প্রতিবেদন

চোখে আলো নেই, তবু নিজের পথ খুঁজে নিয়েছেন নাজমা

‘আপনি তো দেখতে পান না, কাজ করবেন কীভাবে?’ চাকরির জন্য আবেদন করতে গিয়ে এমন প্রশ্ন বহুবার শুনেছেন নাজমা আক্তার। কখনও সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়েছে, কখনও নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগই মেলেনি। অথচ একটি সুযোগই বদলে দিয়েছে তার গল্প। এখন কল সেন্টারে নিয়মিত কাজ করছেন তিনি। প্রযুক্তির সহায়তায় নিজের দক্ষতা দিয়ে প্রমাণ করছেন, মানুষের সামর্থ্য চোখের দৃষ্টি দিয়ে মাপা যায় না।

জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাজমা আক্তারের জীবনে বাধা নতুন নয়। তবে কোনও বাধাই তার পড়াশোনার পথে থামাতে পারেনি। একসময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেন। পড়াশোনা শেষে শুরু হয় নতুন লড়াই-চাকরি পাওয়ার লড়াই। বিভিন্ন চাকরির মেলায় যান, প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেন। কোথাও পরীক্ষা দিয়েছেন, কোথাও সাক্ষাৎকার। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতাই হয়ে ওঠেছে প্রধান বিবেচনা। নাজমার আক্ষেপ ছিল, তাকে কাজটি করে দেখানোর সুযোগই দেয়া হতো না।

প্লেক্সাস ক্লাউডের (Plexuscloud.com.bd) ইন্টারনেট ব্র্যান্ড স্বাধীন ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানটি তাকে সাক্ষাৎকার দেয়ার পাশাপাশি নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দেয়। এরপর কল সেন্টার কর্মী হিসেবে নিয়োগ পান নাজমা। কল সেন্টারের কাজ মূলত যোগাযোগ ও সেবাকেন্দ্রিক। গ্রাহকের কথা শোনা, তাদের সমস্যা বোঝা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া, এসব কাজ করতে নাজমার চোখের দৃষ্টি প্রয়োজন হয় না। প্রযুক্তির সহায়তায় তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য প্রযুক্তি এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; শিক্ষা ও কর্মসংস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। পর্দার তথ্য পড়ে শোনানো, কণ্ঠনির্ভর নির্দেশনা এবং বিভিন্ন সহায়ক প্রযুক্তি ডিজিটাল কর্মপরিবেশে তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়িয়েছে। নাজমার জীবন সেই পরিবর্তনেরই একটি বাস্তব উদাহরণ।

তার এই পথচলায় সবচেয়ে কাছের মানুষ স্বামী রাকিব। বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠী হিসেবে তাদের পরিচয়। রাকিবও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। পরিচয় থেকে ভালোবাসা, পরে বিয়ে। এখন সংসারের পাশাপাশি দুজনই নিজেদের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করছেন। রাকিব আইন পেশায় যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্বামী রাকিব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাজমা আক্তার

নাজমার কাছে এই চাকরি শুধু কর্মসংস্থান নয়। এটি আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর গল্প। আর একই সঙ্গে সমাজের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেওয়ার গল্প। চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতে পান না নাজমা। কিন্তু নিজের কাজ দিয়ে প্রতিদিন দেখিয়ে চলেছেন, একজন মানুষের সক্ষমতা তার চোখের আলো দিয়ে নির্ধারিত হয় না। প্রয়োজন শুধু সুযোগ, বিশ্বাস এবং সেই সুযোগকে কাজে লাগানোর সাহস।

প্লেক্সাস ক্লাউড লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বলেন, আমরা তাদের কাজে খুশি। গত ৩ বছরে তাদের নামে কোনও অভিযোগ আসেনি। তারা প্রত্যেকেই শিক্ষিত। তাদের সবাইকে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তুলেছি। যাদের তারা নিজেরা স্বাবলম্বি হতে পারেন। পরিবারের বোঝা যাতে না হন সেজন্য তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দেশের প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়ায়, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ দেয়, তাহলে তারা অন্যদের মতোই ভালো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে।

প্লেক্সাস ক্লাউড কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের প্রতিষ্ঠানে কাস্টমার কেয়ার বিভাগে তথা কলসেন্টারে ১২ জন প্রতিবন্ধী কাজ করেন যাদের মধ্যে ৪ জন অন্ধ বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বাকিদের কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধী, কেউ পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তাদের সবাই নিজেদের বাসায় বসে কাজ করেন। একজন গ্রাহক যিনি সমস্যার কথা জানিয়ে ফোন করেন তিনি আসলে সমাধান চান। কলসেন্টার কর্মী কোথায় বসে তাদের সেবা দিচ্ছেন এটা কেউ জানতে চায় না।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *