‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে
ক.বি.ডেস্ক: অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল বেটিং প্ল্যাটফর্ম এবং ম্যাচ ফিক্সিং প্রতিরোধে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের লক্ষ্যে ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বিলে জুয়া সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের জন্য কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। নতুন আইনে ডিজিটাল জুয়া প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন ও দূরবর্তী জুয়া, বেটিং, ওয়েজারিং, ডিজিটাল সম্পদ ও ডিজিটাল ওয়ালেট, টোটালাইজেটর, পেশাদার বুকমেকার, ম্যাচ ফিক্সিং এবং স্পট ফিক্সিংসহ বিভিন্ন নতুন ধারণার আইনগত সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অধিবেশনে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে তা পাস হয়।
বিলটি পাসের আগে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, এম আব্দুল গফুর, জহিরুল ইসলাম, আমির হামজা, কামরুল হাসান, আখতার হোসেন এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বিলটি অধিকতর পর্যালোচনার জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো এবং জনমত গ্রহণের প্রস্তাব দেন। তবে কণ্ঠভোটে সেই প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়।
বিলটি উত্থাপনকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া কার্যক্রমের দ্রুত বিস্তার মোকাবিলায় নতুন আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে জুয়া প্রচলিত আসর থেকে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়েছে। ঔপনিবেশিক আমলের পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭ বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া নিয়ন্ত্রণে আর কার্যকর নয়। তাই আইনটি যুগোপযোগী করতে নতুন বিল আনা হয়েছে।’’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘অনলাইন জুয়া এখন শুধু সামাজিক সমস্যা নয়; এটি সাইবার নিরাপত্তা ও আর্থিক অপরাধেরও বড় উদ্বেগের বিষয়। অনেক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে এবং অর্থপাচারের পথও তৈরি করতে পারে। তাই আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
সরকারের মতে, প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে জুয়ার ধরন ব্যাপকভাবে বদলে গেছে, যা জনশৃঙ্খলা, সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আর্থিক নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাইবার অপরাধ তদন্তকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশভিত্তিক ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে পরিচালিত অনলাইন বেটিং চক্রের বিস্তার নিয়ে সতর্ক করে আসছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক জুয়ার প্ল্যাটফর্মে স্থানীয় ব্যবহারকারী যুক্ত করার অভিযোগে পরিচালিত একাধিক অবৈধ বেটিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। তদন্তে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং ডিজিটাল পেমেন্ট চ্যানেলের মাধ্যমে জুয়াসংক্রান্ত লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অধিকাংশ অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্ম সীমান্ত অতিক্রম করে পরিচালিত হওয়ায় বিদ্যমান আইন দিয়ে এগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া কঠিন। এ কারণে নতুন আইনে শুধু জুয়া খেলাকেই নয়, অবৈধ জুয়ার আয়োজন, পরিচালনা, সহায়তা, প্রচার কিংবা প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত জুয়া আর্থিক সংকট, পারিবারিক বিরোধ, উদ্বেগসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। অনলাইনে ব্যক্তিগত পরিসরে জুয়া খেলা হওয়ায় আসক্তি শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, ফুটবল লিগ এবং ই-স্পোর্টস প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে তরুণদের মধ্যে অনলাইন বেটিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নতুন আইনে ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিংকে পৃথক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অবৈধ বেটিং বাজার ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ফলাফলকে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করে এবং পেশাদার ক্রীড়ার প্রতি জনসাধারণের আস্থা নষ্ট করে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, শুধু আইন করলেই অনলাইন জুয়া পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এজন্য আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা, টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আইন অনুযায়ী, অপরাধের ধরন ও গুরুত্ব অনুযায়ী দোষীদের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেয়া যাবে। তবে শাস্তির বিস্তারিত কাঠামো আইন প্রণয়নের পরবর্তী প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত করা হবে। অবৈধ জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধ করা, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর প্রণীত জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ দেশের জুয়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় একটি বড় সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল জুয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের নতুন উদ্যোগের প্রতিফলন।





