পকেটে থাকা ‘গুপ্তচর’: স্মার্টফোন কি আমাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার শেষ সীমানা?
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা): বর্তমান সময়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে। বিশ্বরাজনীতির শীর্ষ নেতাদের থেকে শুরু করে প্রভাবশালী প্রযুক্তিবিদ অনেকের স্মার্টফোনের ক্যামেরার ওপর দেখা যায় এক টুকরো লাল বা কালো টেপের আস্তরণ। প্রশ্ন হলো তারা কি এমন কিছু জানেন, যা আমরা সাধারণ মানুষ জানি না?
আজকের স্মার্টফোন কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি আপনার পকেটে থাকা সবচেয়ে বড় ট্র্যাকিং ডিভাইস, নিরন্তর তথ্য সংগ্রাহক এবং আপনার ব্যক্তিগত জীবনের ওপর ২৪/৭ খোলা এক জানালা। প্রশ্নটি আজ অতি প্রাসঙ্গিক আমরা কি প্রযুক্তির ব্যবহারে বেশি নিশ্চিন্ত, নাকি নিরাপত্তার প্রশ্নে ওরাই আসলে বেশি সতর্ক?
আধুনিক যুগে স্মার্টফোনের ভয়ংকর প্রভাব ও বৈশ্বিক তথ্য-উপাত্ত
বর্তমান সময়ে আমাদের ফোনটি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও এটি একটি অদৃশ্য গোয়েন্দার মতো কাজ করছে-
সব সময় খোলা জানালা: একটি স্মার্টফোনে থাকা ক্যামেরা এবং মাইক্রোফোন হ্যাকার বা স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে দূর থেকেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আপনি যখন ফোনটি ব্যবহার করছেন না, তখনও এটি আপনার কথা শুনতে পারে এবং আশপাশের ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে পারে।
জিরো-ক্লিক স্পাইওয়্যার ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র: বর্তমানে এমন সব ম্যালওয়্যার (যেমন ‘পেগাসাস’ বা ‘প্রেডেটর’) আবিষ্কৃত হয়েছে, যা ফোনে প্রবেশ করতে ব্যবহারকারীর কোনো লিঙ্কে ক্লিক করার প্রয়োজন পড়ে না। কেবল একটি মিসড কল বা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের মাধ্যমেই ডিভাইসটি সংক্রমিত হতে পারে। এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত দাবি করা স্মার্টফোনগুলোও এই স্পাইওয়্যারের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।
স্নোডেন থিওরি ও ‘ফেক পাওয়ার অফ’: সাবেক এনএসএ ঠিকাদার এডওয়ার্ড স্নোডেন ফাঁস করেছেন যে, ফোন বন্ধ থাকা মানেই তা নিরাপদ নয়। কিছু উন্নত ম্যালওয়্যার ফোনের অপারেটিং সিস্টেমের গভীরে এমনভাবে লুকিয়ে থাকে যে, আপনি ফোনটি ‘সুইচ অফ’ করলেও এটি আসলে চালু থাকে এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে তথ্য পাঠাতে থাকে। বিশ্বনেতারা তাই কেবল সফটওয়্যারে ভরসা না করে ক্যামেরায় ফিজিক্যাল টেপ ব্যবহার করেন।
সেন্সর হ্যাকিং ও এয়ার-গ্যাপড স্পাইং: কেবল ক্যামেরা নয়, ফোনের লাইট সেন্সর, জাইরোস্কোপ এবং ম্যাগনেটোমিটার ব্যবহার করে আপনার গতিবিধি ট্র্যাক করা সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, ফোনের স্পিকার এবং মাইক্রোফোন ব্যবহার করে এমন আল্ট্রাসনিক ফ্রিকোয়েন্সি আদান-প্রদান করা সম্ভব যার মাধ্যমে অফলাইন থাকা সত্ত্বেও একটি ফোন অন্য একটি ডিভাইসের সাথে তথ্য শেয়ার করতে পারে।
বায়োমেট্রিক ডেটার ঝুঁকি: আঙুলের ছাপ বা ফেস-আইডি হ্যাক হলে তা সাধারণ পাসওয়ার্ডের চেয়েও ভয়ংকর। কারণ পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা সম্ভব হলেও মানুষের বায়োমেট্রিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা অসম্ভব।
গ্রাহক পর্যায়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষণ: আমরা ও আমাদের চারপাশ
সাধারণ ব্যবহারকারীরা প্রায়ই মনে করেন যে তারা গুরুত্বপূর্ণ কেউ নন, তাই তাদের তথ্য চুরি করে কারো কোনো লাভ নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন-
বিগ ডেটা ও নজরদারি পুঁজিবাদ: বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো আপনার অডিও আলাপচারিতা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। আপনি মুখে কোনো পণ্যের নাম বললে কিছুক্ষণ পরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তার বিজ্ঞাপন দেখা যাওয়া কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়; এটি মাইক্রোফোনের মাধ্যমে করা ‘অডিও লিসেনিং’-এর ফল।
আইওটি ও স্মার্ট হোমের ঝুঁকি: আপনার স্মার্ট ওয়াচ, স্মার্ট স্পিকার বা স্মার্ট টিভিও একই কাজ করছে। ফোন অন্য রুমে থাকলেও ঘরের স্মার্ট স্পিকার আপনার ব্যক্তিগত আলাপ শুনতে পারে এবং তা ক্লাউড সার্ভারে পাঠাতে পারে।
ডিজিটাল ডার্ক প্যাটার্ন: অ্যাপগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যাতে আপনি অবচেতন মনেই খুব দ্রুত সব পারমিশন ‘Allow’ করে দেন। এটি ব্যবহারকারীর অজ্ঞতাকে পুঁজি করে তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার একটি মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং: বাংলাদেশে অধিকাংশ হ্যাকিং হয় মানুষের অসচেতনতার কারণে। ফিশিং লিঙ্ক বা ভুয়া পুরস্কারের লোভে সাধারণ মানুষ নিজেরাই নিজেদের ফোনের নিয়ন্ত্রণ হ্যাকারদের হাতে তুলে দিচ্ছে। বিটিআরসি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হার প্রতি বছর আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
এআই যুগের নতুন আতঙ্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেতিবাচক প্রভাব
এআই ভয়েস ক্লোনিং ও ডিপফেক: স্মার্টফোনের মাইক্রোফোন হ্যাক করে আপনার কণ্ঠস্বরের নমুনা নিয়ে পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অবিকল কণ্ঠ তৈরি করে আর্থিক জালিয়াতি বা সামাজিক মানহানি ঘটানো সম্ভব।
অ্যাকোস্টিক সাইড চ্যানেল অ্যাটাক: এআই এখন কিবোর্ডের শব্দের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে ৯৫% পর্যন্ত নির্ভুলভাবে আপনার টাইপ করা পাসওয়ার্ড উদ্ধার করতে পারে।
অ্যাডভারসারিয়াল অ্যাটাক: হ্যাকাররা এমন কিছু ইমেজ বা সিগন্যাল তৈরি করে যা মানুষের চোখে সাধারণ মনে হলেও ফোনের এআই সিকিউরিটি সিস্টেমকে বিভ্রান্ত করে আপনার অজান্তেই ফোনের লক খুলে দিতে পারে।
উত্তরণের উপায়: সামগ্রিক ব্যবহারকারীদের জন্য সুরক্ষা প্রোটোকল
ফিজিক্যাল প্রটেকশন: ল্যাপটপ এবং স্মার্টফোনের ক্যামেরায় স্লাইডিং কভার বা টেপ ব্যবহার করা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। স্পর্শকাতর মিটিংয়ে ‘ফারডে ব্যাগ’ ব্যবহার করুন যা সব সিগন্যাল ব্লক করে দেয়।
অ্যাপ পারমিশন অডিট: নিয়মিত চেক করুন কোন কোন অ্যাপ ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন ব্যবহার করছে। অপ্রয়োজনীয় পারমিশন বন্ধ রাখুন।
ওএস আপডেট ও এনক্রিপশন: সব সময় লেটেস্ট সিকিউরিটি আপডেট ইনস্টল করুন এবং যোগাযোগের জন্য এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড অ্যাপ (যেমন সিগনাল) ব্যবহার করুন।
পাবলিক নেটওয়ার্ক বর্জন: বিমানবন্দর বা ক্যাফে-র ফ্রি ওয়াইফাই হ্যাকারদের জন্য সবচেয়ে বড় ফাঁদ।
আমাদের ভবিষ্যৎ গন্তব্য: আমরা কি দাসে পরিণত হচ্ছি?
আমরা এমন এক ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি যেখানে ‘গোপনীয়তা’ হবে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ও দুর্লভ সম্পদ। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং: ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রচলিত সব এনক্রিপশন ভেঙে ফেলার ক্ষমতা রাখে। হ্যাকাররা এখন ‘Harvest Now, Decrypt Later’ কৌশলে আপনার এনক্রিপ্টেড ডেটা জমা রাখছে, যাতে ভবিষ্যতে তা পড়া যায়। নজরদারি এখন মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে চলে গেছে। এআই বলে দিতে পারবে আপনি ভবিষ্যতে কী কিনবেন বা কাকে ভোট দেবেন। এটি ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য এক চরম হুমকি।
প্রযুক্তির এই মহাসড়কে আমরা যত দ্রুত ছুটছি, ততই আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তাকে পেছনে ফেলে আসছি। ফোনের ক্যামেরায় লাগানো ওই এক টুকরো লাল টেপ আসলে কেবল একটি স্টিকার নয়; ওটি একটি নীরব প্রতিবাদ। এটি আমাদের জানান দিচ্ছে যে, আমরা যত বেশি ‘ডিজিটাললি কানেক্টেড’ হচ্ছি, তত বেশি ‘পার্সোনালি ইনসিকিউর’ হয়ে পড়ছি। দিনশেষে প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়, প্রশ্নটি আমাদের অস্তিত্বের আমরা কি প্রযুক্তির মালিক থাকবো, নাকি পকেটে রাখা এই ছোট যন্ত্রটির দাসে পরিণত হবো? মনে রাখবেন, ডিজিটাল দুনিয়ায় সচেতনতাই হচ্ছে একমাত্র রক্ষাকবচ।





