প্রতিবেদন

কৃত্রিম হাহাকার রুখতে নজেল থেকে ড্রাম জ্বালানি নজরদারিতে ব্লকচেইন

সোহেল মৃধা: ভোর ৪টা ৪৫ মিনিট। রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেলের হেলমেট মাথায় দিয়ে ঝিমোচ্ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফ আহমেদ। দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে যখন নজেলের কাছাকাছি পৌঁছালেন, ঠিক তখনই পাম্পের এক কর্মচারী শুকনো মুখে ঘোষণা দিলেন- “তেল শেষ! ডিজেল নাই, অকটেনও নাই!” মুহূর্তেই লাইনে দাঁড়ানো ক্লান্ত মানুষগুলোর মধ্যে শুরু হলো হট্টগোল। ওদিকে গ্রামগঞ্জে বোরো চাষের সেচ পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে আছে তেলের অভাবে। এই দৃশ্যটি কোনও সিনেমার ট্র্যাজেডি নয়; এটি ২০২৬ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের এক নির্মম বাস্তবতা।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থায় যখন ১৭টি তেলের জাহাজের অর্ধেকই সাগরে আটকা পড়েছে, তখন দেশের ভেতরে শুরু হয়েছে এক ভয়ংকর খেলা। একদিকে সরকারি পরিসংখ্যান বলছে পর্যাপ্ত তেল আছে, অন্যদিকে পাম্পে হাহাকার। এই সংকটের মূলে কি শুধু তেলের বাস্তব অভাব? নাকি তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব? আমাদের প্রথাগত ব্যবস্থায় যে তথ্য রাখে, সে-ই তথ্য বদলে দেয়ার সুযোগ পায়। এই অন্ধকার দূর করতে পারে কেবল একটি প্রযুক্তি আর তা হলো ব্লকচেইন।

সংকটের গভীরে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে জ্বালানির যে চাহিদা এবং বর্তমান মজুতের যে চিত্র, তা বিশ্লেষণ করলে কিছু উদ্বেগজনক ডেটা সামনে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাক্কলন অনুযায়ী বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭৫ থেকে ৭৮ লক্ষ মেট্রিক টন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১,০০০ থেকে ২২,০০০ মেট্রিক টন তেলের প্রয়োজন হয়, যার সিংহভাগই ডিজেল।

অথচ বর্তমানে আমাদের ধারণক্ষমতা মাত্র ১৩ থেকে ১৫ লক্ষ মেট্রিক টন। অর্থাৎ, আমদানি পুরোপুরি বন্ধ থাকলে দেশ সর্বোচ্চ ৪৫ থেকে ৫০ দিন টিকে থাকতে পারবে। এই অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৮.৫ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার। আমদানিতে সামান্য বিচ্যুতি ঘটলেই সরবরাহ শৃঙ্খলে এমন এক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যার ফলে খুচরা বাজারে তেলের ওপর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এক ধরনের ‘অদৃশ্য প্রিমিয়াম’ বা কালোবাজারি জেঁকে বসে।

কেন প্রথাগত তদারকি ব্যবস্থা বারবার হোঁচট খাচ্ছে?
বর্তমান ব্যবস্থায় তেল শোধনাগার বা রিফাইনারি থেকে পাম্প পর্যন্ত পৌঁছাতে ৪ থেকে ৫টি ধাপ পার হতে হয় এবং প্রতি ধাপে হিসাব রাখা হয় মানুষের হাতে। যেখানে মানুষের হস্তক্ষেপ থাকে, সেখানেই তথ্যের বিকৃতি বা ‘ডেটা ম্যানিপুলেশন’ করার সুযোগ থাকে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি বছর পদ্ধতিগত চুরি ও সিস্টেম লসের কারণে প্রায় ৩ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ জ্বালানি অপচয় হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকা।

মজুতদাররা স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্টের তথ্য গোপন করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। যখন কেন্দ্রীয় সার্ভারে ডেটা এক জায়গায় থাকে, তখন ক্ষমতার প্রভাবে বা অনৈতিক লেনদেনের বিনিময়ে সেই তথ্য বদলে ফেলা খুব একটা কঠিন কিছু নয়। এখানেই ব্লকচেইন আলাদা এই প্রযুক্তিতে একবার তথ্য লেখা হলে তা চিরস্থায়ী এবং ঘুষ দিয়েও তা মোছা বা বদলানো অসম্ভব।

ব্লকচেইন ও স্মার্ট সেন্সর: নজেলের ফাঁকি ও গ্যালন সিন্ডিকেট রোধ
পাম্পের অন্যতম বড় সমস্যা হলো গাড়ি ছাড়া ড্রাম বা গ্যালনে তেল নিয়ে পাচার করা। একে কেবল কাগজে-কলমে ঠেকানো সম্ভব নয়। এর সমাধান হলো ব্লকচেইনকে যুক্ত করতে হবে স্মার্ট সেন্সর বা আইওটি ডিভাইসের সঙ্গে। ফিলিং স্টেশনের প্রতিটি নজেলে থাকবে সেন্সর, যা থেকে তেল বের হওয়া মাত্রই তার ডিজিটাল রেকর্ড ব্লকচেইনে জমা হবে। যখন কেউ ড্রামে তেল নিতে আসবেন, তাকে অবশ্যই তার ডিজিটাল আইডি, স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বা এনআইডি ভিত্তিক কিউআর কোড স্ক্যান করতে হবে।

স্মার্ট কন্ট্রাক্ট তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করবে যে এই ব্যক্তির ওই দিনের জন্য বরাদ্দকৃত কোটা আছে কি না। যদি তিনি সকালেই অন্য কোনও পাম্প থেকে তেল নিয়ে থাকেন, তবে সিস্টেম নিজে থেকেই নজেল লক করে দেবে একে বলা হয় ‘ডাবল স্পেন্ডিং প্রিভেনশন’। এর ফলে তেল শোধনাগার থেকে প্রতিটি ড্রপ বের হওয়ার সময় যে ডিজিটাল ‘টোকেন’ ইস্যু হবে, তার বাইরে বাজারে তেলের কোনও অবৈধ অস্তিত্ব থাকা সম্ভব হবে না।

কৃষি ও সেচ সংকট: প্রান্তিক কৃষকের ডিজিটাল সুরক্ষা
শহরের পাম্পের লাইনের চেয়েও বড় হাহাকার এখন গ্রামগঞ্জে বোরো মৌসুমে সেচ পাম্পের তেলের জন্য। ব্লকচেইন প্রযুক্তি সরাসরি একজন প্রান্তিক কৃষককে স্থানীয় সিন্ডিকেটের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। যখন তেলের প্রতিটি লিটার ব্লকচেইনে ট্র্যাক করা হবে, তখন কোনও ডিলার কৃষককে মিথ্যা বলতে পারবে না যে “তেল আসেনি”। কৃষক তার মোবাইলের একটি সহজ অ্যাপের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম দেখতে পাবেন ওই ডিলারের মজুত কতটুকু। যদি কোনও ডিলার কারসাজি করে মজুত লুকিয়ে রাখেন, তবে কৃষক সরাসরি অ্যাপের মাধ্যমে রিপোর্ট করতে পারবেন।

এই ‘স্মার্ট সিটিজেন অডিট’ ব্যবস্থায় যদি কোনও নাগরিকের রিপোর্ট ব্লকচেইনের তথ্যের ভিত্তিতে সত্য প্রমাণিত হয়, তবে ওই নাগরিককে পুরস্কৃত করার মাধ্যমে সরকার কয়েক লক্ষ ‘ডিজিটাল প্রহরী’ তৈরি করতে পারে। এতে গ্রাম ও শহরের তেলের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং কৃষি উৎপাদনে কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

পরিবর্তনের বৈপ্লবিক প্রভাব: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ডলার সাশ্রয়
ব্লকচেইন বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যা ঘটবে তা কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং একটি আমূল সংস্কার। বর্তমানে তেলের কৃত্রিম সংকটের অজুহাতে পরিবহন খরচ বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি চাল, ডাল ও নিত্যপণ্যের বাজারে পড়ে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তোলে। ব্লকচেইন নিশ্চিত করবে তেলের মূল্যের ওপর যেন কোনও অন্যায্য কালোবাজারি যুক্ত না হয়, যা মূল্যস্ফীতি বা ইনফ্লেশন নিয়ন্ত্রণে ২ থেকেে ৩ শতাংশ সরাসরি ভূমিকা রাখবে।

অর্থনৈতিকভাবে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী পদ্ধতিগত চুরি ও কালোবাজারি বন্ধ করে সিস্টেম লস কমাতে পারলে বছরে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব। শুধু তাই নয়, সরকার বছরে যে বিশাল অংকের জ্বালানি ভর্তুকি দেয়, ব্লকচেইন নিশ্চিত করবে এই অর্থ যেন সরাসরি প্রকৃত গ্রাহক পায়, কোনও মধ্যস্বত্বভোগী যেন তা গ্রাস করতে না পারে।

উত্তরণের পথরেখা ও প্রয়োগের চ্যালেঞ্জ
এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পাম্প মালিকদের সদিচ্ছা। এর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ‘টেক-সাবসিডি’ বা প্রযুক্তিবান্ধব প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি (সিডিসিআরএ)-এর মতো গবেষণা সংস্থাগুলোর কারিগরি ও নীতিগত সহায়তায় একটি শক্তিশালী আইনি বাধ্যবাধকতাও প্রয়োজন, যেখানে ‘ন্যাশনাল ফুয়েল লেজার’-এর বাইরে তেল বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। বিপিসি এবং সব ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে একটি সাধারণ ডিজিটাল লেজারের আওতায় এনে একটি ‘ইমার্জেন্সি এনার্জি ড্যাশবোর্ড’ চালু করতে হবে, যেখানে নাগরিকরা রিয়েল-টাইম তেলের জাহাজের অবস্থান থেকে শুরু করে স্থানীয় মজুত দেখতে পারবে।

স্বচ্ছতাই এখন আমাদের শ্রেষ্ঠ জ্বালানি
২০২৬ সালের এই সংকট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পুরনো আমলাতান্ত্রিক ধাঁচে স্বচ্ছতা আনা সম্ভব নয়। তেলের অভাব যতটা না বাস্তব সংকটের কারণ, তার চেয়ে বড় কারণ হলো ‘আস্থার অভাব’। ব্লকচেইন কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক ডিজিটাল ঢাল। নজেল থেকে ড্রাম পর্যন্ত প্রতিটি ফোঁটা তেলের হিসাব যখন ডিজিটাল লেজারে লেখা হবে, তখনই কেবল অসাধু সিন্ডিকেট ও মাফিয়াতন্ত্র ভেঙে পড়বে। তেল আমাদের আমদানি করতে হতে পারে, কিন্তু সেই আমদানিকৃত তেলের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের নিজস্ব মেধার। প্রযুক্তির এই সাহসী প্রয়োগই হবে আগামীর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর প্রকৃত পরীক্ষা। আজ যদি আমরা তথ্যের এই যুদ্ধে জয়ী হতে না পারি, তবে আগামীকালের তেলের লাইন আরও দীর্ঘ হবে।

তথ্যসূত্র: বিপিসি বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৫-২৬; সিডিসিআরএ বিশেষ গবেষণা প্রতিবেদন; আইইইএফএ এনার্জি ট্র্যাকার রিপোর্ট: দক্ষিণ এশিয়া প্রেক্ষাপট; কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষণ রিপোর্ট ২০২৬; আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও শিপিং নিউজ নেটওয়ার্ক (২০২৬) এবং বিশ্ব এনার্জি কাউন্সিল: ব্লকচেইন ইন এনার্জি সেক্টর গাইডলাইনস।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *