বাজেট ২০২৬-২৭: আইসিটি ও টেলিকম খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার
ক.বি.ডেস্ক: বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য সুখবর নিয়েই আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাত, ফ্রিল্যান্সার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, স্টার্টআপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের জন্য একাধিক কর-সুবিধা ও প্রণোদনার প্রস্তাব থাকছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকাল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপি জাতীয় বাজেট দিতে যাচ্ছে দীর্ঘ ১৯ বছর পর। বিএনপি সরকারের লক্ষ্য দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা সহজীকরণ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা।
কমছে প্রযুক্তিপণ্যের কর
কমপিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারকারীদের জন্যও স্বস্তির খবর রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে কমপিউটার, প্রিন্টার, মনিটর, ফ্ল্যাশ মেমোরি এবং বহনযোগ্য কম্পিউটিং ডিভাইস আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর কমিয়ে ২ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকতে পারে। এতে প্রযুক্তিপণ্যের আমদানি ব্যয় কমবে এবং বাজারে এসব পণ্যের মূল্য তুলনামূলকভাবে সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশীয় প্রযুক্তি উৎপাদনে বাড়তি প্রণোদনা
দেশে কমপিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস ও মোবাইল ফোন উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে কাঁচামাল আমদানিতে কর ও শুল্ক ছাড়ের মেয়াদ ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবহৃত ২২ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর ৫ ও ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকতে পারে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে মেমোরি ও ইলেকট্রনিক উপাদানের দাম বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির মধ্যে এই নীতি স্থানীয় উৎপাদনকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে সহায়তা করবে।
টেলিকম খাতে মিলতে পারে কর-সুবিধা
মোবাইল অপারেটরদের জন্যও কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ আসতে পারে। মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবার ওপর উৎসে কর ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া নতুন সিম সংযোগে বিদ্যমান ৩০০ টাকার নির্দিষ্ট ভ্যাট তুলে দিয়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে নতুন সিম কেনার খরচ কমতে পারে। বিটিআরসির রেভিনিউ শেয়ার, লাইসেন্স ফি ও বিভিন্ন চার্জের ওপর বিদ্যমান ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহারের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
প্রযুক্তি শিল্পে বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা
মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম, সিসিটিভি ও ই-বাইক উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে ই-বাইক শিল্পে শুধু সংযোজনকারী নয়, স্থানীয় যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানগুলোকেও রেয়াতি সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব প্রযুক্তি উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারে।
ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বড় স্বস্তি
এবারের বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ হতে পারে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর কর অব্যাহতি। বর্তমানে শুধুমাত্র তথ্যপ্রযুক্তি খাতভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং আয়ে কর সুবিধা রয়েছে। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন কনসালটেন্সি, ভিডিও এডিটিং, ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্স সহ বিভিন্ন খাতের ফ্রিল্যান্সাররাও করমুক্ত সুবিধার আওতায় আসবেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে বিদেশ থেকে অর্জিত আয় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনার প্রবণতা বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য করমুক্ত আয়ের সুযোগ
ডিজিটাল যুগে ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট তৈরি করে বিপুল সংখ্যক তরুণ আয় করছেন। তাদের উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ দিতে সব ধরনের কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব থাকছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশের ক্রিয়েটর ইকোনমিকে নতুন গতি দেবে এবং তরুণদের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা হওয়ার পথ আরও সহজ করবে।
স্টার্টআপের জন্য শূন্য শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্স
প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহ দিতে স্টার্টআপ এবং ইনোভেশনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের জন্য টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই উদ্যোক্তারা দাবি জানিয়ে আসছিলেন, প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যবসার ওপর করের চাপ কমানো হলে নতুন উদ্যোগ দ্রুত বিকশিত হবে। বাজেটে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
তবে কিছু প্রত্যাশা এখনও অপূর্ণ
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাজেটে প্রযুক্তি শিল্পের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলেও সফটওয়্যার রপ্তানি, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ৫জি অবকাঠামো এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সম্প্রসারণের মতো খাতে আরও বড় প্রণোদনা প্রত্যাশিত ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতির পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করতে হলে উদীয়মান প্রযুক্তি খাতগুলোতে আরও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট দেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। ফ্রিল্যান্সার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, স্টার্টআপ উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি উৎপাদক এবং টেলিকম খাত সবার জন্যই কিছু না কিছু প্রণোদনা থাকছে। যদি প্রস্তাবিত সুবিধাগুলো বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।





