বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হলো বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস-২০২৬
ক.বি.ডেস্ক: ‘ডিজিটাল লাইফলাইন: একটি সংযুক্ত বিশ্বে স্থিতিস্থাপকতা শক্তিশালী করা’ স্লোগানে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হলো আজ ১৭ মে ‘‘বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস-২০২৬ (ডব্লিউটিআইএসডি)’’। দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সেমিনারের আয়োজন করা হয় এবং তিনটি বিভাগে অনলাইন রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
পাশাপাশি ‘ডব্লিউটিআইএসডি ২০২৬’ উপলক্ষে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ, স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন, প্রযুক্তিভিত্তিক স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া দুই দিনব্যাপী (১৭-১৮ মে) বিটিআরসি প্রাঙ্গণে টেলিকম ও প্রযুক্তি মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় মোবাইল অপারেটর, মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, টাওয়ার কোম্পানি, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার, আইসিএক্স, আইআইজি, বিটিসিএল সহ টেলিকম ও প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট ৩০টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে।
আজ রবিবার (১৭ মে) ‘ডব্লিউটিআইএসডি ২০২৬’ উপলক্ষে রাজধানীর আগারগাঁওস্থ বিটিআরসি ভবনের প্রধান সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব কাজী আনোয়ার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী। সভাপতিত্ব করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব বিলকিস জাহান রিমি।
মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘‘বর্তমান সরকার আইসিটি খাতকে দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। এআই, হার্ডওয়্যার, সেমিকন্ডাক্টর, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা সেন্টার, স্টার্টআপ এবং ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি উৎপাদন ও রপ্তানিতে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে সরকার কাজ করছে। বর্তমানে দেশে মোবাইল ফোন সংযোগ ১৮.৮৪ কোটিতে এবং ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা ১৩.৩৬ কোটিতে পৌঁছেছে। ৪জি নেটওয়ার্ক দেশের ৯৯ শতাংশ জনগোষ্ঠীর আওতায় এসেছে।’’

উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ‘‘বাংলাদেশ মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যে রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্বমানের ফাইভজি এবং দেশব্যাপী ফাইবার অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এক নাগরিক, এক ওয়ালেট, এক আইডি এবং জাতীয় ডেটা ব্যাংক গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সম্প্রসারণের কথাও রয়েছে।’’
এক ভিডিও বার্তায় আইটিইউ-এর মহাসচিব ডোরিন বোগডান-মার্টিন বলেন, ‘‘ডিজিটাল নেটওয়ার্ক এখন মানুষের জন্য জীবনরেখায় পরিণত হয়েছে। শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’’
মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, ‘‘বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ কিলোমিটার ফাইবার অপটিক সাবমেরিন ক্যাবল বিস্তৃত রয়েছে, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ ডেটা ট্রাফিক সম্পন্ন হয়। ডিজিটাল অবকাঠামোকে আরও নিরাপদ, শক্তিশালী ও সহনশীল করে গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী সমাধান তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’’
প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, ‘‘ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থায় নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপরও জোর দিতে হবে।’’
প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘‘প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন খুব অল্প সময়েই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। বিমানবন্দরগুলোতে আধুনিক ডিজিটাল সেবা ও ওয়াই-ফাই সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’’
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, ‘‘বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল খাতের বিকাশে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সেবার মান ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ ডিজিটাল সেবাদানকারী দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাই।’’
সচিব কাজী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘দুর্যোগের সময়ে একটি মোবাইল বার্তাও একটি জীবন বাঁচাতে পারে। ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, সাইবার নিরাপত্তা, পেপারলেস প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট ডেটা ও আইওটি প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’’
সচিব বিলকিস জাহান রিমি বলেন, ‘‘ডিজিটাল সংযোগ এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার অন্যতম ভিত্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আইওটি, ৫জি, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা প্রযুক্তি আগামী দিনের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।’’
প্রতি বছর ১৭ মে পালিত হয় ‘বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস (ডব্লিউটিআইএসডি)’। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্তার, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই দিবসটি উদযাপন করা হয়। দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালন করে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ), যা জাতিসংঘের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষায়িত সংস্থা।
১৮৬৫ সালের ১৭ মে প্যারিসে আন্তর্জাতিক টেলিগ্রাফ কনভেনশন স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ)। সেই স্মরণে প্রতিবছর ১৭ মে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ দিবস পালন করা হয়। পরে ২০০৬ সালে তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বিবেচনায় “তথ্য সংঘ” শব্দটি যুক্ত করে দিবসটির বর্তমান নামকরণ করা হয় ‘বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস (ডব্লিউটিআইএসডি)’।





