প্রতিবেদন

আমরা কি নিজেদের ব্র্যান্ড বিক্রি করছি, নাকি অন্যের?

মঈন উদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বাজারে প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। নতুন গ্রাহক আকর্ষণ এবং বিদ্যমান গ্রাহকদের ধরে রাখতে বিভিন্ন ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি) নিত্যনতুন প্রচারণা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রচারণার অন্যতম আলোচিত বিষয় ভয়েস ওভার ওয়াই-ফাই (ভিওওয়াই-ফাই)। দেশের অনেক আইএসপি প্রতিষ্ঠান খুব গর্বের সঙ্গে নিজেদের নেটওয়ার্কে ভিওওয়াই-ফাই সাপোর্টের কথা প্রচার করছে। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন ভিওওয়াই-ফাই কার সার্ভিস?

ভিওওয়াই-ফাই এমন একটি সেবা, যেখানে মোবাইল অপারেটররা তাদের গ্রাহকদের সুবিধা দিতে আইএসপির ব্রডব্যান্ড সংযোগ ব্যবহার করছে। অর্থাৎ, আমাদের নেটওয়ার্ক তাদের সেবার একটি সহায়ক, আমাদের নিজস্ব মূল্য প্রস্তাবনা নয়। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ভিওওয়াই-ফাই সাপোর্টের তথ্য গ্রাহককে জানানো অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু যখন এটিকেই ব্র্যান্ডের প্রধান মূল্য প্রস্তাবনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন বিপণনের ফোকাস নিজের সক্ষমতা থেকে সরে গিয়ে অন্যের সেবার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

তবে বাস্তবে অনেক আইএসপি এটিকেই নিজেদের অন্যতম প্রধান বিপণন বার্তা হিসেবে উপস্থাপন করছে। আবার কেউ কেউ এটিকে নিজেদের ‘ভ্যালু-অ্যাডেড সার্ভিস’ হিসেবেও প্রচার করছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্রডব্যান্ড প্রতিষ্ঠানগুলো- যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার উন্নত বাজারে তাদের বিপণনে গুরুত্ব দেয় নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা, কম ল্যাটেন্সি, সমান আপলোড-ডাউনলোড গতি, ফাইবার সংযোগ, গ্রাহক অভিজ্ঞতা, গেমিং পারফরম্যান্স এবং স্মার্ট হোম সমন্বয়। অর্থাৎ নিজেদের মূল সেবাকেই ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। কারণ তারা জানে, অবকাঠামো বিক্রি করতে হলে অবকাঠামোর শক্তিই বিক্রি করতে হয়।

গ্রাহক ব্রডব্যান্ড সংযোগ নেয় ভিওওয়াই-ফাই ব্যবহার করার জন্য নয়; বরং একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল জীবন নিশ্চিত করার জন্য

আপনি কি কখনও দেখেছেন কোনও মোবাইল অপারেটর বিজ্ঞাপন দিচ্ছে- “মোবাইল নেটওয়ার্কে বাইস্কোপ, টফি বা অন্য ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সেবা ঠিকমতো না চললে দেশের অমুক আইএসপি-এর ব্রডব্যান্ড নিন?” বাস্তবে এমনটি দেখা যায় না। কারণ তারা জানে, বিপণনের মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের ব্র্যান্ডের ইউনিক ভ্যালু তুলে ধরা, অন্যের সার্ভিসকে বিক্রি করা নয়। এতে নিজের ব্র্যান্ডের পরিবর্তে অন্য প্রতিষ্ঠানের শক্তিকে তুলে ধরা হয়।

একইভাবে কোনও আইএসপিও যদি ভিওওয়াই-ফাই’কে নিজেদের মূল অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করে, তাহলে সেটি প্রকৃতপক্ষে মোবাইল অপারেটরের সেবাকেই প্রচার করা হয়। কিন্তু আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে একজন ভিওওয়াই-ফাই নিয়ে প্রচারণা শুরু করল, তারপর আরেকজন ভাবল, “ও করছে, আমিও করি”। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পর্যাপ্ত কৌশলগত বিশ্লেষণ বা ব্র্যান্ড পজিশনিংয়ের পরিবর্তে বাজারে প্রচলিত প্রবণতাকেই অনুসরণ করা হয়।

বিপণনের মৌলিক নীতি হলো যে মূল্য আপনি নিজে সৃষ্টি করেন, সেটিই আপনার ব্র্যান্ডের পরিচয়। কিন্তু যদি একটি প্রতিষ্ঠান এমন একটি সেবাকে প্রধান প্রচারণার বিষয় বানায়, যার মালিকানা অন্য প্রতিষ্ঠানের, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে নিজের ব্র্যান্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে গ্রাহকের মনেও স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয় না যে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব বিশেষত্ব কী। এটি শুধু বিপণনের সীমাবদ্ধতাই নয়; অনেক ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড কৌশলের দুর্বলতারও প্রতিফলন।

সময় এসেছে ট্রেন্ড অনুসরণ করার নয়, ট্রেন্ড তৈরি করার

যদি আমরা নিজেদের শক্তি নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য সংযোগ, লো ল্যাটেন্সি, দ্রুত আপলোড ও ডাউনলোড, বাসা থেকে কাজ-এর নির্ভরযোগ্যতা, অনলাইন শিক্ষা, গেমিং অভিজ্ঞতা, লোকাল কনটেন্ট এবং কন্টেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক (সিডিএন)-এর কার্যক্ষমতা ও সেবার উৎকর্ষ এসব নিয়ে ব্র্যান্ড তৈরি না করে অন্যের সার্ভিসকে নিজের অর্জন হিসেবে প্রচার করি, তাহলে আমরা কখনোই একটি শক্তিশালী ব্রডব্যান্ড ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে পারব না। “গ্রাহক ব্রডব্যান্ড সংযোগ নেয় ভিওওয়াই-ফাই ব্যবহার করার জন্য নয়; বরং একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল জীবন নিশ্চিত করার জন্য”।

সময় এসেছে প্রতিযোগীদের অনুকরণ নয়, বরং গ্রাহকের প্রকৃত সমস্যার সমাধানকে কেন্দ্র করে নিজস্ব ভ্যালু তৈরি করার। একটি পরিণত ইন্ডাস্ট্রি কখনও অন্যের সার্ভিসকে নিজের অর্জন হিসেবে বিক্রি করে না। সে নিজের শক্তি, নিজের উদ্ভাবন এবং নিজের মূল্যবোধকেই গ্রাহকের সামনে তুলে ধরে। বাংলাদেশের ব্রডব্যান্ড খাত এখন দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফাইবার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, স্মার্ট হোম, ক্লাউড সেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের প্রত্যাশাও বদলাচ্ছে।

এই বাস্তবতায় আইএসপিগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- অন্যের সেবাকে নিজেদের অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা নয়; বরং এমন অভিজ্ঞতা তৈরি করা, যা গ্রাহককে দীর্ঘমেয়াদে তাদের ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থাশীল করে।
ভিওওয়াই-ফাই নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি এবং এটি ব্যবহারকারীদের জন্য উপকারী। তবে এটি মূলত মোবাইল অপারেটরের সেবা, যেখানে ব্রডব্যান্ড সংযোগ একটি অপরিহার্য সহায়ক অবকাঠামো হিসেবে কাজ করে।

বিপণনের মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের ব্র্যান্ডের ইউনিক ভ্যালু তুলে ধরা, অন্যের সার্ভিসকে বিক্রি করা নয়

দেশের আইএসপি খাত যদি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে চায়, তবে তাদের বিপণনের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত নিজেদের প্রকৃত সক্ষমতা উচ্চমানের নেটওয়ার্ক, কম ল্যাটেন্সি, নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ, উন্নত গ্রাহকসেবা এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তিগত সমাধান। ট্রেন্ড অনুসরণ করে সাময়িক আলোচনায় আসা যায়, কিন্তু একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরি হয় তখনই, যখন প্রতিষ্ঠান নিজের স্বকীয় মূল্যকে ধারাবাহিকভাবে গ্রাহকের সামনে তুলে ধরে। “সময় এসেছে ট্রেন্ড অনুসরণ করার নয়, ট্রেন্ড তৈরি করার”।

এই লেখার উদ্দেশ্য ভিওওয়াই-ফাই প্রযুক্তির গুরুত্বকে খাটো করা নয়; বরং ব্রডব্যান্ড শিল্পের বিপণনে নিজস্ব মূল্য প্রস্তাবনাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা। প্রযুক্তি পরিবর্তিত হবে, নতুন নতুন ফিচার আসবে। কিন্তু একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড টিকে থাকে তার নির্ভরযোগ্যতা, গ্রাহক অভিজ্ঞতা এবং ধারাবাহিক মূল্য সৃষ্টির মাধ্যমে।

লেখক: মঈন উদ্দিন আহমেদ- কোষাধ্যক্ষ, আইএসপিএবি এবং সিইও, রেড ডাটা (প্রা.) লি.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *