এআই যুগে চিপ সংকটের প্রভাব, দেশে প্রযুক্তিপণ্যে লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা): বিশ্বজুড়ে যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জয়জয়কার চলছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের বাজারে ঘনীভূত হচ্ছে এক গভীর সংকটের কালো মেঘ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রযুক্তিপণ্যের কাঁচামাল এবং যন্ত্রাংশের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, সেমিকন্ডাক্টর রাজনীতির জটিল সমীকরণ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বিশৃঙ্খলার কারণে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে প্রযুক্তিপণ্যের বাজার এক নজিরবিহীন অস্থিরতার মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি দেশের প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন বাংলাদেশ কমপিউটার সমিতি (বিসিএস) এই পরিস্থিতিকে ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে আখ্যায়িত করে একটি জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কাঁচামালের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং এআই চিপের বিশ্বব্যাপী কাড়াকাড়ি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রায় এক বিশাল ‘ডিজিটাল ধাক্কা’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে যে কারণগুলো
বিসিএস এবং আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের সরবরাহকৃত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে বেশ কয়েকটি জটিল সমীকরণ। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রযুক্তিপণ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল তামার মূল্য বিশ্ববাজারে রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। এর ফলে কেবল কমপিউটার বা ল্যাপটপ নয়, বরং মাদারবোর্ড, ক্যাবল এবং পাওয়ার সাপ্লাই ইউনিটের উৎপাদন খরচও সরাসরি বেড়ে গেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ বা কন্টেইনার ভাড়ার অস্থিরতা এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পণ্যের আমদানিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা খুচরা পর্যায়ের ক্রেতাদের ওপর বাড়তি খরচের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ সংকটের নেপথ্যে ‘এআই বিপ্লব’
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যে উন্মাদনা চলছে, তা সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের জন্য এখন এক বড় বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এনভিডিয়া, ইনটেল এবং টিএসএমসি-র মতো চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তাদের সিংহভাগ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যয় করছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এআই-ডেডিকেটেড চিপ তৈরিতে। এই এআই বিপ্লবের ফলে সরাসরি চিপ তৈরির কারখানাগুলোতে সাধারণ কমপিউটার, ল্যাপটপ এবং স্মার্টফোনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রসেসর ও চিপের উৎপাদন লক্ষ্যণীয় হারে কমিয়ে দেয়া হয়েছে।
যখন একটি নির্দিষ্ট কারখানায় দামী এআই সার্ভারের চিপ তৈরি করা হয়, তখন সাধারণ পিসির প্রসেসর ও গ্রাফিক্স কার্ডের জোগান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যায়। এই চাহিদা ও জোগানের চরম ভারসাম্যহীনতাই বিশ্বজুড়ে এক নতুন ‘সিলিকন ক্রাসিস’ বা চিপ সংকট সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু প্রসেসর নয়, বরং এসএসডি, র্যাম এবং ডিসপ্লে প্যানেলের মূল্যও গত কয়েক মাসে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে সম্ভাব্য প্রভাব
আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতা বাংলাদেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রথমত, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো ফ্রিল্যান্সিং খাত। নতুন ল্যাপটপ বা হার্ডওয়্যারের মূল্য ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে নতুন প্রজন্মের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কাজের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে, এতে করে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাবে তরুণরা।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা খাত ও ডিজিটাল লিটারেসির ক্ষেত্রে বড় বাধা আসবে। ‘ডিজিটাল রুপান্তর’ বিনির্মাণে শিক্ষার্থীদের হাতে সাশ্রয়ী মূল্যে ল্যাপটপ বা ট্যাব পৌঁছে দেয়া অপরিহার্য হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
এ ছাড়া করপোরেট ও ই-গভর্ন্যান্স খাতেও বড় প্রভাব পড়বে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের ডিজিটালাইজেশন বা সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে এবং নেটওয়ার্কিং পণ্যের সংকটের কারণে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা ও আইটি সাপোর্ট বজায় রাখা বেশ ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।
বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপট: পরিসংখ্যান কী বলে?
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় শিপিং লজিস্টিকস খরচ বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় আমদানিকারকদের এলসি খুলতে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিসিএস সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানান, ‘‘এটি কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক সংকট। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, পুরো বছরজুড়েই প্রযুক্তিপণ্যের কাঁচামাল ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের মূল্য ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। চিপ সংকট ও কাঁচামালের মূল্য বাড়ার কারণে আন্তর্জাতিক ভেন্ডররা ইতিমধ্যে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি, সামনের মাসগুলোতে ল্যাপটপ এবং আনুষাঙ্গিক পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে।’’
বর্তমান বাজারে কেমন প্রভাব পড়ছে
৩ হাজার টাকা মূল্যের ৮ জিবি র্যাম এর মূল্য এখন ৮ থেকে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে । ৮ হাজার টাকা মূল্যের ১৬ জিবি র্যাম বিক্রি হচ্ছে ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, যেসব ল্যাপটপ এলসি করা হয়েছে সেগুলো বাজারে ঢুকতে ঢুকতে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ হয়ে যাবে। ফলে আসল প্রভাবটা ওই সময়ই বোঝা যাবে। এখন বাজারে যেসব ল্যাপটপ বিক্রি হচ্ছে তার বেশির ভাগই পুরনো মূল্যে। সবাই স্টক থেকে বিক্রি করছেন বলে জানা গেছে।
সাইবার ঝুঁকি ও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
প্রযুক্তিপণ্যের উচ্চমূল্য দেশে নতুন কিছু ঝুঁকির সৃষ্টি করছে যা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। জেনুইন হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যার যখন সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন ব্যবহারকারীরা অনেক সময় বাধ্য হয়ে অনিরাপদ ও পাইরেটেড উপাদানের দিকে ঝোঁকেন। এটি ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে সাইবার হামলার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া, নতুন ডিভাইসের অভাবে পুরোনো এবং ত্রুটিপূর্ণ ডিভাইস বেশিদিন চালানোর ফলে ‘ই-বর্জ্য’ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। সস্তা ও নকল হার্ডওয়্যারের সয়লাব দেশের টেকসই ডিজিটাল লক্ষ্যমাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে?
বাজার বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট খুব দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম। নতুন চিপ তৈরির কারখানা স্থাপন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ বিষয়। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালের পুরোটা সময় জুড়েই মূল্যের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকবে। তবে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নাগাদ নতুন উৎপাদন কেন্দ্রগুলো চালু হলে এবং এআই চিপের প্রাথমিক উন্মাদনা কিছুটা থিতিয়ে আসলে বাজার স্থিতিশীল হতে শুরু করতে পারে। এর আগে পর্যন্ত ক্রেতাদের বাড়তি মূল্যের মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে।
দেশীয় শিল্পের সম্ভাবনা ও সাজেশন।
এই কঠিন সময়ে আমদানির ওপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় হাই-টেক পার্ক ও অ্যাসেম্বলিং শিল্পকে শক্তিশালী করার বড় সুযোগ রয়েছে। সরকার যদি এই খাতে বিশেষ শুল্ক ছাড় প্রদান করে, তবে দেশীয় ল্যাপটপ বা পিসি দিয়ে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।
ক্রেতাদের জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো- আগামী কয়েক মাসের অপেক্ষা না করে বর্তমান বাজার দরেই প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে ফেলা ভালো। এ ছাড়া পুরো নতুন ল্যাপটপ না কিনে বর্তমান ডিভাইসে এসএসডি বা র্যাম বাড়িয়ে গতি বৃদ্ধির চেষ্টা করা যেতে পারে।
প্রযুক্তিপণ্য ব্যবসায়ীদের প্রতি বিসিএস-এর নির্দেশনা হলো– প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ, মজুত ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা, গ্রাহকদের সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগ বজায় রাখা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি থেকে বিরত থাকা। গ্রাহক বা ক্রেতাদের বৈশ্বিক বাজারে উদ্ভূত পরিস্থিতির আলোকে পণ্য ক্রয়ের পরিকল্পনা করতে এবং একই সঙ্গে প্রযুক্তি পণ্য বিক্রেতাদের যৌক্তিক মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা। যৌক্তিক মূল্যে প্রযুক্তিপণ্য বিক্রি করা এবং কোনোভাবেই যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি না করা হয়।
প্রযুক্তিপন্য এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং মৌলিক প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে প্রযুক্তিপণ্যের আমদানিতে শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ জানাচ্ছেন প্রযুক্তি সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায়, উচ্চমূল্যের চাপে দেশের সাধারণ ব্যবহারকারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রযুক্তির দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে পারেন। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ‘ডিজিটাল ধাক্কা’ সামলাতে না পারলে দেশের সামগ্রিক ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া মন্থর হয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।





