সাম্প্রতিক সংবাদ

এশিয়া-প্যাসিফিক এআই অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের তিনটি স্বর্ণপদক অর্জন

ক.বি.ডেস্ক: প্রথমবারের মতো আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ এশিয়া-প্যাসিফিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অলিম্পিয়াডে (এপিওএআই) ৩টি স্বর্ণ পদক অর্জন করেছে বাংলাদেশ। চীন, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান ও ইরানের মতো প্রযুক্তিতে শীর্ষস্থানীয় দেশ সহ এই অঞ্চলের মোট ১৮টি দেশের ১২৯ জন প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়াই করে দেশের তিন শিক্ষার্থী সোনার পদক পেয়েছে।

প্রতিযোগিতার মোট ১০টি স্বর্ণপদকের মধ্যে ৩টিই এসেছে বাংলাদেশের ঝুলিতে, যা এই আসরে অংশগ্রহণকারী যেকোনও দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের হয়ে এই গৌরব এনে দিয়েছে হোমনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির লাবিব শাহরিয়ার, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির মো. সাইদুজ্জামান আরাফ এবং নটর ডেম কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ত্রিদিব রায় আর্য। আন্তর্জাতিক এই আসরের চূড়ান্ত র‍্যাংকিংয়ে তাঁরা যথাক্রমে ৪র্থ, ৫ম ও ৯ম স্থান অর্জন করেছে।

বাংলাদেশ দলের আরও ৪ জন শিক্ষার্থী পেয়েছে সম্মানজনক স্বীকৃতি। দারুস সালাম সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাওফিল রহমান, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ মতিঝিলের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাঈরা নাওয়ার আহমেদ, মুন্নু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী অনন্য যারিফ আকন্দ এবং নটর ডেম কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোবতাসিম চৌধুরী প্রিয়ম। দলের আরেক সদস্য ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুর্তজা আব্দুল্লাহ।

স্বর্ণজয়ের অনুভূতি জানাতে গিয়ে লাবিব শাহরিয়ার বলে, “যখন ফলাফলের তালিকায় নিজের নামের পাশে ‘লাবিব শাহরিয়ার – গোল্ড মেডেল’ লেখা দেখলাম, এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। রৌপ্য পদক নিয়ে আমি প্রায় নিশ্চিতই ছিলাম, আর স্বর্ণের জন্য শুধু আশা করছিলাম। এখন সত্যিই স্বর্ণপদক জিততে পেরে অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এশিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এআই অলিম্পিয়াডের প্রথম আসরে বাংলাদেশের হয়ে স্বর্ণপদক জয় করা এবং দেশের জন্য এই গৌরব বয়ে আনতে পারা আমার জন্য অসীম আনন্দ ও গর্বের। এই অর্জন সম্ভব হয়েছে অনেক মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। এই আয়োজনকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ বিডিওএসএন, বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াড এবং এপিওএআই আয়োজক কমিটির প্রতি।”

স্বর্ণপদকজয়ী আরেক সদস্য মো. সাইদুজ্জামান আরাফ তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলে, “নিজের জন্য জেতা কখনোই বড় বিষয় ছিল না, কিন্তু দেশের হয়ে কম্পিটিশনে নামলে বিষয়টা একদম আলাদা হয়। আজ যখন রেজাল্টে নিজের নামের পাশে গোল্ড লেখা দেখলাম আর অফিসিয়াল টি-শার্টে বাংলাদেশের ম্যাপটা চোখে পড়ল, তখন সত্যিই ভালো লেগেছে। এই জয় শুধু আমার না, এটা বাংলাদেশের। আজ আমরা অর্জন করেছি, সামনে যারা আসবে তারাও করবে, আর শেষ পর্যন্ত পরিচয়টা একই থাকবে, বাংলাদেশি।”

আরেক স্বর্ণপদকজয়ী সদস্য ত্রিদিব রায় আর্য জানায়, “এপিওএআই-তে স্বর্ণপদক পাওয়ায় আমি সত্যিই খুব আনন্দিত। নিজ দেশ ও মাতৃভূমির মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারায় আমি অত্যন্ত গর্বিত। আগামীর পথচলায় সকলের দোয়া ও আশীর্বাদ প্রত্যাশী। ”

বাংলাদেশ দলের এই অসাধারণ সাফল্য নিয়ে দলনেতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেন বলেন, “এই ফলাফল আমাদেরকে আশান্বিত করে তোলে। নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মাঝেও আমরা যে কার্যক্রম চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, সেটি অর্থবহ হয়ে উঠে আমাদের এই প্রতিযোগীদের ভালো ফলাফলের মাধ্যম। এটি শুধু আমাদের অর্জন নয়, এটি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক উপস্থির দৃঢ় ঘোষণা। যেমন করেই হোক, আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য, আগামী প্রজন্মের জন্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার আয়োজন অব্যাহত রাখবো।”

বাংলাদেশ দলের কোচ ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এসোসিয়েট প্রফেসর ড. মো. আজম খান বলেন, “টিম বাংলাদেশের এই অসাধারণ সাফল্য আমাদের সবার জন্য গর্বের। আমাদের শিক্ষার্থীদের নিরলস পরিশ্রম, সাহস, অধ্যবসায় এবং দেশের জন্য সেরাটা দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ই এই ঐতিহাসিক অর্জনের মূল ভিত্তি। আমরা শুধু একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিইনি; আমরা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের তরুণদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং দক্ষতার প্রতিনিধিত্ব করেছি। আমি বিশ্বাস করি, এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আরও অনেক আন্তর্জাতিক সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করবে।”

বাংলাদেশ দলের একাডেমিক কোঅর্ডিনেটর তাসনিম মাহফুজ নাফিস জানায়, “এবারের এপিওএআই-তে এস্ট্রোনমি, অডিও প্রসেসিং, ওয়াইল্ডলাইফ ইমেজ এবং কেমিস্ট্রি ডোমেইনের ৪টি সমস্যা ছিল। ফলে একজন হাই স্কুল বা কলেজের শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে যে ডোমেইনেই কাজ করার স্বপ্ন দেখুক না কেন, এআই এবং মেশিন লার্নিং-এ দক্ষতা তাকে অনেকটা পথ এগিয়ে রাখবে। তিনি আরও জানান, একজন হাই স্কুল শিক্ষার্থী অল্পবিস্তর পাইথন শিখে ক্যাগল প্ল্যাটফর্মে খুব সহজেই মেশিন লার্নিং হাতেকলমে শেখা শুরু করতে পারে। মাত্র এক যুগ আগেও এই চমৎকার ব্যাপারটি সম্ভব ছিল না।”

বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক-এর প্রেসিডেন্ট মুনির হাসান বলেন, “শিক্ষার্থীদের এই অর্জন আমাদের গর্বিত ও আনন্দিত করেছে। নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের টিম যেভাবে এই পুরো আয়োজনটিকে সফল করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।”

উল্লেখ্য, গত এপ্রিল মাস থেকে বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াডের কার্যক্রম শুরু হয়ে মে মাসে আঞ্চলিক পর্ব ও ১৬ মে বিইউবিটি-তে জাতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০-২৩ মে অনুষ্ঠিত জাতীয় সিলেকশন ক্যাম্পের মূল্যায়নের পর এই দল নির্বাচন করা হয়। বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াডের আয়োজক ছিল বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন)।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *