এক ক্লিকেই ঋণ, চালু হচ্ছে ডিজিটাল ‘ই-লোন’ সেবা
ক.বি.ডেস্ক: দেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার পরিধি আরও বাড়াতে এবং ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ বা নগদবিহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে গ্রাহকেরা ব্যাংকে না গিয়েই মোবাইল অ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং কিংবা ই-ওয়ালেটের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘ই-লোন’ বা ডিজিটাল ঋণ নিতে পারবেন। ব্যাংকগুলো সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করতে পারবে। এই উদ্যোগ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার এবং তরুণদের জন্য দ্রুত ঋণপ্রাপ্তির নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
গতকাল সোমবার (১১ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে।
সার্কুলারে জানানো হয়েছে- গ্রাহক নির্বাচন, ঋণ অনুমোদন, বিতরণ এবং কিস্তি আদায়ের পুরো প্রক্রিয়াই হবে ডিজিটাল। ফলে ঋণ নিতে গ্রাহকের সশরীরে ব্যাংকে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন হবে না। ঋণ আবেদন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে কাগজে স্বাক্ষরের পরিবর্তে বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর এবং ডিজিটাল কেওয়াইসি তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন দেয়া হবে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ই-লোন নিতে পারবেন। এই ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর। ব্যাংকগুলো বাজারভিত্তিক সুদের হারে ঋণ বিতরণ করতে পারবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় ঋণ দেয়া হলে সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্বল্প অঙ্কের এই ঋণ জরুরি আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে সাধারণ মানুষের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অনলাইন উদ্যোক্তা এবং স্বল্প আয়ের মানুষ দ্রুত আর্থিক সহায়তা পাবেন। এতে যেমন গ্রাহকের সময় ও খরচ কমবে, তেমনি ব্যাংকিং সেবাও আরও সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে।
ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থায় গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড), টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন এবং মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য, ঋণের রেকর্ড এবং লেনদেন সংক্রান্ত সব তথ্য দেশের অভ্যন্তরে থাকা ডেটা ওয়্যারহাউজে সংরক্ষণ করতে হবে। বিদেশে কোনও সার্ভারে তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে কি না, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি থাকবে বলে জানা গেছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল ঋণ সেবা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণা ও তথ্য চুরির ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বাণিজ্যিকভাবে ‘ই-লোন’ চালুর আগে প্রতিটি ব্যাংককে অন্তত ছয় মাস পরীক্ষামূলক বা ‘পাইলটিং’ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। পাইলট প্রকল্পে গ্রাহকসেবা, ঋণ বিতরণ, আদায় এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা মূল্যায়ন করে তার বিস্তারিত প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে হবে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন দেয়া হবে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তিগত ত্রুটি, প্রতারণার ঝুঁকি এবং গ্রাহক হয়রানি কমানো সম্ভব হবে।
সার্কুলারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনও খেলাপি ঋণগ্রহীতা এই সুবিধা পাবেন না। বর্তমানে রিয়েল-টাইম সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) সুবিধা পুরোপুরি চালু না হওয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা শিথিলতা রাখা হয়েছে। তবে ঋণ বিতরণের পর অবশ্যই গ্রাহকের সিআইবি রিপোর্ট সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে। যদি কোনও গ্রাহক তথ্য গোপন করে ঋণ গ্রহণ করেন এবং পরে সিআইবি রিপোর্টে তা শনাক্ত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দ্রুত সেই ঋণ সমন্বয় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে সিআইবি রিপোর্টের জন্য অতিরিক্ত কোনও ফি নেয়া যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে দ্রুত ও সহজ ঋণসেবার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকেও আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে। ব্যাংকগুলোকে ই-লোন কার্যক্রমের তথ্য মাসিক ও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এর মাধ্যমে পুরো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণের ফলে ই-লোন দেশের ক্ষুদ্র অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সহজে মূলধন পাবেন, অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা বাড়বে এবং নগদ টাকার ব্যবহারও কমবে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, ঋণ বিতরণে যথাযথ যাচাই না হলে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।





