প্রতিবেদন

টিকটক ও শর্ট ভিডিওর যুগে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ

ক.বি.ডেস্ক: বর্তমানে সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো তার সংগ্রহ করা খবরটি কিভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে। খবরটি কি পত্রিকার লেখা, টিভির রিপোর্ট, মোবাইলের ভিডিও নাকি সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট হবে সবধরনের চিন্তা মাথায় রেখে রিপোর্ট তৈরি করা। সাংবাদিকতার এই পরিবর্তন নিয়েই আলোচনা হয়েছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে টিকটক আয়োজিত মাস্টারক্লাসে।

‘সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কেমন হতে চলেছে?’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনাটি ছিল সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল গল্পবলা বিষয়ে টিকটক আয়োজিত মাস্টারক্লাসের অংশ। আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, টিকটকের ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি টিম এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটররা অংশ নেন।

আলোচনায়, এআই, শর্ট ভিডিও এবং মানুষের বদলে যাওয়া সংবাদ দেখার অভ্যাস কীভাবে সাংবাদিকতাকে পরিবর্তন করছে এইসব ওঠে আসে। তবে আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল, প্রযুক্তি সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম বা সরঞ্জাম বদলে দিতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার মূল দায়িত্বগুলো কখনোই পরিবর্তন হয় না।

এনএসইউর মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. হারিসুর রহমান বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীদের এমন একটি মিডিয়া জগতের জন্য প্রস্তুত করা, যা এখন আর শুধু সংবাদপত্র ও টেলিভিশনকেন্দ্রিক নয়।’’

আলোচনায় ওঠে আসে, সাংবাদিকতা শিক্ষার ধরনও ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে। আগে যেখানে সংবাদপত্র ও টেলিভিশনকেন্দ্রিক শিক্ষাই বেশি গুরুত্ব পেত, এখন সেখানে মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট তৈরি, ডিজিটাল সাংবাদিকতা, ডেটা নিয়ে কাজ করা এবং নতুন ধরনের গল্প বলার পদ্ধতিও শেখানো হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এআই। তবে সাংবাদিকতার মূল বিষয়গুলো একই থাকছে। কোনও খবর টেলিভিশনে, ওয়েবসাইটে বা মোবাইল ফোনের পর্দায় প্রকাশিত হোক না কেন, তথ্যের সত্যতা, যাচাই, নৈতিকতা এবং মানুষের স্বার্থকে সবসময় গুরুত্ব দিতে হবে।

টিকটকের ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি লিড আসমা আনজুম বলেন, ‘‘অনলাইনে তথ্য শেয়ার করার আগে আমাদের সতর্ক হতে হবে এবং যাচাই করে নিতে হবে। ডিজিটাল নাগরিকত্বের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ, অনলাইনে কিছু পোস্ট করার আগে চিন্তা করা, কোনও তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার আগে সেটি যাচাই করা এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম কেন কমিউনিটি গাইডলাইন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা তৈরি করে, তা বোঝা জরুরি।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘বর্তমানে ভুল তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম নয়, ইউজারদেরও দায়িত্ব রয়েছে। টিকটকের পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে নীতিমালা প্রয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার, কনটেন্ট পর্যবেক্ষণ এবং ইউজারদের সচেতন করা। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও ভবিষ্যৎ সাংবাদিকদের অনলাইনে পাওয়া তথ্য নিয়ে প্রশ্ন করতে এবং তা ভালোভাবে যাচাই করতে উৎসাহিত করা হয়।’’

টেলিভিশনের একটি প্রতিবেদন ছোট করে টিকটকে প্রকাশ করলেই সেটি ভালো টিকটক কনটেন্ট হয়ে যায় না- মীর সাব্বির; সম্পাদক, বিবিসি

এআইয়ের কারণে বাড়ছে নতুন চ্যালেঞ্জ
এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার কারণে তথ্য যাচাইয়ের কাজ আরও কঠিন হয়ে ওঠেছে। এআই দিয়ে তৈরি ছবি, অডিও এবং ভিডিও এখন আসল মনে হতে পারে। ফলে একজন সাংবাদিককে আসল তথ্য ও পরিবর্তিত বা কৃত্রিমভাবে তৈরি তথ্যের মধ্যে পার্থক্য করতে জানতে হবে।

আলোচনায় এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট হলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা, বিশ্বাসযোগ্য উৎসের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং সুযোগ থাকলে তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা ও কনটেন্টের উৎস শনাক্ত করার প্রযুক্তি ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। প্রযুক্তি নতুন হলেও সাংবাদিকতার একটি পুরোনও নিয়ম এখানেও প্রযোজ্য, কোনও কিছু দেখতে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেই তা প্রকাশ করা যাবে না।

বিবিসির সম্পাদক মীর সাব্বির বলেন, ‘‘মানুষের সংবাদ দেখার অভ্যাস পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যমগুলোকেও তাদের গল্প বলার ধরন পরিবর্তন করতে হচ্ছে। বর্তমানে তরুণদের একটি বড় অংশ মোবাইল ফোন এবং শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তথ্য ও খবর পেয়ে থাকে। তাই বিবিসি ও বিবিসি বাংলার মতো সংবাদমাধ্যমও এসব প্ল্যাটফর্মের জন্য খবর কীভাবে তুলে ধরা যায়, তা নতুন করে ভাবছে। তবে টেলিভিশনের একটি প্রতিবেদন ছোট করে টিকটকে প্রকাশ করলেই সেটি ভালো টিকটক কনটেন্ট হয়ে যায় না। প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য আলাদা করে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’’

তিনি বলেন,‘‘কোন খবর ছোট ভিডিওর জন্য উপযোগী, কতটুকু তথ্য ও ঘটনার কারণ দেয়া দরকার, কত দ্রুত খবর প্রকাশ করা উচিত এবং মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রতিযোগিতার মধ্যেও কীভাবে সাংবাদিকতার মান ধরে রাখা যায় এসব বিষয় বিবেচনা করতে হয়। ব্রেকিং নিউজ বা তাৎক্ষণিক খবরের সময় এই চ্যালেঞ্জ আরও বড় হয়। কারণ ভুল তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যেই অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। দ্রুত খবর দেয়ার চেয়ে সঠিক খবর দেয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’’

তিনি আরও বলেন,‘‘একাধিক উৎস থেকে তথ্য যাচাই, সম্পাদকের পর্যালোচনা এবং তথ্য যাচাইয়ের কাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত প্রকাশের চাপ থাকলেও চালিয়ে যেতে হবে। কোনও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়লে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে সেটি দ্রুত ও পরিষ্কারভাবে সংশোধন করাও জরুরি। সাংবাদিকতা পেশায় আসতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এই বিষয়টি কোনও নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম প্রযুক্তি শেখার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ ডিজিটাল টুল ও প্ল্যাটফর্ম ভবিষ্যতে আরও বদলাবে। কিন্তু ভালো সাংবাদিকের সঠিক সিদ্ধান্তয়ার ক্ষমতা ধরে রাখতে হবে।’’

অনলাইনে তথ্য শেয়ার করার আগে আমাদের সতর্ক হতে হবে এবং যাচাই করে নিতে হবে- আসমা আনজুম; ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি লিড, টিকটক

সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট তৈরির মধ্যে মিল
সাংবাদিকতার পাশাপাশি ডিজিটাল গল্প বলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, কনটেন্ট তৈরির বিষয়ও ওঠে আসে আলোচনায়। দুবাইভিত্তিক কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারাণ পারিহার বিভিন্ন দেশের দর্শকদের কাছে কীভাবে নিজের কনটেন্ট পৌঁছানো যায়, সে অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারাণ পারিহার বলেন, ‘‘নিয়মিত কাজ করা, নতুন কিছু চেষ্টা করা, নিজের কাজের প্রতি সত্য থাকা এবং দর্শকদের আচরণ বোঝার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করার ক্ষেত্রে শুধু একটি ভিডিও বা পোস্ট ভাইরাল করার চেষ্টা যথেষ্ট নয়। বরং সময়ের সঙ্গে দর্শকদের আস্থা তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কনটেন্ট ক্রিয়েটরদেরও নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়।

তিনি বলেন, ‘‘দর্শকদের সমালোচনা, শুরুতে কম দর্শক পাওয়া, কাজের ক্লান্তি, পরিবর্তনশীল ট্রেন্ড এবং বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার জন্য নিজের কাজের ধরন বদলে ফেলার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। নিজের ভুল বা ব্যর্থতা থেকে শেখা, দর্শকদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া কিন্তু নিজের স্বকীয়তা ধরে রাখা এবং নতুন ও মূল্যবান কনটেন্ট তৈরির দিকে মনোযোগ দেয়া জরুরি।’’

সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট তৈরি কি একসঙ্গে চলবে?
প্যানেল আলোচনায় বলা হয়, সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ভবিষ্যতে একে অপরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতেই হবে। একটি ৬০ সেকেন্ডের ভিডিও পাবলিক ইন্টারেস্ট সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। একটি বিষয় সম্পর্কে মানুষকে জানানো, কোনও ঘটনা সহজভাবে বোঝানো কিংবা তরুণদের কোনও গুরুত্বপূর্ণ খবরের সঙ্গে যুক্ত করতেও এমন ভিডিও কাজে আসতে পারে। তবে ভিডিও ছোট হলেই তথ্যের প্রমাণ, প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট এবং যাচাইয়ের প্রয়োজন কমে যায় না।

একইভাবে, সাংবাদিকদের কাজের জায়গা থেকে এআইও তাদের সরিয়ে দেবে না। বরং শিক্ষার্থীদের এআই সম্পর্কে জানতে হবে এবং দায়িত্বশীলভাবে এটি ব্যবহার করতে হবে। ভবিষ্যতের সাংবাদিকতা শিক্ষায় এআই ব্যবহারের জ্ঞান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠবে। তবে মানুষের বিচার-বিবেচনা, নৈতিক সিদ্ধান্ত এবং তথ্য যাচাইয়ের ক্ষমতাই থাকবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘমেয়াদে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করার ক্ষেত্রে শুধু একটি ভিডিও বা পোস্ট ভাইরাল করার চেষ্টা যথেষ্ট নয়- কারাণ পারিহার; কনটেন্ট ক্রিয়েটর, দুবাই

প্রযুক্তি নয়, প্রযুক্তির ব্যবহারই আসল বিষয়
সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সহজেই পুরো বিষয়টি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকরা এই প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করবেন? নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এই প্যানেল আলোচনায় তার একটি উত্তর পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতের সাংবাদিকরা আগের প্রজন্মের তুলনায় নতুন নতুন প্ল্যাটফর্মে বেশি কাজ করবেন, আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন এবং নানা ধরনের মাধ্যমে মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দেবেন। তবে সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি একই থাকবে- তথ্যের সত্যতা, ভালো বিচার-বিবেচনা, স্বাধীনতা এবং মানুষের আস্থা। খবর পৌঁছানোর মাধ্যম বদলেছে। কিন্তু দায়িত্ব বদলায়নি।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *