প্রতিবেদন

১,০০০ কোটির ফ্ল্যাগশিপ তহবিল: দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে নতুন সূচনা

সোহেল মৃধা: সবার আগে বাংলাদেশ, এই মন্ত্রকে ধারণ করে জাতীয় সংসদে দেশের নতুন উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি খাতের জন্য এক বড় ঘোষণা এসেছে। দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম বা নতুন উদ্যোগী পুঁজি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আরও ব্যাপকভাবে আকর্ষণ করতে সরকারি ফ্ল্যাগশিপ তহবিল ‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ’-এর আকার পর্যায়ক্রমে ১,০০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

গত ৯ জুন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে নর্সিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিনের এক তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এই ঘোষণা ও পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।

মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, ‘‘এই তহবিল বৃদ্ধির মূল লক্ষ্য হলো দেশের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল শিল্পকে একটা টেকসই রূপ দেয়া এবং নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক মানদণ্ডে নিয়ে যাওয়া। এটি বর্তমানে কেবল সরকারি পরিকল্পনা বা নীতিমালায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং সরকারের পূর্ব ঘোষিত ডিজিটাল কমার্স পলিসি ও স্মার্ট বাংলাদেশ রোডম্যাপের আলোকেই অলরেডি সরকারি অফিস আদেশ ও প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোম্পানি গঠন করে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।’’

তহবিলের বর্তমান অবস্থা ও রূপরেখা
সংসদে উপস্থাপিত আইসিটি বিভাগের নোটিশ অনুযায়ী, ‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড’ বর্তমানে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোতে ইতিমধ্যে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রস্তাবিত ৪০০ কোটি টাকার ‘ফান্ড অব ফান্ডস’ এবং ৩০০ কোটি টাকার ‘কো-ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’। এই বিদ্যমান কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই পর্যায়ক্রমে মোট তহবিলের আকার ১,০০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার।

আইসিটি বিভাগ স্পষ্ট করেছে যে, এটি কোনও প্রচলিত ঋণ কর্মসূচি নয়; বরং সম্ভাবনাময় স্টার্টআপগুলোতে ইক্যুইটি (মালিকানা অংশীদারিত্ব) এবং ইক্যুইটি-সংযুক্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে এই অর্থায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ৫০০ কোটি টাকার ‘স্টার্টআপ রিফাইনান্স স্কিম’ বা পুনঃঅর্থায়ন তহবিলও এই সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে সমান্তরালভাবে কাজ করছে, যা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে জামানতবিহীন স্বল্প সুদে ঋণের সুবিধা দিচ্ছে।

কঠোর মূল্যায়ন ও ৩৬টি স্টার্টআপের বাস্তব চিত্র
সরকারি ফান্ডের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্টার্টআপ বাছবিচারের ক্ষেত্রে কঠোর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে মোট ৫৫টি স্টার্টআপকে বিনিয়োগের জন্য নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। তবে চুক্তি আলোচনা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরীক্ষার সময় নানা অসংগতি এবং বিনিয়োগের শর্তাবলীতে একমত হতে না পারায় ১৯টি স্টার্টআপকে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়।

চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত ৩৬টি প্রযুক্তি-ভিত্তিক স্টার্টআপে এ পর্যন্ত মোট ১০৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ সম্পন্ন করেছে স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড। এই বিনিয়োগগুলো রাইড-শেয়ারিং, এডটেক (শিক্ষা প্রযুক্তি), ফিনটেক (আর্থিক প্রযুক্তি), লজিস্টিকস, হেলথটেক (স্বাস্থ্য প্রযুক্তি) এবং ই-কমার্স সহ বিভিন্ন উদীয়মান খাতে বণ্টন করা হয়েছে। এই পোর্টফোলিওর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে পাঠাও লিমিটেড, চালডাল লিমিটেড, ১০ মিনিট স্কুল, সহজ, শিখো এবং মেডইজি। এই ৩৬টি কোম্পানির মূল বৈশিষ্ট্য হলো এরা প্রথাগত ব্যবসার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নাগরিক সেবা সহজ করেছে এবং এদের সামগ্রিক বিনিয়োগের ৮০ শতাংশেরই পারফরম্যান্স বর্তমানে পজিটিভ ও ঊর্ধ্বমুখী।

অর্থনৈতিক প্রভাব ও ট্যাক্স রিটার্ন
সরকারি এই উদ্যোগ যে শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক ও কার্যকর, তা মন্ত্রীর দেয়া পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সরকারি ১০৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে এই ৩৬টি কোম্পানি দেশের জাতীয় কোষাগারে ১৮০ কোটি টাকারও বেশি কর (ট্যাক্স) প্রদান করেছে। অর্থাৎ, সরকার বিনিয়োগকৃত মূলধনের চেয়ে প্রায় ১.৭ গুণ (১৭০%) বেশি অর্থ সরাসরি রাজস্ব হিসেবে ফেরত পেয়েছে। এ ছাড়া, পোর্টফোলিওভুক্ত কোম্পানিগুলোর গড় রাজস্ব বৃদ্ধির হার প্রায় ৫ গুণ।

টেলিকম, ইন্টারনেট অবকাঠামো এবং ব্যাংকিং খাতের একীভূত প্রভাব
এই ৩৬টি স্টার্টআপের বড় পথচলার পেছনে দেশের ফোরজি/ফাইভজি ইন্টারনেট অবকাঠামো এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের (টেলিকম কোম্পানি) অবদান অনস্বীকার্য। মোবাইল অপারেটরদের নিজস্ব উদ্যোগ (যেমন: জিপি এক্সিলারেটর বা আর-ভেঞ্চারস) নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারি তহবিলের পরিপূরক হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ের প্রসারের ফলেই আজ ই-কমার্স, লজিস্টিকস ও ফিনটেক স্টার্টআপগুলোর ক্যাশলেস লেনদেন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের সাম্প্রতিক ‘ডিজিটাল ব্যাংক’ নীতিমালা এবং প্রযুক্তি খাতের জন্য সরকারের দেয়া ‘ট্যাক্স হলিডে’ বা করমুক্ত সুবিধা এই ইকোসিস্টেমকে আরও গতিশীল করেছে।

নতুন উদ্যোক্তা বা স্টার্টআপরা যেভাবে উপকৃত হতে পারেন
১,০০০ কোটি টাকার এই বর্ধিত তহবিল দেশের সাধারণ ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে-
প্রাথমিক মূলধন: ভালো আইডিয়া থাকা সত্ত্বেও যারা জামানত বা ফান্ডের অভাবে ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না, তারা এই তহবিল থেকে সরাসরি ইক্যুইটি পার্টনারশিপের মাধ্যমে মূলধন পাবেন।

ঋণমুক্ত ব্যবসা: এটি কোনও ব্যাংক লোন না হওয়ায় উদ্যোক্তাদের মাথায় প্রতি মাসে সুদ বা কিস্তি দেয়ার মানসিক চাপ থাকে না, ফলে তারা মুক্তভাবে নতুন কিছু উদ্ভাবনে মনোযোগ দিতে পারেন।

বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা: সরকারের এই রাষ্ট্রীয় ফান্ড থেকে কোনও স্টার্টআপ যখন অর্থায়ন পায়, তখন আন্তর্জাতিক বড় বড় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানিগুলোর কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বহুগুণ বেড়ে যায়, যা পরে কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সাহায্য করে।

সদিচ্ছা সত্ত্বেও স্থবিরতার শঙ্কা: যেখানে বাঁধাপ্রাপ্ত হতে পারে এই মহাপরিকল্পনা
শীর্ষ মহলের শতভাগ সদিচ্ছা থাকলেও, মাঠপর্যায়ে এই ১,০০০ কোটি টাকার তহবিল বাস্তবায়নে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা স্থবিরতা আসার ঝুঁকি রয়েছে, যা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই-
১. প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা ও দীর্ঘসূত্রতা: স্টার্টআপ ব্যবসা চলে রিয়েল-টাইম গতির ওপর, যেখানে প্রতি সপ্তাহে সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়। কিন্তু সরকারি ফান্ডের ফাইল ছাড় ও অনুমোদনের প্রথাগত দীর্ঘসূত্রতা যদি বজায় থাকে, তবে ফান্ড পাওয়ার আগেই অনেক সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ বন্ধ বা স্থবির হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

২. ঝুঁকি নিতে আমলাতন্ত্রের অনীহা: প্রথাগত সরকারি অডিট বা জবাবদিহিতার কাঠামোর কারণে অনেক সময় কর্মকর্তারা রিস্কি বা নতুন আইডিয়ায় ফান্ড দিতে ভয় পান। কারণ ভেঞ্চার ক্যাপিটালের আন্তর্জাতিক নিয়মই হলো ১০টি স্টার্টআপের মধ্যে ২ থেকে ৩টি সফল হবে এবং বাকিগুলো ব্যর্থ হতে পারে। কর্মকর্তারা যদি ব্যর্থতার দায়ে অডিটের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে থাকেন, তবে তহবিলের অর্থ বিতরণ থমকে যাবে।

৩. রাজনৈতিক বা লবিংয়ের প্রভাবের ঝুঁকি: যদি নিখুঁত ডেটা ও মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব বা তদবিরের ভিত্তিতে ফান্ডের জন্য কোম্পানি বাছাই করা হয়, তবে অযোগ্যরা টাকা পাবে এবং ১৯টি কোম্পানি বাদ পড়ার মতো ঘটনা আরও বড় আকারে আর্থিক লোকসান ডেকে আনবে।

৪. বিদেশি মুদ্রা নীতি ও কড়াকড়ি: বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান ডলার সংকট বা কঠোর রেমিট্যান্স নিয়মাবলীর কারণে বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটালগুলো বাংলাদেশে টাকা বিনিয়োগ করতে বা প্রফিট তুলে নিয়ে যেতে যে জটিলতার মুখোমুখি হয়, তা দূর না করলে সরকারি ফান্ডের টাকা একা পুরো ইকোসিস্টেম টানতে পারবে না।

বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন ও নীতিগত পরামর্শ
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কনজ্যুমার মার্কেট বা ভোক্তা বাজার বিশ্বের ৯ম বৃহত্তম বাজারে পরিণত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। দেশের বিশাল তরুণ জনসংখ্যা এবং ক্রমবর্ধমান ইন্টারনেট ও মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তার স্টার্টআপগুলোর জন্য এক উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ১,০০০ কোটি টাকার বর্ধিত তহবিলের শতভাগ সুফল পেতে এবং আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা কাটাতে ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম (ডিসিআরএএফ) সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট এবং পলিসি গবেষকেরা কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন-

স্বায়ত্তশাসিত পরিচালনা পর্ষদ: স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেডকে সম্পূর্ণ আমলাতান্ত্রিক আমেজ থেকে মুক্ত রেখে দেশের শীর্ষস্থানীয় সফল উদ্যোক্তা, আর্থিক বিশ্লেষক এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে।

ফেইলর বাস্কেট আইনি স্বীকৃতি: ভেঞ্চার ক্যাপিটালের রিস্ক ফ্যাক্টরকে মাথায় রেখে সরকারি অডিট নিয়মে বিশেষ শিথিলতা আনতে হবে, যাতে ব্যবসায়িক কারণে কোনও স্টার্টআপ ব্যর্থ হলে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তা গ্রহণ করা হয় এবং কোনও কর্মকর্তার সততা নিয়ে অহেতুক প্রশ্ন না ওঠে।

সহজ ও দ্রুত এক্সিট পলিসি: বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং সফল স্টার্টআপগুলো যাতে দেশের শেয়ার বাজারের এসএমই প্ল্যাটফর্মে সহজে তালিকাভুক্ত হয়ে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে, তার জন্য বিশেষ আইনি ছাড় দ্রুত কার্যকর করতে হবে।

জাতীয় সংসদে দেয়া ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রীর এই বক্তব্য এবং ১,০০০ কোটি টাকার এই দূরদর্শী রোডম্যাপ প্রমাণ করে বাংলাদেশ কেবল সস্তা শ্রমের দেশ নয়, বরং এটি উদ্ভাবন, মেধা এবং প্রযুক্তিনির্ভর এক শক্তিশালী উদীয়মান অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে শীর্ষ মহলের এই সদিচ্ছাকে আমলাতান্ত্রিক বেড়াজাল এবং নীতিগত অসমন্বয় থেকে মুক্ত রাখতে পারলেই কেবল আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান ‘স্টার্টআপ হাব’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মাথা তুলে দাঁড়াবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *