প্রতিবেদন

ঈদে ই-কমার্স বাজার, রেকর্ড বিক্রি এবং আস্থার মিশ্র লড়াই

সোহেল মৃধা: বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত শুধু একটি বিকল্প কেনাকাটার মাধ্যম নয়, বরং উৎসবকালীন অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত পবিত্র ঈদ-উল-ঈদুল ফিতর ও ঈদ-উল-আজহার কেনাকাটায় শপিংমলের চিরচেনা ভিড় ওপচে পড়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব), সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি (সিডিসিআরএ) এবং খাত সংশ্লিষ্টদের দেয়া প্রাথমিক তথ্যমতে, এবারের ঈদে ডিজিটাল কমার্স খাতে এক অভূতপূর্ব ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।

তবে এই বিশাল অর্ডারের মহাসড়কে যেমন ছিল ডেলিভারি ও লজিস্টিকস কোম্পানির অভাবনীয় সক্ষমতার পরীক্ষা, তেমনি ছিল রিটার্ন রেট, ফেক অর্ডার এবং ‘ভুঁইফোড়’ বা ফেক উদ্যোক্তাদের তৈরি করা কিছু নেতিবাচক চ্যালেঞ্জ। সামগ্রিকভাবে কেমন যাচ্ছে এবারের ঈদের ই-কমার্স বাজার তার একটি বস্তুনিষ্ঠ, পরিসংখ্যানগত ও নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষণ তুলে করা হলো।

বাজারের আকার ও অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান
চলতি ২০২৬ সালে বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজারের আকার এবং বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি প্রবৃদ্ধি হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশীয় মার্কেট সাইজ বর্তমানে আনুমানিক ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে (প্রায় ৬০,০০০ থেকে ৬৫,০০০ কোটি টাকা) উন্নীত হয়েছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক জার্নাল, গবেষণা সংস্থা ও সিডিসিআরএ-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের সামগ্রিক খুচরা অর্থনীতির প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ এখন ডিজিটাল কমার্সের নিয়ন্ত্রণে, যার সিংহভাগ লেনদেন হয় দুই ঈদ বা উৎসবকেন্দ্রিক বাজারে।

পবিত্র মাহে রমজান ও দুই ঈদ মৌসুম মিলিয়ে দেশের মূলধারার ই-কমার্স সাইট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক এফ-কমার্স পেজগুলোতে মোট অর্ডারের সংখ্যা আনুমানিক ২ কোটি থেকে ২.৫ কোটি ছাড়িয়েছে। আনুমানিক ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ একক ক্রেতা এবার অনলাইনে ন্যূনতম একটি হলেও পণ্য বা সেবা অর্ডার করেছেন।

ঈদের আগের শেষ দুই সপ্তাহে দৈনিক ডেলিভারির সংখ্যা গড়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ পিস ছাড়িয়ে যায়, যা সাধারণ সময়ের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি। এবারের ঈদ বাজারে অনলাইন কেনাকাটার মাধ্যমে আনুমানিক ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে তারল্য প্রবাহ বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।

চাহিদার শীর্ষে থাকা পণ্যসমূহ: ফ্যাশন থেকে স্মার্ট লাইভস্টক ও কুইক-কমার্স
এবারের ঈদে ট্র্যাডিশনাল ফ্যাশনের পাশাপাশি লাইফস্টাইল, ইলেকট্রনিক্স এবং কোরবানির পশুর ডিজিটাল বাজার ই-কমার্সের পরিধিকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মোট অর্ডারের প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ ছিল তৈরি পোশাক। জুতো এবং কসমেটিকস সামগ্রীও এই তালিকায় অন্যতম প্রধান ছিল। স্মার্টফোন, ওয়্যারলেস ইয়ারবাডস, স্মার্ট ওয়াচ এবং ঈদের রান্নাবান্নার সুবিধার্থে ব্লেন্ডার, ওভেন বা ফুড প্রসেসরের মতো হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বিক্রি গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘর সাজানোর চাদর, পর্দা এবং ঈদের রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় প্রিমিয়াম মসলা ও ঘি-এর মতো গ্রোসারি আইটেম প্রচুর অর্ডার হয়েছে।

এবারের ঈদ-উল-আজহায় দেশের ই-কমার্স বাজারে সবচেয়ে বড় চমক ছিল স্মার্ট লাইভস্টক কমার্স বা অনলাইন পশুর হাট। ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামারিদের সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমেছে। ওয়ান-স্টপ কোরবানি সার্ভিস যেমন অনলাইনে পশু পছন্দ করা, পেমেন্ট করা এবং সম্পূর্ণ স্যানিটারি উপায়ে স্লটারিং (জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ) শেষে ঈদের দিন মাংস ঘরে পৌঁছে দেয়ার লজিস্টিকস সক্ষমতা এবার দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তথ্যমতে, এবার অনলাইনে পশু বিক্রির পরিমাণ গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে পশুর হাটের এই বিশাল সাফল্যের পাশাপাশি একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও এবার দৃশ্যমান হয়েছে। ঈদের দিন প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামার থেকে মাংস কাস্টমারের ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত সম্পূর্ণ ফ্রেশ ও স্বাস্থ্যসম্মত অবস্থায় পৌঁছানোর জন্য আমাদের দেশে এখনো পর্যাপ্ত রেফ্রিজারেটেড বা ফ্রিজার ভ্যান নেই। লজিস্টিকস কোম্পানিগুলোর এই কোল্ড-চেইন অবকাঠামোতে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি।

ঈদের ঠিক ২ থেকে ৩ দিন আগে যখন বড় বড় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো নতুন অর্ডার নেয়া বন্ধ করে দেয়, তখন দৃশ্যপটে আসে কুইক-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো (যেমন: চালডাল, পান্ডামার্ট, বা বিভিন্ন ইনস্ট্যান্ট গ্রোসারি অ্যাপ)। ঈদের আগের রাতেও সেমাই, চিনি, কিশমিশ, প্যাকেটজাত মাংসের মসলা কিংবা মেকআপ ও কসমেটিকস সামগ্রী মাত্র ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটে ঘরে পৌঁছে দেয়ার লজিস্টিকস জাদু দেখিয়েছে এই খাত, যার ফলে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় উৎসবের আমেজ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

কাস্টমার ডেমোগ্রাফি: ঢাকা বনাম প্রান্তিক অঞ্চল
এবারের ঈদের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক পরিবর্তনটি এসেছে ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে। অনলাইন কেনাকাটা এখন আর শুধু ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের মতো মেগাসিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ই-কমার্স লজিস্টিকস ডেটা ও সিডিসিআরএ-এর মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা অনুযায়ী, এবারের মোট অর্ডারের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ এসেছে জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রান্তিক এলাকা থেকে। জেলা শহরগুলোতে কুরিয়ার সার্ভিসের হোম-ডেলিভারি নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্রেতারাও অনায়াসে কেনাকাটা করেছেন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ ও সিলেট অঞ্চলের প্রান্তিক কাস্টমারদের কেনাকাটার হার এবার বেশ ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

এবারের বাজারের মূল চালিকাশক্তি ছিল মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত তরুণ প্রজন্ম (বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছর)। বিশেষ করে কর্মজীবী নারী এবং তরুণ ফ্রিল্যান্সার বা চাকুরিজীবীরা জ্যামের ভোগান্তি এড়াতে অনলাইনকে বেছে নিয়েছেন। ক্যাশ অন ডেলিভারি এখনও জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকলেও, ঈদ বাজারে কাগজের নোটের মাধ্যমে জাল নোটের বিস্তার রোধে এবং নিরাপত্তার খাতিরে এবার ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) যেমন-বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে কিংবা কিউআর কোড স্ক্যান করে অগ্রিম বা তাৎক্ষণিক পেমেন্ট করার হার ৬০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা সরকারের ক্যাশলেস সোসাইটি বিনির্মাণের উদ্যোগকে বহুদূর এগিয়ে দিয়েছে।

কুরিয়ার ও লজিস্টিকস খাতের সক্ষমতা
অর্ডারের বিপুল চাপ সামলাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় লজিস্টিকস ও কুরিয়ার কোম্পানিগুলো (যেমন: স্টিডফাস্ট, রেডেক্স, পাঠাও কুরিয়ার, পেপারফ্লাই ইত্যাদি) এবার বেশ প্রযুক্তি-নির্ভর প্রস্তুতি নিয়েছে। ঈদের ঠিক ৭ থেকে ১০ দিন আগে যখন অর্ডারের গ্রাফ খাড়া হয়ে ওপরের দিকে উঠে, তখন কুরিয়ার কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত জনবল ও খণ্ডকালীন ‘ডেলিভারি রাইডার’ নিয়োগ করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। ঢাকার ভেতরে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এবং ঢাকার বাইরে ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে ডেলিভারি নিশ্চিত করার হার ছিল প্রায় ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশ।

কুরিয়ার কোম্পানিগুলো তাদের সোর্সিং হাব ও শর্টিং সেন্টারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করায় এবার ব্যাকলগ বা জটলা তুলনামূলক কম হয়েছে। তবে, ঈদের ঠিক ৫ থেকে ৬ দিন আগে ঢাকার বাইরে পার্সেল পাঠানোর জন্য কোম্পানিগুলোর বেঁধে দেয়া কঠোর ‘কাট-অফ ডেট’ বা বুকিং বন্ধের ডেডলাইনের কারণে অনেক প্রান্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা শেষ মুহূর্তের অর্ডারগুলো শিপমেন্ট করতে সমস্যায় পড়েন, যা লজিস্টিকস চেইনের সাময়িক ধীরগতিকে নির্দেশ করে।

এআইভিত্তিক রাউটিং সফটওয়্যার ব্যবহারের ফলে কুরিয়ার কোম্পানিগুলো এবার কম সময়ে বেশি ডেলিভারি দিতে পেরেছে। তবে, ঈদের ঠিক ২ থেকে ৩ দিন আগে লজিস্টিকস চেইনে কিছুটা ধীরগতি দেখা যায়, যার ফলে কিছু অর্ডার ঈদের পরে ডেলিভারি হচ্ছে।

অন্ধকার দিক: রিটার্ন রিফান্ড, ফেক অর্ডার ও ভুঁইফোড় উদ্যোক্তা
ঈদের বাজার যখন রমরমা, ঠিক তখনই কিছু চিরাচরিত সমস্যা এবং নতুন কিছু জালিয়াতির ঘটনা পুরো খাতের সুনামে কিছুটা দাগ ফেলেছে। ক্যাশ অন ডেলিভারির সুযোগ নিয়ে অনেক ক্রেতা একই পণ্য ৩ থেকে ৪টি পেজ থেকে অর্ডার করেন এবং যেটি আগে আসে সেটি রেখে বাকিগুলো রিজেক্ট করেন। এবারের ঈদে এফ-কমার্স ও সাধারণ ই-কমার্সে গড় রিটার্ন রেট ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ, যা ক্ষুদ্র নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে। এটি ই-কমার্স খাতের একটি নীরব ঘাতক হিসেবে রূপ নিয়েছে।

কিছু অসাধু চক্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে শত শত ‘ফেক অর্ডার’ প্লেস করেছে। পণ্যটি কুরিয়ারে যাওয়ার পর কাস্টমারকে না পাওয়ায় উদ্যোক্তাদের দ্বিমুখী কুরিয়ার চার্জ বহন করতে হয়েছে। প্রতি ঈদের মতো এবারও ফেসবুক ও টিকটকে একশ্রেণীর ‘ভুঁইফোড়’ বা ফেক পেজের আবির্ভাব ঘটে। তারা আকর্ষণীয় অফার বা নামী ব্র্যান্ডের ছবি চুরি করে নকল বা অতি নিম্নমানের কাপড় সরবরাহ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে অগ্রিম টাকা নিয়ে পেজ বন্ধ করে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর ফলে মূলধারার সৎ ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ট্রাস্ট ক্রাইসিস বা আস্থা সংকটে পড়েছেন।

সামষ্টিক অর্থনীতি ও পরিবেশগত প্রভাব
এবারের ঈদের বাজারে ই-কমার্সের অবদান কেবল কেনাবেচার অংকেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং দেশের সামষ্টিক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবেশ খাতে এর একটি ইতিবাচক সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। দেশব্যাপী তীব্র লোডশেডিং এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই সময়ে কোটি কোটি ক্রেতা সশরীরে শপিংমলে না গিয়ে ঘরে বসে অনলাইনে কেনাকাটা সম্পন্ন করেছেন।

এর ফলে উৎসবের মৌসুমে রাস্তাঘাটে ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহনের জ্বালানি (তেল ও গ্যাস) যেমন সাশ্রয় হয়েছে, তেমনি বড় বড় শপিংমলগুলোতে শত শত মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ও এসি ব্যবহারের জাতীয় চাপ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। লজিস্টিকস খাতের রুট অপ্টিমাইজেশনের মাধ্যমে এক একটি ডেলিভারি ভ্যান বা বাইক একসঙ্গে শত শত মানুষের পণ্য পৌঁছে দেয়ায় শহরের সার্বিক কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমেছে। ফলে এবারের উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটা দেশের জন্য একটি টেকসই ও ‘গ্রিন ইকোনমি’ বা সবুজ অর্থনীতি*র নতুন মডেল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক অভিভাবকহীনতা: ই-ক্যাবের স্থবিরতা বনাম ব্যক্তিগত উদ্যোগে ই-কমার্সের অগ্রগতি
এবারের ঈদের বাজারের সবচেয়ে বড় এবং রূঢ় বাস্তবতার দিকটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে। দেশের ই-কমার্স খাতের মূল চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে এক ধরণের চরম অভিভাবকহীনতা ও শূন্যতা অনুভব করেছেন। দেশের ই-কমার্স খাতের একমাত্র ও প্রধান অ্যাসোসিয়েশন হওয়া সত্ত্বেও ই-ক্যাব-এর ভেতর যথাসময়ে সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সঠিক ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেনি।

সঠিক ও কার্যকর দিকনির্দেশনা, সঠিক তৃপ্তির নেতৃত্ব না থাকা এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের পক্ষে জোরালোভাবে কথা বলার মতো বলিষ্ঠ অভিভাবকত্বের অভাবে ই-ক্যাব বর্তমানে এক ধরণের স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, নানা মুখী পলিসিগত সংকটের মধ্যেও এবারের ঈদে সাধারণ উদ্যোক্তাদের ভাগ্যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা মেলেনি।

ই-ক্যাব-এর এই বড় প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মধ্যেও এবারের ই-কমার্স বাজারের যে বিশাল প্রবৃদ্ধি, তা কোনও অ্যাসোসিয়েশনের কৃতিত্বে হয়নি; বরং এটি সম্পূর্ণভাবে সম্ভব হয়েছে মাঠপর্যায়ের তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত মেধা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং একক সাহসিকতার জোরে। কোনও ধরনের ভর্তুকি বা প্রাতিষ্ঠানিক ছায়া ছাড়াই, এই উদ্যোক্তারা সম্পূর্ণ নিজস্ব ঝুঁকিতে মূলধন খাটিয়েছেন, পণ্য সোর্সিং করেছেন এবং লজিস্টিকস সংকট মোকাবেলা করে কাস্টমারের দোরগোড়ায় পণ্য পৌঁছে দিয়েছেন। এই ব্যক্তিগত খাতের অভাবনীয় সাফল্যই প্রমাণ করে, ই-ক্যাব-এ যদি একটি সঠিক ও দূরদর্শী প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব থাকত, তবে এই ঈদ বাজারে প্রবৃদ্ধির হার আরও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হতো।

নীতিনির্ধারণী পলিসি ও টেকসই ভবিষ্যৎ ভাবনা: সিডিসিআরএ ও বিশেষজ্ঞদের যৌথ সুপারিশসমূহ
ডিজিটাল কমার্স খাতের এই বিশাল সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে এবং ঈদ উৎসবের বাজারে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হলে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কোনও বিকল্প নেই। এবারের ঈদের বাজারের অভিজ্ঞতা থেকে সিডিসিআরএ এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও বৈপ্লবিক পলিসিগত পরিবর্তনের তাগিদ দিয়েছেন-

ইউনিক আইডি জট বনাম একক অনলাইন ট্রেড লাইসেন্স: বর্তমানে ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের জন্য ডিবিআইডি বা ইউবিআইডি সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং নানা আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতায় পূর্ণ, যা তৃণমূলের উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। এর চেয়ে অনেক বেশি সহজ ও কার্যকর সমাধান হতে পারে ট্রেড লাইসেন্সকেই একক ও সার্বজনীন ইউনিক বিজনেস আইডি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। নতুন কোনও আইডি কার্ডের ঝামেলায় না গিয়ে ট্রেড লাইসেন্সকেই মূল ট্র্যাকিং নম্বর হিসেবে ব্যবহার করা যৌক্তিক।

শতভাগ অনলাইন ও প্রান্তিক লাইসেন্সিং: সমস্ত ট্রেড লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত শতভাগ অনলাইন, পেপারলেস ও ডিজিটাল করতে হবে। একজন প্রান্তিক নারী উদ্যোক্তা যেন কোনও দপ্তরে না গিয়ে ঘরে বসেই তার স্মার্টফোনের মাধ্যমে এই লাইসেন্স সম্পন্ন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

মেটা ও বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যৌথ পলিসি: যারা ফেসবুকে, ইনস্টাগ্রামে বা টিকটকে কমার্শিয়াল পেজ পরিচালনা করছেন বা বুস্টিং করছেন, তাদের জন্য এই অনলাইন ভেরিফাইড ট্রেড লাইসেন্স নম্বর প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে। মেটা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকারের এমন একটি পলিসি বা এপিআই ইন্টিগ্রেশন থাকা উচিত, যেখানে বৈধ অনলাইন ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া কেউ কমার্শিয়াল পেজ বা অ্যাড অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারবে না। এই একটি পদক্ষেপ এক রাতেই দেশের ৮০ শতাংশ ফেক পেজের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে দেবে।

রিটার্ন পলিসি ও কুরিয়ার চার্জের যৌক্তিকীকরণ: ক্যাশ অন ডেলিভারির খামখেয়ালিপনা রুখতে কুরিয়ার পলিসিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। কোনও কাস্টমার যদি পণ্য অর্ডার করার পর কোনও যৌক্তিক কারণ (যেমন: ছেঁড়া বা ভুল পণ্য) ছাড়া শুধু পছন্দ হয়নি বলে রিটার্ন করতে চান, তবে তাকে অগ্রিম কুরিয়ার চার্জ (ডেলিভারি ফি) পেজকে বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে হবে। এটি নীতিগতভাবে বাস্তবায়ন করা হলে অহেতুক অর্ডারের হার ৭০ শতাংশ কমে আসবে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি বাঁচানো সম্ভব হবে।

তদারকিতে সিডিসিআর ও এসক্রো ব্যবস্থা: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সেন্ট্রাল ডিজিটাল কমার্স সেলের অধীনে সেন্ট্রাল ডিজিটাল কমার্স রেজ্যুলেশন (সিডিসিআর) বা কেন্দ্রীয় অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও বেশি গতিশীল ও জনবল সমৃদ্ধ করতে হবে। ভোক্তা অধিকার ও এসক্রো সিস্টেমের যথাযথ ডিজিটাল অডিট নিশ্চিত করতে পারলে ক্রেতারা যেমন অগ্রিম টাকা দিয়ে প্রতারিত হবেন না, তেমনি সৎ মার্চেন্টরাও সঠিক সময়ে এবং দ্রুততম সময়ে কাস্টমারের কাছ থেকে তাদের পেমেন্ট রিফান্ড বা মূল পেমেন্ট হাতে পাবেন।

ক্রেতা-বিক্রেতার ডুয়াল রেটিং ডেটাবেজ: লজিস্টিকস ও কুরিয়ার কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে এবং সিডিসিআরএ-এর নীতিগত নির্দেশনায় একটি কেন্দ্রীয় ও সচল ডেটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে যেমন ক্ষতিকর ফেক কাস্টমার’ (যারা বারবার বিনা কারণে অর্ডার রিটার্ন করে ক্ষুদ্র মার্চেন্টদের ডেলিভারি খরচের লোকসানে ফেলে) তাদের চিহ্নিত করা যাবে, তেমনি প্রতারক মার্চেন্ট উভয়কেই ব্ল্যাকলিস্ট করা সহজ হবে। কুরিয়ার কোম্পানিগুলোর অ্যাপে এই রেটিং বা ডেটাবেজ যুক্ত থাকলে ডেলিভারি দেয়ার আগেই গ্রাহক বা মার্চেন্টের সততা যাচাই করা সম্ভব হবে।

সবকিছু মিলিয়ে ২০২৬ সালের ঈদের ই-কমার্স বাজারকে ‘রেকর্ড বিক্রি এবং আস্থার মিশ্র লড়াই’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। ব্যবসার পরিধি, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর গভীর প্রবেশ চমৎকার, যা দেশের সামষ্টিক খুচরা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে। তবে ফেক পেজ এবং ফেক অর্ডারের দুষ্টচক্র দমনে এখনও আরও কঠোর, আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির প্রয়োজন। ডিজিটাল কমার্স খাতের এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধরে রাখতে হলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের দায়বদ্ধতা এবং লজিস্টিকস খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত করা সময়ের দাবি। দেশীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষায় এখন প্রয়োজন কেবল সঠিক পলিসির দ্রুততম বাস্তবায়ন।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *