এনবিআরের নতুন তদারকি ও ই-কমার্সের শঙ্কা: সংকট থেকে উত্তরণের পথ
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা): জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৪৭ ধারার আওতায় উৎসে কর (টিডিএস) তদারকিতে কর কর্মকর্তাদের যেকোনও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবাধ প্রবেশ, হিসাবসংক্রান্ত কাগজপত্র জব্দ এবং ক্লাউড সার্ভার বা ডিজিটাল ডিভাইসের পাসওয়ার্ড ও এনক্রিপশন ভাঙার মতো পাঁচ দফা কঠোর নির্দেশিকা জারি করেছে।
১৯ জুলাই সব কর অঞ্চলে প্রেরিত এনবিআরের এই নির্দেশনা ব্যবসায়ী সমাজে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর প্রেক্ষিতে দেশের শীর্ষ আটটি বাণিজ্য সংগঠন আইসিসিবি, এমসিসিআই, সিসিসিআই, বিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, ডিসিসিআই ও বিসিএমইএ যৌথভাবে এনবিআর চেয়ারম্যানকে এই আদেশ স্থগিত বা প্রত্যাহারের চিঠি দিয়েছে। নেতাদের মতে, পূর্ব-সচেতনতা ছাড়া এই নির্দেশনার প্রয়োগ ব্যবসায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে, যা কোম্পানি আইন ১৯৯৪, বিডা আইন ২০১৬ এবং সংবিধানের ৩১ ও ৪২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকার ও আইনি সুরক্ষার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
শীর্ষ চেম্বারগুলোর আপত্তির চেয়েও বড় সংকটের মুখে পড়েছে উদীয়মান ডিজিটাল কমার্স খাত। বিশেষ করে ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ক্ষুদ্র-মাঝারি অনলাইন উদ্যোক্তাদের ওপর এই আদেশের প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। এখানে মূল উদ্বেগের জায়গা সরকারের দূরদর্শী নীতি বনাম এনবিআরের প্রয়োগগত বৈপরীত্য।
বর্তমান সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ চেতনাকে সামনে রেখে উদ্যোক্তাবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে এবং তরুণ উদ্যোক্তা, এসএমই ও ফ্রিল্যান্সারদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। সেখানে এনবিআরের এই আমলাতান্ত্রিক নির্দেশিকা সরকারের দর্শনের বিপরীত। ৫-দফা নির্দেশনায় কর কর্মকর্তাদের প্রদত্ত অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা ডিজিটাল ব্যবসার পরিচালনার সঙ্গে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
পূর্ব-নোটিশ ছাড়া প্রাঙ্গণ পরিদর্শনের নামে বাসাবাড়িতে তদারকি মানসিক ও সামাজিক হয়রানির রূপ নেবে
প্রথমত, ই-কমার্স ও এফ-কমার্স মূলত ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ বা ক্লাউড সফটওয়্যারে গ্রাহক তথ্য পরিচালনা করে। নিরাপদ ডিজিটাল অডিট প্রোটোকল ছাড়া কর কর্মকর্তারা সরাসরি সার্ভারে ঢুকে পাসওয়ার্ড বা এনক্রিপশন ভাঙলে ব্যবসার গোপনীয়তা ও গ্রাহকের ডেটা প্রাইভেসি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
দ্বিতীয়ত, উৎসে কর কর্তন ও চালানে জমার হিসাব অত্যন্ত জটিল। সিংহভাগ তরুণ উদ্যোক্তা ট্রেড লাইসেন্স বা টিন নিয়ে ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করলেও টিডিএস হিসাব সংরক্ষণে অভিজ্ঞ নন। এই অনভিজ্ঞতার সুযোগে মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক তল্লাশি, হয়রানি ও অহেতুক জরিমানার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে।
তৃতীয়ত, দেশের কয়েক লাখ এফ-কমার্স উদ্যোক্তার বড় অংশ নারী, যারা গৃহভিত্তিক পরিবেশে বাসাবাড়ি থেকে ব্যবসা চালান। পূর্ব-নোটিশ ছাড়া প্রাঙ্গণ পরিদর্শনের নামে বাসাবাড়িতে তদারকি মানসিক ও সামাজিক হয়রানির রূপ নেবে। এ ছাড়া, পেমেন্ট গেটওয়ে, ক্রেডিট কার্ড বা বিকাশ-নগদের তথ্যে নিট আয় ও মোট লেনদেনের পার্থক্য এনবিআর কর্মকর্তারা না বুঝলে ছোট উদ্যোক্তারা অতিরিক্ত করের নোটিশ ও আইনি জটিলতায় আটকা পড়বেন।
এনবিআরের এই আমলাতান্ত্রিক নির্দেশিকা সরকারের দর্শনের বিপরীত
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, ২০২৩ সালে পাস হওয়া আয়কর আইনটিই বলবৎ রয়েছে। প্রতি বছর বাজেটে কিছু সংশোধন হলেও ২০২৬ সালের বর্তমান অর্থবছরে ২০২৩ সালের মূল আইনের ১৪৭ ধারাটি ১৯ জুলাইয়ের সার্কুলারের মাধ্যমে পুরোপুরি প্রযোজ্য। এনবিআর বিশেষ প্রজ্ঞাপন বা এসআরও দিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ছাড় না দিলে এই প্রশাসনিক খড়্গ ২০২৬ সালেও অনলাইন ব্যবসায়ীদের ওপর ঝুলে থাকবে। এটি কেবল আশ্বাসে সমাধানযোগ্য নয়, বরং আইনি প্রজ্ঞাপনের বাধ্যবাধকতা দাবি করে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৫০ লাখের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ রয়েছে, যার একটি বড় অংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। খাতসংশ্লিষ্ট ডিজিটাল কমার্স গবেষণা প্ল্যাটফর্ম ও বিশ্লেষকদের মতে, দেশে ফেসবুক ও ওয়েবসাইটভিত্তিক অন্তত ৩ থেকে ৫ লাখ সক্রিয় অনলাইন উদ্যোক্তা রয়েছেন। এদের বেশিরভাগই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি থেকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় আসার চেষ্টা করছেন। এমন সময়ে কঠোর অডিট নীতি চালু করলে উদ্যোক্তারা প্রাতিষ্ঠানিক হতে আগ্রহ হারাবেন এবং বহু উদ্যোগ অঙ্কুরেই বিনাশ হবে।
সুপ্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান আর ঘরোয়া পরিবেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে একই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো চরম নীতিগত বৈষম্য। বড় শিল্পগ্রুপের ডেডিকেটেড চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আইনি দল ও কর উপদেষ্টা থাকে। অথচ ক্ষুদ্র ই-কমার্স উদ্যোক্তা নিজেই পেজ পরিচালনা, প্যাকিং, ডেলিভারি, কাস্টমার সার্ভিস ও হিসাব সামলান। তা ছাড়া অনলাইন ব্যবসায় প্রফিট মার্জিন মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ। অডিটের নামে ফাইল জব্দ বা ব্যাংক হিসাব স্থবির করলে ছোট উদ্যোগগুলোর ক্যাশ-ফ্লো বন্ধ হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে যাবে।
কঠোর অডিট নীতি চালু করলে উদ্যোক্তারা প্রাতিষ্ঠানিক হতে আগ্রহ হারাবেন এবং বহু উদ্যোগ অঙ্কুরেই বিনাশ হবে
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডাবল ট্যাক্সেশন বা দ্বৈত করের ফাঁদ। অনলাইন লেনদেনে পেমেন্ট গেটওয়ে, বিকাশ-নগদ বা রেডেক্স, পাঠাও ও স্টিডফাস্টের মতো লজিস্টিকস কোম্পানিগুলো আগেই ১.৫ থেকে ৩ শতাংশ মার্চেন্ট সার্ভিস ফি কেটে নেয়, যা মূলত উৎসে প্রসেস করা। অডিট কর্মকর্তারা মোট লেনদেনকে মূল আয় ধরলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে একই টাকার ওপর বারবার কর দেখাতে হবে। তদুপরি, খুচরা সাপ্লায়ারদের থেকে ভ্যাট ইনভয়েস না পাওয়ায় পরিদর্শনে গিয়ে তথ্যের অমিল দেখিয়ে বড় জরিমানার ঝুঁকি থাকে।
আন্তর্জাতিক নজির পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল কমার্স ও ক্ষুদ্র ব্যবসা সুরক্ষায় বিশেষ নীতি অনুসরণ করা হয়। ভারতে ই-কমার্স বিক্রয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জিএসটি ও আয়করে সুনির্দিষ্ট ছাড় রয়েছে; বার্ষিক ২০ লক্ষ রুপি পর্যন্ত টার্নওভারের বিক্রেতারা অডিট মুক্ত। ভারতের আয়কর আইনের ৪৪এডি ধারার ‘প্রিজাম্পটিভ ট্যাক্সেশন স্কিম’-এ বিস্তারিত হিসাব বা পরিদর্শনের প্রয়োজন হয় না; বাৎসরিক মোট বিক্রয়ের একটি নির্ধারিত অংশ (ডিজিটাল লেনদেনে ৬%) নিট আয় ধরে কর পরিশোধের সুবিধা রয়েছে।
ভিয়েতনামে সামাজিক মাধ্যম বিক্রেতাদের অডিট ভিজিট নিষিদ্ধ করে ডেডিকেটেড ‘ই-কমার্স ট্যাক্স পোর্টাল’ দিয়ে সব প্রক্রিয়া ডিজিটালি সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে ভারতে ই-কমার্স অপারেটরদের ১% টিসিএস থাকলেও নির্দিষ্ট সীমার নিচের বিক্রেতারা মুক্ত। কিন্তু এনবিআরের নির্দেশনায় ড্রপশিপিং, মার্চেন্ট পেমেন্ট বা এমএসএমই ই-কমার্সের আলাদা প্রোটোকল না থাকায় মাঠপর্যায়ে স্বেচ্ছাচারিতার পথ সুগম হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল কমার্স ও ক্ষুদ্র ব্যবসা সুরক্ষায় বিশেষ নীতি অনুসরণ করা হয়
এই প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল কমার্স খাতের সম্প্রসারণ ও উদ্যোক্তাদের সুরক্ষায় পলিসি ওয়াচডগগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফোরামের (ডিসিআরএএফ) মতো বিশেষায়িত প্ল্যাটফর্মগুলো ক্ষুদ্র ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের বাস্তব সমস্যা, কর জটিলতা ও আইনি বৈষম্য তথ্য-উপাত্ত সহ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরছে। এ ধরনের ফোরাম এনবিআর ও বাণিজ্য সংগঠনগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে উদ্যোক্তাবান্ধব ডিজিটাল কর গাইডলাইন তৈরির পথ সুগম করতে পারে।
ডিজিটাল কমার্স খাতকে প্রশাসনিক চাপ থেকে মুক্ত রাখতে এনবিআর ও সরকারের স্পষ্ট কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রথমত, বাৎসরিক ৫০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা টার্নওভারের ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোগগুলোকে ১৪৭ ধারার সরেজমিন অডিট ও টিডিএস তদারকি থেকে মুক্ত রেখে ‘সেফ হারবার’ ঘোষণা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাসাবাড়ি থেকে পরিচালিত এফ-কমার্স ও নারী উদ্যোক্তাদের প্রাঙ্গণে সারপ্রাইজ ভিজিট বন্ধ করে কেবল ডিজিটালি তথ্য আদান-প্রদানের বিধান রাখতে হবে।
সরকারের ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ও এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রার মূল চালিকাশক্তি এই তরুণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সাররা
তৃতীয়ত, এনবিআরকে আইসিএবি, ডিজিটাল কমার্স অ্যান্ড রিসার্চ অ্যাডভোকেসি ফোরাম (ডিসিআরএএফ) ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে ডেটা প্রাইভেসি বজায় রেখে ‘ডিজিটাল অডিট প্রোটোকল’ তৈরি করতে হবে।
চতুর্থত, জটিল উৎসে করের বদলে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বার্ষিক মোট বিক্রয়ের ওপর সহজ ও সর্বনিম্ন ফিক্সড বা ‘কম্পোজিশন ট্যাক্স স্কিম’ চালু করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধে অনলাইনভিত্তিক ‘ডিজিটাল ট্যাক্স ডিসপিউট সেল’ গঠন করতে হবে।
ষষ্ঠত, এনবিআর সরাসরি প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে রাজস্ব ফাঁকির সন্দেহ হলে নিবন্ধিত ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন বা অ্যাডভোকেসি ফোরামের প্রতিনিধিত্বে যৌথ কমিটির মাধ্যমে ব্যাখ্যা চাইবে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদেরও ব্যক্তিগত ও ব্যবসার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আলাদা রাখা এবং ইনভয়েস ডিজিটালি সংরক্ষণের চর্চা বাড়াতে হবে।
সরকারের ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ও এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রার মূল চালিকাশক্তি এই তরুণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সাররা। ছোট উদ্যোগগুলোকে শুরুতেই অডিট ভীতির জালে পিষ্ট করলে উদ্যোক্তা তৈরির গতি স্তব্ধ হবে। সরকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সারদের যে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, তা বাস্তবে রূপ দিতে এনবিআরের নীতিতেও ব্যবসাবান্ধব রূপরেখা থাকতে হবে। এনবিআরের উচিত শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠনগুলোর আপত্তির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ১৪৭ ধারার প্রয়োগ স্থগিত করা এবং বড় শিল্প ও ক্ষুদ্র ই-কমার্স/এসএমই উদ্যোক্তাদের পার্থক্য রেখা টেনে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করা। তাতেই রাজস্ব আদায় যেমন নিরাপদ হবে, তেমনি অক্ষত থাকবে দেশের উদীয়মান ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।
লেখক: মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা)- ই-কমার্স বিশ্লেষক এবং ই-ক্যাব এর ফাউন্ডিং মেম্বার





