প্রতিবেদন

ডব্লিউটিআইএসডি: ডিজিটাল সংযোগে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব, এগোচ্ছে বাংলাদেশ

ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ: প্রতি বছর ১৭ মে পালিত হয় ‘বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস (ডব্লিউটিআইএসডি)’। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্তার, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই দিবসটি উদযাপন করা হয়। দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালন করে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ), যা জাতিসংঘের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষায়িত সংস্থা।

দিবসটির ইতিহাস
১৮৬৫ সালের ১৭ মে প্যারিসে আন্তর্জাতিক টেলিগ্রাফ কনভেনশন স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ)। সেই স্মরণে প্রতিবছর ১৭ মে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ দিবস পালন করা হয়। পরে ২০০৬ সালে তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বিবেচনায় “তথ্য সংঘ” শব্দটি যুক্ত করে দিবসটির বর্তমান নামকরণ করা হয় ‘বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস (ডব্লিউটিআইএসডি)’।

আইটিইউতে বাংলাদেশের সদস্যপদ
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সদস্যপদ অর্জনের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে শুরু করে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ)-এর সদস্যপদও বাংলাদেশ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই লাভ করে। বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর আইটিইউ-এর সদস্যপদ লাভ করে। স্বাধীনতার মাত্র দুই বছরের মধ্যেই এই সদস্যপদ অর্জনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তি ঘটে।

বাংলাদেশের জন্য আইটিইউ সদস্যপদের গুরুত্ব
বাংলাদেশের জন্য আইটিইউ সদস্যপদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে- আইটিইউ সদস্য হওয়ার ফলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক টেলিযোগাযোগ নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশ নেয়ার সুযোগ পায়। এর মাধ্যমে দেশের স্বার্থ রক্ষায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মতামত তুলে ধরা সম্ভব হয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক, টেলিভিশন সম্প্রচার, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবার জন্য প্রয়োজনীয় রেডিও স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনায় আইটিইউ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সদস্যপদ থাকার কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এসব সুবিধা ব্যবহারের অধিকার পায়।

আইটিইউ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, গবেষণা সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের মানবসম্পদ উন্নয়নে এসব উদ্যোগ ভূমিকা রেখেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট বাংলাদেশ এবং বর্তমানে ডিজিটাল রুপান্তর বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত মান ও নীতিগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। আইটিইউ-এর সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে বাংলাদেশ ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারছে।

দিবসটির উদ্দেশ্য
বর্তমানে আইটিইউ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে টেলিযোগাযোগ নীতিমালা, প্রযুক্তিগত মান নির্ধারণ এবং ডিজিটাল সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো- প্রযুক্তি ব্যবহারে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি; ডিজিটাল বৈষম্য কমানো, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিসেবা পৌঁছে দেয়া; সাশ্রয়ী ও নিরাপদ ডিজিটাল যোগাযোগ নিশ্চিত করা এবং উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। বিশ্বব্যাপী এখন ডিজিটাল সংযোগ শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, ব্যাংকিং সহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি অপরিহার্য হয়ে ওঠেছে।

এ বছর ডব্লিউটিআইএসডি ২০২৬ এর প্রতিপাদ্য হলো ‘ডিজিটাল লাইফলাইন: একটি সংযুক্ত বিশ্বে স্থিতিস্থাপকতা শক্তিশালী করা’। আইটিইউ ২০২৬ সালের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, টেকসই ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক সংযোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করছে।

বিশ্বের বহু দেশে দিবসটি উপলক্ষে সেমিনার, প্রযুক্তি প্রদর্শনী, কর্মশালা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজন করছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশও ‘ডব্লিউটিআইএসডি ২০২৬’ উপলক্ষে দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। পাশাপাশি দুই দিনব্যাপী (১৭-১৮ মে) একটি প্রযুক্তি মেলার আয়োজন করছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ (পিটিডি) ঢাকার আগারগাঁওস্থ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ভবনে দিনব্যাপী আয়োজন এবং টেলিযোগাযোগ মেলার আয়োজন করছে।

বাংলাদেশের অগ্রগতি
বাংলাদেশে গত এক দশকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে দ্রুতগতিতে। সরকার “স্মার্ট বাংলাদেশ” বা “ডিজিটাল রুপান্তর” গঠনের লক্ষ্য নিয়ে ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণে কাজ করছে। দেশে বর্তমানে- ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল সেবা পৌঁছে গেছে; মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস সাধারণ মানুষের জীবন সহজ করেছে; অনলাইন শিক্ষা ও ই-গভর্ন্যান্স সেবা বিস্তৃত হয়েছে; তরুণদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে এখনও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গ্রামীণ অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট, সাইবার নিরাপত্তা, প্রযুক্তি শিক্ষার বিস্তার এবং ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নকে আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফাইভজি প্রযুক্তি, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ইন্টারনেট অব থিংস নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে।

ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বড় অংশ প্রযুক্তিনির্ভর হবে। তাই তরুণদের ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন সময়ের দাবি। বাংলাদেশও ইতোমধ্যে স্মার্ট সেবা, ডেটা সেন্টার, স্টার্টআপ এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক সেবাকে আরও সহজ করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ গঠনের একটি বৈশ্বিক আহ্বান। ডিজিটাল বৈষম্য দূর করে প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে সরকার, বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে একটি স্মার্ট, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন সম্ভব।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *