড ব্যবস্থা, যেখানে অতিরিক্ত পরিশোধিত কর সরাসরি করদাতার ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। একই সঙ্গে ই-রিটার্নে আয়কর দাখিল, ই-ভ্যাট রিটার্ন এবং আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সরকারি রাজস্ব জমায় এ-চালান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

কৃষিতে ডিজিটাল সহায়তা
কৃষি খাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় প্রথম ধাপে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে ডিজিটাল সেবার আওতায় আনা হবে। ‘কৃষকের অ্যাপ’ ব্যবহার করে দেশের সব উপজেলায় কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি ‘ফুড-ফ্রেন্ডলি ডিস্ট্রিবিউশন অ্যাপ’-এর মাধ্যমে খাদ্যশস্য বিতরণ ব্যবস্থাও ডিজিটাল করা হচ্ছে।

প্রবাসীদের জন্য ডিজিটাল পরিচয়
বিদেশগামী কর্মীদের জন্য চালু হচ্ছে ‘প্রবাসী কার্ড’। এতে কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য, দক্ষতা ও চাকরির শর্ত সংরক্ষিত থাকবে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় দ্রুত ও নিরাপদে রেমিট্যান্স পাঠানো সম্ভব হবে। এ ছাড়া বিদেশে কর্মসংস্থানের পুরো প্রক্রিয়া ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্ম-এর মাধ্যমে ডিজিটাল করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের শ্রমবাজারের তথ্য একীভূত করতে তৈরি হচ্ছে লেবার ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম।

প্রবাসী কর্মীদের জন্য নতুন ডিজিটাল উদ্যোগ সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘প্রবাসী কার্ড চালু করা হচ্ছে। এতে কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য, দক্ষতা ও চাকরির শর্ত সংরক্ষিত থাকবে। কার্ডটি ব্যাংক পেমেন্ট গেটওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, যাতে রেমিট্যান্স পাঠানো আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ হয়।’’

পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার
পরিবেশ ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনাতেও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। বন পর্যবেক্ষণে ট্রি মনিটরিং অ্যাপ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ড্যাশবোর্ড, জ্বালানি পরিবহনে ২ হাজার ৭০০টির বেশি ট্যাংক লরির ডিজিটাল নজরদারি এবং দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে স্যাটেলাইট ও এসএমএসভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি সেবা আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে। নাগরিকদের সময় ও ব্যয় কমবে, দুর্নীতির সুযোগ হ্রাস পাবে এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়বে।

স্বাস্থ্যসেবা থেকে কর প্রদান, শিক্ষা থেকে কৃষি কিংবা বিনিয়োগ থেকে সামাজিক নিরাপত্তা প্রায় প্রতিটি খাতেই ডিজিটাল রূপান্তরের এই উদ্যোগ বাংলাদেশকে প্রযুক্তিনির্ভর জনসেবা ব্যবস্থার দিকে এক ধাপ এগিয়ে নিচ্ছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশের সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে এসব ডিজিটাল সেবা সহজলভ্য করা।

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এ ঘোষিত এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, রাজস্ব, বিনিয়োগ, সামাজিক সুরক্ষা ও প্রবাসী সেবা সহ বিভিন্ন খাতে প্রযুক্তিনির্ভর জনসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাষায়, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সরকারি সেবাকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকবান্ধব করে তোলা, যাতে মানুষ ঘরে বসেই অধিকাংশ সেবা গ্রহণ করতে পারেন।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *