তরুণ উদ্যোক্তাদের ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, শুরু ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচি
ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ: চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের ব্যবসা শুরু করতে চান, এমন তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের উপজেলা পর্যায়ের সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালু করতে যাচ্ছে ‘উদ্যোগ (ইউডিওজি): উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, নির্বাচিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’। এ কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত তরুণ উদ্যোক্তারা তাদের প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন পাবেন।
তবে এটি নিছক ঋণ দেয়ার কোনও প্রকল্প নয়। ব্যবসার ধারণা থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, ব্যবসা নিবন্ধন, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ নতুন উদ্যোক্তাদের পথচলার বিভিন্ন ধাপে সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ব্যবসা করার ইচ্ছা থাকলেও অর্থ, অভিজ্ঞতা কিংবা সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে যারা পিছিয়ে আছেন, তাদের জন্য কর্মসূচিটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠতে পারে।
প্রতিযোগিতা নয়, খুঁজে বের করা হবে উদ্যোক্তা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ‘উদ্যোগ’ কোনও প্রতিযোগিতামূলক কর্মসূচি নয়। বরং দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো তাদের বিদ্যমান শাখা নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে উপজেলা পর্যায়ে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা খুঁজে বের করবে। এরপর সংশ্লিষ্ট তরুণের ব্যবসায়িক ধারণা, উদ্যোগটির সম্ভাবনা এবং প্রকৃত অর্থের প্রয়োজন যাচাই করে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাৎ শুধু আবেদন করলেই অর্থায়ন পাওয়া যাবে না; ব্যবসার ধারণাটি বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময় কি না, সেটিও বিবেচনায় নেয়া হবে।
সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা, অর্ধেক ঋণ অর্ধেক অনুদান
কর্মসূচিটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো অর্থায়নের কাঠামো। নির্বাচিত একজন উদ্যোক্তা তার প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অর্থায়ন প্যাকেজ পাবেন। এই অর্থের ৫০ শতাংশ হবে ব্যাংক ঋণ; ৫০ শতাংশ হবে অনুদান; গ্রাহক পর্যায়ে সুদ বা মুনাফার হার হবে সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৭ শতাংশ এবং ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনও সহায়ক জামানত প্রয়োজন হবে না।
ফলে প্রচলিত ব্যাংক ঋণের তুলনায় নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগটি তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। তবে এখানে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত। নির্ধারিত সময়ে ঋণের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনুদানের অংশটি সুদবিহীন ঋণে রূপান্তরিত হবে। এরপর ঋণ হিসাব প্রচলিত নিয়মে শ্রেণিকৃত হবে। ঋণগ্রহীতা খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হলে ভবিষ্যতে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার যোগ্যতাও হারাতে পারেন।
কারা আবেদন করতে পারবেন?
‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির জন্য আবেদন করতে হলে কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। আবেদনকারীকে বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হতে হবে এবং আবেদনের শেষ তারিখে তার বয়স ২৮ বছরের বেশি হওয়া যাবে না। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট উপজেলার বাসিন্দা হতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আগে থেকে ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ একজন তরুণের যদি বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক ধারণা থাকে, তাহলে তিনি নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে এ কর্মসূচিতে আবেদন করতে পারবেন।
প্রযুক্তি থেকে কৃষি সব বৈধ উদ্যোগেই সুযোগ
কর্মসূচিটির আওতায় কোনও নির্দিষ্ট একটি খাতকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার পাশাপাশি প্রচলিত বিভিন্ন খাতের উদ্যোগও বিবেচনায় আসবে। সম্ভাব্য খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে- কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, বিভিন্ন সেবা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ।
এ ছাড়া অন্যান্য বৈধ ব্যবসায়িক উদ্যোগও কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হবে। ফলে উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সম্পদ, দক্ষতা ও বাজারের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা শুরু করতে চান এমন তরুণদের জন্য এটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
আবেদন করতে লাগবে না কোনও ফি
‘উদ্যোগ’ কর্মসূচিতে আবেদন করা যাবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনও তফসিলি ব্যাংকের শাখায় নির্ধারিত ফরমের মাধ্যমে আবেদন জমা দেয়া যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কর্মসূচির বিস্তারিত বাস্তবায়ন নির্দেশনাসংবলিত সার্কুলার ১৬ সেপ্টেম্বর জারি করা হবে। সার্কুলার প্রকাশের পরবর্তী এক মাস আবেদন করার সুযোগ থাকবে। তাই আগ্রহী তরুণদের জন্য এখন থেকেই নিজেদের ব্যবসায়িক ধারণা, সম্ভাব্য খরচ, বাজার, পণ্য বা সেবার ধরন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রস্তুতি নেয়া গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম ধাপে ৬৪ উপজেলা, সুযোগ পাবেন ৬৪০ তরুণ
প্রাথমিকভাবে দেশের আটটি বিভাগের আটটি জেলার ৬৪টি উপজেলায় ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচি চালু করা হবে। নির্বাচিত জেলাগুলো হলো- মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নেত্রকোনা। প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে মোট ৬৪০ জন তরুণ উদ্যোক্তা প্রথম পর্যায়ে নির্বাচিত হবেন। এটি কেবল একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য জেলার উপজেলাগুলোতেও কর্মসূচিটি ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে প্রতি বছর ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন ও সহায়তা দেয়া হবে। টাকা দেয়ার পাশাপাশি শেখানো হবে ব্যবসা পরিচালনাও। নতুন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সবসময় অর্থের অভাব নয়; ব্যবসা কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, বাজার বুঝতে হবে কীভাবে, ব্যবসা নিবন্ধন কোথায় করতে হবে কিংবা একটি কার্যকর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা কীভাবে তৈরি করতে হবে এসব বিষয়েও অনেকের অভিজ্ঞতা থাকে না।
এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচিতে অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচিত উদ্যোক্তারা পাবেন- উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ; অভিজ্ঞ পরামর্শকের ধারাবাহিক পরামর্শ; ব্যবসা নিবন্ধনে সহায়তা; ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ। ফলে একজন নতুন উদ্যোক্তা শুধু ব্যবসা শুরুর জন্য অর্থই পাবেন না, বরং ব্যবসাটিকে টেকসই করার প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও পরামর্শও পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচি?
বাংলাদেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ থাকলেও অর্থের অভাব, ব্যাংক ঋণ পাওয়ার জটিলতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং সঠিক পরামর্শের অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে এই সমস্যাগুলো আরও বেশি দৃশ্যমান। রাজধানী বা বড় শহরের বাইরে ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী তরুণদের জন্য অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যাংকিং ও ব্যবসায়িক সহায়তার সুযোগও তুলনামূলকভাবে সীমিত।
এই বাস্তবতায় ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির বিশেষত্ব হলো- উপজেলা পর্যায় থেকেই সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা খুঁজে বের করা এবং তাদের ব্যবসা দাঁড় করাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সফলভাবে ব্যবসা দাঁড় করাতে পারলে তার নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, একজন সফল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে ৩ থেকে ৫ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন। সে হিসেবে প্রতি বছর ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা
‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় বার্তা হলো ব্যবসা শুরু করতে বড় শহরে থাকা বা আগে থেকেই বড় মূলধন থাকা বাধ্যতামূলক নয়। উপজেলা পর্যায় থেকেও একটি বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক ধারণা নিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অর্থায়ন, জামানত ছাড়াই ঋণের সুযোগ, অনুদানের অংশ, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ সব মিলিয়ে কর্মসূচিটি তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথে একটি সহায়ক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য নির্ভর করবে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা সঠিকভাবে নির্বাচন, স্বচ্ছ অর্থায়ন, কার্যকর প্রশিক্ষণ এবং অর্থায়নের পর নিয়মিত পরামর্শ ও তদারকির ওপর। এসব বিষয় যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে ‘উদ্যোগ’ শুধু কয়েক হাজার তরুণকে অর্থায়ন দেয়ার কর্মসূচি না হয়ে উপজেলা পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে পরিণত হতে পারে।





