এক স্বর্ণ, সাত রৌপ্য, সাত ব্রোঞ্জ ‘আইএমএসও’-তে বাংলাদেশের দুর্দান্ত সাফল্য
ক.বি.ডেস্ক: অনূর্ধ্ব-১৩ বছর বয়সী শিশুদের জন্য আয়োজিত ‘আন্তর্জাতিক গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড’ (আইএমএসও)-এ দ্বিতীয়বার অংশ নিয়েই প্রথম স্বর্ণপদক অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভায় অনুষ্ঠিত ২৩তম ‘আইএমএসও’-তে বাংলাদেশের ১৬ খুদে শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৫ জনই পদক পেয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্জন ১টি স্বর্ণ, ৭টি রৌপ্য ও ৭টি ব্রোঞ্জপদক। ‘আইএমএসও’-এর ২৩তম আসর ২ থেকে ৭ অক্টোবর পশ্চিম জাভায় অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ গত বছর মালয়েশিয়ার কেদাহে অনুষ্ঠিত ২২তম আইএমএসও-তে প্রথমবার অংশ নেয়। সেবার বাংলাদেশের ১২ প্রতিযোগীর সবাই পদক পেয়েছিল। অর্জন ছিল দুটি রৌপ্য ও ১০টি ব্রোঞ্জপদক। এবার প্রতিযোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৬। এর সঙ্গে এসেছে বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণপদক। রৌপ্যপদকের সংখ্যাও দুই থেকে বেড়ে হয়েছে সাতটি। অর্থাৎ, দ্বিতীয়বার অংশ নিয়েই আগের বছরের তুলনায় আরও বড় সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশের খুদে শিক্ষার্থীরা।
এবারের অলিম্পিয়াডে ২৩টি দেশের চার শতাধিক প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী অংশ নেয়। বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণপদকটি এসেছে বিজ্ঞান বিভাগে। মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহমিদ হাসান এ স্বর্ণপদক অর্জন করে। বিজ্ঞান বিভাগের তাত্ত্বিক অংশে সেরা ফল করেছে সে। সব দেশের প্রতিযোগীদের মধ্যে বিজ্ঞানে তার স্কোর ছিল পঞ্চম সর্বোচ্চ।
বিজ্ঞান বিভাগে স্বর্ণপদকের পাশাপাশি চারটি রৌপ্য ও দুটি ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে বাংলাদেশ। বিজ্ঞান বিভাগে রৌপ্যপদক পেয়েছে অভিজ্ঞান রায় গল্প, মোহাম্মদ মুশরিফ আলম, রাইয়ান আফরাদ ও আরহাম আবিদ। ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে রাফসান শফিক তালুকদার ও সাহাবী ইবনে কাব্য। আরেক প্রতিযোগী মো. মিফতাহুল ইসলাম মাত্র ১ দশমিক ২৫ নম্বরের ব্যবধানে ব্রোঞ্জপদক থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিজ্ঞানে পদকজয়ী ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন।

স্বর্ণপদক জয়ের অনুভূতি জানিয়ে তাহমিদ হাসান বলে, “স্বর্ণপদক পাওয়ার ইচ্ছা নিয়েই এসেছিলাম। তাত্ত্বিক-২তে কয়েকটি সাধারণ ভুল করে একটু দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু ব্যবহারিক সেটা পুষিয়ে দিয়েছে। সোনার পদক পেয়ে খুবই ভালো লাগছে। ভবিষ্যতে গণিতে আরও ভালো করতে চাই। বিশ্বের সেরা দশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও একটিতে পড়ার স্বপ্ন রয়েছে আমার। ইন্দোনেশিয়ায় অংশগ্রহণ পরীক্ষা, ঘোরাঘুরি ও খাবার সব মিলিয়ে সময়টা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
গণিত বিভাগে বাংলাদেশের আট প্রতিযোগীর প্রত্যেকেই পদক পেয়েছে। এ বিভাগে বাংলাদেশের অর্জন তিনটি রৌপ্য ও পাঁচটি ব্রোঞ্জপদক। গণিত দলে সর্বোচ্চ স্কোর করে রৌপ্যপদক পেয়েছে অরিজিৎ সাহা। মাত্র কয়েক নম্বরের ব্যবধানে তার স্বর্ণপদক হাতছাড়া হয়েছে। অন্য দুটি রৌপ্যপদক পেয়েছে ইহান আবরাদ রহমান ও মো. সামিন সাইফ। ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে মো. নাবি হোসেন, আলী ওমর, শারাফ বিন আনোয়ার, মো. শাহিদ মোরসালিন ও ইরতিশ জায়েদ লিয়াম। গণিত দলের আট সদস্যই ঢাকার সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থী।
অরিজিৎ সাহা বলে, “এবার আমার প্রস্তুতি বেশ ভালো ছিল এবং সোনার পদকের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সংক্ষিপ্ত ও রচনামূলক দুটোর কোনোটিই প্রত্যাশামতো হয়নি, যদিও এক্সপ্লোরেশন বেশ ভালো হয়েছিল। আইএমএসওতে এটিই আমার শেষ অংশগ্রহণ। তবে সামনে আরও বড় লক্ষ্য রয়েছে। এখন থেকেই আন্তর্জাতিক জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াড ও আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। ভবিষ্যতে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চতর পড়াশোনা করার ইচ্ছা রয়েছে।”
বিজ্ঞানের প্রশিক্ষক মীম নাজ রহমান বলেন, “প্রথমবার অংশ নিয়ে গত বছর রৌপ্যপদক পাওয়াটা ছিল প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। তাই এ বছর আমাদের লক্ষ্য ছিল স্বর্ণপদক। সে জন্য গত বছরের শেষ দিক থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয় এবং দল বাছাইয়ের পর আগের চেয়ে বেশি ক্লাস ও মক পরীক্ষা নেয়া হয়। প্রতিযোগীদের একাগ্রতা, অভিভাবকদের পরিশ্রম আর মেন্টরদের সার্বক্ষণিক পরিচর্যার সমন্বয়েই এই সাফল্য। আগামী বছর আমরা আরও ভালো ফল করতে চাই।”
বাংলাদেশের কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর মুনির হাসান বলেন, “গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশ নিচ্ছে। গণিত থেকে শুরু করে পদার্থবিজ্ঞান, ইনফরমেটিক্স, বিজ্ঞান, এআই নানা ক্ষেত্রে আমাদের ছেলেমেয়েরা এখন নিয়মিত আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে। আমরা সব সময় আমাদের শিক্ষার্থীদের অন্য দেশে নিয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হয়, এবার আমাদের পরবর্তী ধাপ নিয়ে ভাবার সময় এসেছে, বাংলাদেশকেও একটি বড় আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডের আয়োজক হতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আইএমএসও-এর মতো একটি আন্তর্জাতিক আয়োজন বাংলাদেশে হলে শুধু আমাদের শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হবে না; বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মেধাবী শিশু, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদেরা বাংলাদেশে আসবেন। আমাদের শিক্ষার্থীরা নিজেদের দেশেই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অভিজ্ঞতা পাবে। এ ধরনের আয়োজনের জন্য সরকারি সহযোগিতা অপরিহার্য। এখন থেকেই উদ্যোগ নিলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ একটি আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড আয়োজনের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।”





