অনলাইনে আর্থিক প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকুন
ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ তুষার: ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে দেশে অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেনের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। এখন ঘরে বসেই মানুষ সহজে টাকা পাঠানো, বিল পরিশোধ, অনলাইন কেনাকাটা কিংবা ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। তবে প্রযুক্তির এই সুবিধার পাশাপাশি বাড়ছে অনলাইন আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকিও। প্রতারক চক্র এখন নানা কৌশলে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ও ব্যাংকিং তথ্য হাতিয়ে নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ফোনকল, এসএমএস, ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার কিংবা ভুয়া ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রতারকরা নিজেদের ব্যাংক কর্মকর্তা, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিনিধি, সরকারি সংস্থার কর্মকর্তা কিংবা পরিচিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করছে। সামান্য অসতর্কতার সুযোগ নিয়েই তারা ব্যাংক হিসাব, কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
যেভাবে ফাঁদ পাতে প্রতারকরা
বর্তমানে প্রতারণার ধরনগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলী ও প্রযুক্তিনির্ভর। অনেক সময় গ্রাহকদের কাছে এমন বার্তা পাঠানো হয় যেখানে বলা হয়- “আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে”, “কেওয়াইসি আপডেট করুন”, “পুরস্কার জিতেছেন”, “টাকা ফেরত পাবেন” কিংবা “ভেরিফিকেশন না করলে সেবা বন্ধ হবে”। আবার অনেক সময় ফোন করে বলা হয়, “আমি ব্যাংক থেকে বলছি”, “আপনার কার্ড ব্লক হয়ে গেছে”, “ওটিপি বলুন”, “অ্যাকাউন্ট আপডেট করতে হবে” ইত্যাদি।
ভয় দেখিয়ে বা তাড়াহুড়া তৈরি করে গ্রাহকের কাছ থেকে গোপন তথ্য আদায় করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। এসব বার্তার সঙ্গে একটি লিংক দেয়া হয়। ব্যবহারকারী সেই লিংকে ক্লিক করলেই তাকে ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে ব্যাংক হিসাব, কার্ড নম্বর, পিন, ওটিপি বা পাসওয়ার্ড চাওয়া হয়। একবার এসব তথ্য দিলে প্রতারকরা খুব সহজেই গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারে।
যেসব তথ্য কখনো শেয়ার করা যাবে না
ব্যাংকিং নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের গোপন তথ্য নিজের কাছেই রাখা। কোনও অবস্থাতেই নিচের তথ্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়- ব্যাংক হিসাব নম্বরের পূর্ণ তথ্য, এটিএম বা ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড নম্বর, কার্ডের পিন ও সিভিভি নম্বর, অনলাইন ব্যাংকিং পাসওয়ার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং পিন এবং ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড)। মনে রাখতে হবে, কোনও ব্যাংক কখনও ফোনকল, এসএমএস বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব তথ্য জানতে চায় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বাড়ছে প্রতারণা
ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, টেলিগ্রাম কিংবা মেসেঞ্জারে এখন নানা ধরনের ভুয়া অফার দেখা যায়। অনেক সময় বিনিয়োগে বেশি লাভ, সহজ ঋণ, লটারি জেতা বা বিদেশি সাহায্যের নামে প্রতারণা করা হয়। কিছু প্রতারক আবার পরিচিত মানুষের আইডি হ্যাক করে টাকা চায়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া যেকোনও আর্থিক প্রস্তাব গ্রহণের আগে অবশ্যই যাচাই করা জরুরি। সন্দেহজনক লিংক, অপরিচিত অ্যাপ বা অচেনা নম্বর থেকে আসা বার্তা এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
নিরাপদ থাকতে যেসব বিষয় মেনে চলবেন
নিজের অর্থ ও তথ্য সুরক্ষিত রাখতে কিছু সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন-
১. শুধুমাত্র অফিসিয়াল অ্যাপ ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন
অনলাইন ব্যাংকিং বা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারের সময় সবসময় প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন। গুগল সার্চে পাওয়া অচেনা লিংকে প্রবেশ না করাই ভালো।
২. অচেনা ডিভাইসে লগইন করবেন না
অন্য কারও মোবাইল, কমপিউটার বা সাইবার ক্যাফে থেকে ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
৩. শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন
সহজ পাসওয়ার্ড যেমন জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর বা “123456” ব্যবহার না করে শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা উচিত।
৪. নিয়মিত অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ করুন
ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেন নিয়মিত পরীক্ষা করলে সন্দেহজনক কার্যক্রম দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
৫. ফোনে তাড়াহুড়া সৃষ্টি করলে সতর্ক হন
প্রতারকরা সাধারণত ভয় দেখিয়ে বা জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করে তথ্য নিতে চায়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শান্ত থাকুন এবং কোনো তথ্য শেয়ার করবেন না।
সন্দেহজনক কিছু দেখলে কী করবেন
কোনও সন্দেহজনক ফোনকল, মেসেজ, লিংক বা লেনদেন দেখলে দ্রুত ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। প্রয়োজনে কার্ড ব্লক করা, পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো জরুরি।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা
অনলাইন আর্থিক প্রতারণা ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতনতা। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, প্রতারকদের কৌশলও তত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই প্রতিটি গ্রাহককে আরও বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে, আপনার একটি ছোট সতর্কতাই আপনাকে বড় আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেন নিশ্চিত করতে সচেতন থাকুন, অন্যকেও সচেতন করুন।





