উদ্যোগ

বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর খাতে বৈশ্বিক সহযোগিতার নতুন দ্বার

ক.বি.ডেস্ক: বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ) সফলভাবে সম্পন্ন করেছে বিএসআইএ সিলিকন রিভার যুক্তরাষ্ট্র রোডশো ২০২৬-এর সিলিকন ভ্যালি পর্ব। এই সফরে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী এবং প্রবাসী বাংলাদেশি (এনআরবি) প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে একাধিক উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সিলিকন ভ্যালি পর্বে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সিলিকন রিভার বাংলাদেশের প্রধান স্থপতি ও পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুস্তাফা হুসেইন। তার সঙ্গে ছিলেন বিএসআইএ-এর নেতৃবৃন্দ এবং সদস্য কোম্পানির প্রতিনিধিরা। সফরজুড়ে বাংলাদেশকে একটি “ন্যাশন অব ইনোভেশন” হিসেবে গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তুলে ধরা হয়।

স্যানডিস্ক: পাঁচ বছরের কৌশলগত সহযোগিতার রূপরেখা
গত ৯ জুন বিএসআইএ-এর প্রতিনিধিদল স্যানডিস্কের সদর দপ্তর পরিদর্শন করে এবং সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাট ক্রাউলি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট দীপাংশু দত্তের সঙ্গে বৈঠক করেন। স্যানডিস্কের অত্যাধুনিক গবেষণা ও উন্নয়ন সুবিধা পরিদর্শনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও স্যানডিস্কের মধ্যে সম্ভাব্য পাঁচ বছরের সহযোগিতা কাঠামো উপস্থাপন করা হয়।

প্রস্তাবিত সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে ছিলো সেমিকন্ডাক্টর জনশক্তি উন্নয়ন; অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং ও টেস্টিং; স্টোরেজ সিস্টেম ভ্যালিডেশন; রিলায়েবিলিটি ইঞ্জিনিয়ারিং; এআই চালিত অবকাঠামো; ডিজিটাল টুইন, ক্রেস্ট (CREST)-এর মাধ্যমে যৌথ গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ কর্মশক্তি উন্নয়ন বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত পোর্টফোলিও উপস্থাপন করে। স্যানডিস্ক নেতৃত্ব সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রসমূহ মূল্যায়নের জন্য একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করেছে।

গ্লোবাল ফাউন্ড্রিজ: বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত
বিএসআইএ-এর প্রতিনিধিদল গ্লোবাল ফাউন্ড্রিজ পরিদর্শন করে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. মাহবুব রাশেদ। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, উন্নত ইলেকট্রনিক্স, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, এআই এবং উদ্ভাবনভিত্তিক পণ্যের পোর্টফোলিও উপস্থাপন করে। বিএসআইএ-এর প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে একটি অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং ডিজাইন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব তুলে ধরে, যা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।

এই বৈঠকের অন্যতম বড় অর্জন হলো দুটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে গ্লোবাল ফাউন্ড্রিজের প্রাইমারি ভেন্ডর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া একাধিক কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়- অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং, বায়োইলেকট্রনিক্স, এআই, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম উন্নয়ন।

সিনোপসিস: ভবিষ্যৎ জনশক্তি ও উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম নির্মাণ
গত ১০ জুন বিএসআইএ-এর প্রতিনিধিদল সিনোপসিস পরিদর্শন করে এবং প্রধান উদ্ভাবনী কর্মকর্তা রন ডানকান-এর সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে বিএসআইএ সিলিকন রিভার, ক্রেস্ট, সিসিপ, সারা, স্টার, ব্রেইনগেইন এবং বিয়ার সামিট -এর রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়।

বৈঠকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে- বিয়ার সামিট ২০২৬- এ সিনোপসিস উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠাবে। সিনোপসিস অ্যাকাডেমিয়া রিসার্চ অ্যালাইন্স (এসএআরএ)-এ বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সাশ্রয়ী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করবে। ৩,৫০০ প্রকৌশলীকে প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে বিএসআইএ-সিসিপ কর্মসূচি চালুর বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।

সিনোপসিস বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে একটি ম্যানুফ্যাক্টচারিং ডিজাইন কিট (এমডিকে) সেন্টার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা এগিয়েছে। এই এমডিকে সেন্টার ভবিষ্যতে অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং, এআই-চালিত ডিজাইন, ডিজিটাল টুইন, রিলায়েবিলিটি এবং সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করবে।

ক্রেডো: উচ্চগতির সংযোগ প্রযুক্তি ও ডিজাইন ইকোসিস্টেম
বিএসআইএ-এর প্রতিনিধিদল ক্রেডো পরিদর্শন করে, এ সময় উপস্থিত ছিলেন অ্যাসোসিয়েট ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. শাতিল হক। সিলিকন রিভার বাংলাদেশের ভিশন উপস্থাপনের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রযুক্তি ও সক্ষমতা তুলে ধরে। আলোচনার মূল বিষয় ছিলো- সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, হাই-স্পিড কানেক্টিভিটি, গবেষণা সহযোগিতা, জনশক্তি উন্নয়ন, ইকোসিস্টেম অংশীদারিত্ব।

স্যাক্রামেন্টো ব্রেইনগেইন রিসেপশন: প্রবাসী সেমিকন্ডাক্টর সম্প্রদায়ের শক্তিশালী অঙ্গীকার
সিলিকন ভ্যালির কর্মসূচি শেষে বিএসআইএ-এর প্রতিনিধিদল প্রায় ১৫০ মাইল পথ অতিক্রম করে স্যাক্রামেন্টো-তে পৌঁছে। এই সমাবেশের আয়োজন করেন প্রবীণ প্রবাসী সেমিকন্ডাক্টর পেশাজীবী তৌহিদ রহমান। স্যাক্রামেন্টো অঞ্চলের প্রবাসী সেমিকন্ডাক্টর পেশাজীবীরা তাৎক্ষণিকভাবে ব্রেইনগেইন উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার অঙ্গীকার করেন এবং মেন্টরশিপ, বিনিয়োগ, কৌশলগত পরামর্শ ও শিল্প সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেন।

ইনটেল: বৈশ্বিক বাংলাদেশি প্রযুক্তি নেতৃত্বকে একত্রিত করা
১১ জুন বিএসআইএ-এর প্রতিনিধিদল ইনটেল করপোরেশন পরিদর্শন করে। ড. মাহবুব মজুমদারের নেতৃত্বে ইনটেলের বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদ এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থান থেকে আরও অনেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। ড. মুহাম্মদ মুস্তাফা হুসেইন বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর যাত্রা, অর্জন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে একটি অনুপ্রেরণামূলক উপস্থাপনা দেন। পরবর্তীতে অংশগ্রহণকারী কোম্পানিগুলো তাদের সক্ষমতা ও পোর্টফোলিও তুলে ধরে।

এআরএম: ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি সহযোগিতার নতুন দিগন্ত
১১ জুন বিএসআইএ-এর প্রতিনিধিদল এআরএম পরিদর্শন করে। এই বৈঠকে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন এনএক্সপি-এর গবেষণা ও উন্নয়ন পরিচালক ড. সাইয়েদ বদরুদ্দোজা। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিলো এআই-নির্ভর কম্পিউটিং, উন্নত সিস্টেম ডিজাইন, সেমিকন্ডাক্টর জনশক্তি উন্নয়ন, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি রোডম্যাপ এবং ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্ব।

সিলিকন রিভার ব্যাঙ্কোয়েট রিসেপশন: প্রযুক্তি নেতাদের মহামিলন
১১ জুন অনুষ্ঠিত সিলিকন রিভার ব্যাঙ্কোয়েট রিসেপশনে প্রায় ১০০ জন প্রবাসী উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, বিনিয়োগকারী এবং সিনোপসিস, স্যানডিস্ক, গ্লোবালফাউন্ড্রিজ, ইনটেল সহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধান অতিথি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক আরিফুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন বিএসআইএ সভাপতি এম এ জব্বার, ড. আনিসুল খান, ড. মুহাম্মদ মুস্তাফা হুসেইন।

ইল্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সিস্টেমস (ওয়াইইএস): যন্ত্রপাতি প্রকৌশল ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা
১২ জুন বিএসআইএ-এর প্রতিনিধিদল ইল্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সিস্টেমস (ওয়াইইএস) পরিদর্শন করে। প্রতিনিধিদল ওয়াইইএস-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড. জিয়া করিম-এর সঙ্গে বৈঠক করে। আলোচনার মূল ক্ষেত্র ছিলো যন্ত্রপাতি প্রকৌশল, উন্নত প্যাকেজিং, অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিং অবকাঠামো, ডিজিটাল টুইন / ডিজিটাল প্রতিরূপ, দক্ষ জনবল উন্নয়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা। ওয়াইইএস নেতৃত্ব কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যৌথ কাজের আগ্রহ প্রকাশ করে।

ইউসি বার্কলে স্কাইডেক: বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের সংযোগ
সফরের শেষ পর্বে বিএসআইএ-এর প্রতিনিধিদল ইউসি বার্কলে স্কাইডে পরিদর্শন করে। বৈঠকে কয়েকটি বিষয়ে ঐকমত্য হয়- বাংলাদেশি উদ্ভাবকদের জন্য প্রস্তুতিমূলক কর্মশালা, বিশ্বমানের ভিসি-দের সামনে উপস্থাপনার প্রশিক্ষণ, বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক উদ্ভাবন শোকেস এবং সম্ভাবনাময় উদ্ভাবনে সহ-বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান।

সিলিকন ভ্যালির প্রতিটি কর্মসূচিতে ড. মুহাম্মদ মুস্তাফা হুসেইন সিলিকন রিভার বাংলাদেশ-এর ভিশন, রোডম্যাপ এবং ইকোসিস্টেম উপস্থাপন করেন এবং বিএসআইএ সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রযুক্তি, সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তুলে ধরে। এই সফর প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর, এআই, অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। সিলিকন রিভার, ব্রেইনগেইন, ক্রেস্ট, সিসিপ, সারা, স্টার এবং বিয়ার সামিট-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছে, যেখানে দেশটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন ইকোসিস্টেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *