অন্যান্য মতামত

ডট বিডি ডোমেইন: দ্রুত সেবা চাই, পরিচয় যাচাইও চাই

স্বাধীন খান মোহাম্মদ নাকিব: একটি ডট বিডি (.bd ) ডোমেইন নিতে গিয়ে কোনও উদ্যোক্তাকে যদি একই কাগজ বারবার জমা দিতে হয়, আবেদন কেন আটকে আছে তা বোঝা না যায় কিংবা সহায়তা পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়, সেটি আধুনিক সেবা নয়। তাই নিবন্ধন সহজ ও দ্রুত করার দাবি সম্পূর্ণ যৌক্তিক। কাগজপত্রের জট কমিয়ে কীভাবে বাংলাদেশের জাতীয় ডোমেইন ডট বিডিকে সহজ, নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক করা যায়। তবে সমাধান পরিচয় যাচাই তুলে দেয়া নয়। সঠিক পথ হলো কাগজের জট কমিয়ে যাচাইকে অনলাইনে আনা।

ডট বিডি (.bd ) শুধু একটি ওয়েব ঠিকানা নয়
ইন্টারনেটে .bd বাংলাদেশের দেশভিত্তিক শীর্ষ ডোমেইন। আন্তর্জাতিক ডোমেইন কর্তৃপক্ষ আইএএনএ-এর নথিতে এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীনে এবং কারিগরি ও নিবন্ধন কাজে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ভূমিকা উল্লেখ আছে। ফলে এটি শুধু কেনাবেচার একটি পণ্য নয়, দেশের নামে পরিচালিত একটি জনস্বার্থভিত্তিক ডিজিটাল অবকাঠামো।

কোনও ওয়েব ঠিকানার শেষে .bd দেখলে অনেক ব্যবহারকারী সেটিকে বাংলাদেশের কোনও ব্যক্তি, ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত মনে করেন। এই স্থানীয় পরিচয় বিশ্বাস তৈরি করে। আবার একই বিশ্বাস ব্যবহার করে কেউ ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা, সরকারি সহায়তা বা পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নকল ওয়েবসাইটও বানাতে পারে। তাই ডোমেইনের পেছনে কে আছেন, প্রয়োজন হলে তাকে শনাক্ত করা যাবে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

দ্রুত সেবা ও পরিচয় যাচাই একসঙ্গে সম্ভব
বিটিসিএল ইতোমধ্যে অনলাইনে আবেদন, অর্থ পরিশোধ ও ডোমেইন পরিচালনার সুবিধা চালু করেছে। অনুমোদিত পুনর্বিক্রেতাও যুক্ত হয়েছে এবং ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে সরাসরি দ্বিতীয় স্তরের .bd নিবন্ধন সাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। এগুলো ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতায় এখনও স্পষ্ট তালিকা, আবেদনের তাৎক্ষণিক অবস্থা, প্রত্যাখ্যানের নির্দিষ্ট কারণ, নির্ধারিত সময়সীমা এবং দ্রুত সহায়তা দরকার।

আলোচনার প্রশ্ন তাই হওয়া উচিত নয়, ‘যাচাই থাকবে কি থাকবে না?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘বৈধ আবেদনকারীকে কীভাবে কয়েক মিনিটে যাচাই করে ডোমেইন দেয়া যায়?’ কম ঝুঁকির আবেদন যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা যায়, তবে সবাইকে একই দীর্ঘ হাতে করা পরীক্ষার মধ্যে রাখার প্রয়োজন নেই।

অন্য দেশের অভিজ্ঞতা
সিঙ্গাপুরের .sg ব্যবস্থায় অনুমোদিত নিবন্ধকের মাধ্যমে আবেদন নেয়া হয় এবং সিংপাস বা কর্পপাস ব্যবহার করে পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য অনলাইনে নিশ্চিত করা যায়। যাচাই দ্রুত হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সম্পন্ন না করলে ডোমেইন স্থগিত হতে পারে। অর্থাৎ দ্রুততা এসেছে যাচাই বাদ দিয়ে নয়, যাচাইকে ডিজিটাল করে।

নেপালের .np নিবন্ধন বিনা মূল্যে হলেও আবেদনকারীর পরিচয়, নামের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রয়োজনীয় কাগজ চাওয়া হয়। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় .ai অনুমোদিত নিবন্ধক ব্যবহার করলেও অপব্যবহারবিরোধী নিয়ম বজায় রাখে। শিক্ষা একটাই সহজ, সাশ্রয়ী বা আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত নিবন্ধন মানেই পরিচয়হীন নিবন্ধন নয়।

যাচাই না থাকলে ঝুঁকি কোথায়
ধরা যাক, একজন প্রতারক অল্প সময়ে বহু .bd ডোমেইন নিলেন। নামগুলো দেখতে ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা, সরকারি ভাতা, চাকরি বা অনলাইন কেনাকাটার ওয়েবসাইটের মতো। একটি ডোমেইন বন্ধ হলে তিনি আরেকটি চালু করলেন। নিবন্ধকের কাছে নির্ভরযোগ্য পরিচয়, যোগাযোগের তথ্য ও লেনদেনের রেকর্ড না থাকলে একই ব্যক্তির নতুন আবেদন ঠেকানো কঠিন হবে।

পরিচয় যাচাই অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করে না। তবে এটি প্রতারণার খরচ বাড়ায়, একসঙ্গে বিপুল ডোমেইন নেয়া কঠিন করে এবং তদন্তে সহায়তা করে। একই সঙ্গে তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার- শুরু থেকেই প্রতারণার জন্য নেয়া ডোমেইন, পরে আক্রান্ত হওয়া বৈধ ওয়েবসাইট এবং নাম বা ট্রেডমার্ক নিয়ে বিরোধ। তিনটির প্রতিকার এক হওয়া উচিত নয়।

যে সংস্কারগুলো এখন জরুরি
অনলাইন পরিচয় যাচাই: জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন তথ্য অনুমোদিত উৎস থেকে একবার যাচাই করা যেতে পারে। সংবেদনশীল নথি প্রকাশ্য রাখা যাবে না, সেগুলো এনক্রিপ্ট করে সীমিত অনুমতিতে সংরক্ষণ করতে হবে।

ঝুঁকিভিত্তিক অনুমোদন: সাধারণ ও কম ঝুঁকির আবেদন দ্রুত সক্রিয় হবে। ব্যাংক, সরকারি সেবা, পরিচিত ব্র্যান্ডের কাছাকাছি নাম, অস্বাভাবিক সংখ্যক আবেদন বা সন্দেহজনক তথ্য হলে প্রশিক্ষিত কর্মী পরীক্ষা করবেন। এতে বৈধ ব্যবহারকারী দ্রুত সেবা পাবেন, আবার ঝুঁকিপূর্ণ আবেদনও চোখ এড়াবে না।

স্পষ্ট সময়সীমা ও অ্যাপিল: আবেদন গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিতকরণ, প্রতিটি ধাপের অবস্থা, অনুমোদনের নির্ধারিত সময় এবং প্রত্যাখ্যানের নির্দিষ্ট কারণ জানাতে হবে। ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সহজ অ্যাপিলের সুযোগও প্রয়োজন।

দায়িত্বশীল পুনর্বিক্রেতা ব্যবস্থা: অনুমোদিত পুনর্বিক্রেতাদের জন্য সফটওয়্যার সংযোগ ব্যবস্থা বা এপিআই, মানসম্মত যাচাই, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং অপব্যবহারের হারের ভিত্তিতে জবাবদিহি থাকতে হবে। এতে সেবা ছড়িয়ে পড়বে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারাবে না।

দ্রুত অপব্যবহার প্রতিকার: ফিশিং বা ক্ষতিকর কার্যক্রমের অভিযোগ নেয়ার জন্য আলাদা দল ও সহজ অনলাইন ব্যবস্থা দরকার। শক্ত প্রমাণ থাকলে সাময়িকভাবে ডোমেইন আটকে দেয়া যেতে পারে, তবে নিবন্ধককে জবাব দেয়ার সুযোগ এবং ভুল অভিযোগে দ্রুত পুনর্বহালের পথ রাখতে হবে।

নিরাপদ অবকাঠামো ও স্বচ্ছতা: ডোমেইন নাম ব্যবস্থার নিরাপত্তা প্রযুক্তি ডিএনএসএসইসি, ভৌগোলিকভাবে ছড়িয়ে থাকা নামসার্ভার, আক্রমণ প্রতিরোধ, দুর্যোগ পুনরুদ্ধার এবং নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা দরকার। পাশাপাশি অনুমোদনের গড় সময়, প্রত্যাখ্যান, অভিযোগ ও স্থগিতের পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশ করলে সেবার মান যাচাই করা সহজ হবে।

পেছনে শক্ত নিরাপত্তা, সামনে সহজ সেবা
বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে একজন বৈধ আবেদনকারী কয়েক মিনিটে পরিচয় যাচাই শেষ করতে পারবেন, কম ঝুঁকির আবেদন দ্রুত সক্রিয় হবে এবং সন্দেহজনক আবেদন আলাদা পরীক্ষায় যাবে। ব্যবহারকারীকে অপ্রয়োজনীয় কাগজ নিয়ে ঘুরতে হবে না, আবার অপব্যবহার হলে কর্তৃপক্ষ জানবে ডোমেইনের পেছনে কে আছেন।

নিরাপত্তা ও সহজ ব্যবহার পরস্পরের শত্রু নয়। দুর্বল সেবা ঠিক করতে পরিচয় যাচাই তুলে দেয়া যেমন ভুল, তেমনি নিরাপত্তার নামে বৈধ উদ্যোক্তাকে অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষায় রাখাও ভুল। .bd নিবন্ধন বাড়ুক, কিন্তু তার বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে নয়। কাগজের জট কমুক, বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিচয়ের জবাবদিহি নয়।

লেখক: স্বাধীন খান মোহাম্মদ নাকিব- প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ডিয়ানা হোস্ট লিমিটেড

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *