মধ্যপ্রাচ্য সংকটে হুমকিতে বাংলাদেশের ই-কমার্স, ৩০ লাখ জীবিকার লড়াই
সোহেল মৃধা: বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে রক্তাক্ত করছে না, বরং এর প্রতিটি কামানের গোলা বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি ধমনীতে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার যখন টালমাটাল, তখন বাংলাদেশের উদীয়মান ডিজিটাল অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ‘ই-কমার্স’ খাত আজ খাদের কিনারায়।
গত এক দশকে তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই বিশাল ইন্ডাস্ট্রি এখন এমন এক মহাবিপর্যয়ের মুখে, যা কেবল ব্যবসায়িক লোকসান নয়, বরং ৩০ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়ার উপক্রম করেছে। যখন আমরা ‘ডিজিটাল রুপান্তর’ গড়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত আমাদের সেই স্বপ্নের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি এখন আর কেবল উদ্যোক্তাদের সংকট নয়, এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা।
অস্তিত্বের সংকটে ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান
বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত এখন আর শুধুমাত্র শৌখিন কেনাকাটার মাধ্যম নয়, এটি একটি বিশাল শ্রমবাজার। ই-ক্যাব নিবন্ধিত ৩,০০০-এর বেশি সক্রিয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশে প্রায় ৫ লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি অনলাইন উদ্যোক্তা রয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশ নারী এবং প্রান্তিক অঞ্চলের তরুণ সমাজ। সরবরাহ শৃঙ্খল, লজিস্টিকস, প্যাকেজিং এবং ডিজিটাল মার্কেটিং মিলিয়ে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানেই এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তায় সরাসরি আঘাত। স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি (সিডিসিআরএ)-এর তথ্যমতে, বার্ষিক প্রায় ৩৫,০০০ কোটি টাকার লেনদেনের এই বাজারে বর্তমানে ১০,০০০ কোটি টাকারও বেশি ধসের আশঙ্কা রয়েছে। এটি কেবল টাকার অংকে নয়, বরং হাজার হাজার স্টার্টআপ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: উৎপাদন থেকে ডেলিভারিতে ত্রাহি দশা
তেল কেবল পরিবহনের জ্বালানি নয়, এটি ডিজিটাল কমার্সের অদৃশ্য অক্সিজেন। যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া নিচের স্তরগুলোতে বিপর্যয় ডেকে আনছে-
উৎপাদন ব্যয় ও এসএমই সংকট: বাংলাদেশের ই-কমার্স পণ্যের বড় অংশ আসে দেশীয় ক্ষুদ্র শিল্প ও গার্মেন্টস থেকে। তেলের মূল্য বৃদ্ধি মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস এবং কারখানায় জেনারেটর ব্যবহারের খরচ বৃদ্ধি। এতে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় সরাসরি ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে।
লজিস্টিকস ও পরিবহন ব্যয়ের বিস্ফোরণ: জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর অপারেটিং খরচ আকাশচুম্বী করে দিয়েছে। তেলের লিটার প্রতি মূল্য সামান্য বৃদ্ধিও লজিস্টিকস খাতের খরচ ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে ‘ফ্রি শিপিং’ বা ‘কম খরচে ডেলিভারি’র যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
প্যাকেজিং ও কাঁচামাল: প্লাস্টিক ও সিনথেটিক মোড়ক মূলত পেট্রো-মিক্যাল উপজাত। তেলের বাজার অস্থির হওয়ায় প্যাকেজিং সামগ্রী, বাবল র্যাপ এবং মোড়কজাতকরণের খরচ দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ছে।
শিপিং বিপর্যয়: আন্তর্জাতিক শিপিং রুট পরিবর্তনের কারণে কন্টেইনার ভাড়া ইতোমধ্যে প্রায় ৩ গুণ বেড়েছে। ফলে বিদেশ থেকে পণ্য এনে যারা ই-কমার্স করেন, তাদের ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
অভিভাবকহীন ই-কমার্স: ই-ক্যাবের ব্যর্থতা ও প্রশাসনের উদাসীনতা
একটি জাতীয় দুর্যোগের সময় অভিভাবক সংগঠনের ভূমিকা থাকে অগ্রগণ্য। কিন্তু বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত এখানে চরম নেতৃত্বের অভাব ও প্রশাসনিক অবহেলার শিকার। ই-ক্যাবের বর্তমান অনির্বাচিত বা অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তাকারী কমিটি এই ভয়াবহ সংকট মোকাবিলায় কোনও দৃশ্যমান রোডম্যাপ দিতে পারেনি।
যখন ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে, তখন এই কমিটির নীরবতা এবং সময়োপযোগী অ্যাডভোকেসির অভাব সাধারণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এখনও কোনও সুনির্দিষ্ট ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন’ আসেনি। সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারের তালিকায় ই-কমার্স ও লজিস্টিকস খাতের অনুপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন করছে।
ডলারের বাজারে অস্থিরতা: বাড়ল প্রযুক্তিগত খরচ
যুদ্ধের প্রভাবে কেবল তেলের মূল্য বাড়ছে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের ই-কমার্স উদ্যোক্তারা যারা ডোমেইন, হোস্টিং, সফটওয়্যার বা ফেসবুক-গুগল বিজ্ঞাপনের জন্য ডলার খরচ করেন, তাদের ব্যয় ২০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। মুদ্রাস্ফীতির এই দ্বিমুখী চাপে ছোট স্টার্টআপগুলোর পক্ষে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পণ্য ফেরতের মরণফাঁদ ও গ্রাহকের আস্থা হারানোর শঙ্কা
তেলের মূল্য বাড়লে ডেলিভারির চেয়েও বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায় ‘রিটার্ন পার্সেল’ বা রিভার্স লজিস্টিকস। ক্রেতা পণ্য ফেরত দিলে উদ্যোক্তাকে দ্বিগুণ ডেলিভারি চার্জ গুণতে হয়। বর্তমানের উচ্চ ডেলিভারি চার্জের যুগে রিটার্ন রেট বাড়লে উদ্যোক্তারা ভয়াবহ ক্যাশ-ফ্লো সংকটে পড়বেন। পাশাপাশি, ডেলিভারি বিলম্ব এবং হুটহাট মূল্য বাড়ার ফলে ক্রেতারা আস্থার সংকটে পড়ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
পরিসংখ্যানে বিপর্যয়ের পূর্বাভাস: ঝুঁকির মুখে ১০ হাজার কোটি টাকা
সিডিসিআরএ-এর উপাত্ত অনুযায়ী যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ই-কমার্স বাজারের গাণিতিক চিত্র হবে ভয়াবহ। বার্ষিক লেনদেন ৩৫,০০০ কোটি টাকা থেকে কমে ২৫,০০০ কোটি টাকায় নামার ঝুঁকি রয়েছে। দৈনিক পার্সেল ডেলিভারি ৪.৫ লাখ থেকে কমে ৩ লাখের নিচে নামার আশঙ্কা রয়েছে। গড় ডেলিভারি খরচ ৭০ থেকে ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। গড় মূল্যস্ফীতি ই-কমার্স পণ্যের ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
খাদের কিনারা থেকে ফেরার পথ: আমাদের সুপারিশ
এই মহাপ্রলয় থেকে বাঁচতে হলে সরকার ও উদ্যোক্তাদের একযোগে কাজ করতে হবে। ই-কমার্স ও ডেলিভারি সার্ভিসকে ‘জরুরি সেবা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। অন্তত আগামী দুই বছরের জন্য ই-কমার্স লেনদেনের ওপর থেকে ভ্যাট এবং ডেলিভারি চার্জের ওপর আরোপিত কর সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা। জ্বালানি খরচ কমাতে দেশের ডাক বিভাগের বিশাল গ্রামীণ নেটওয়ার্ককে ই-কমার্স ডেলিভারিতে কার্যকরভাবে যুক্ত করা। ক্যাশ-ফ্লো ঠিক রাখতে ডিজিটাল পেমেন্টে বিশেষ ২ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ ক্যাশব্যাক বা সরকারি প্রণোদনা দেয়া। ক্ষতিগ্রস্ত ৫ লাখ উদ্যোক্তার অস্তিত্ব রক্ষায় সহজ শর্তে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার একটি ‘রেজিলিয়েন্স ফান্ড’ গঠন করা।
অস্তিত্ব রক্ষার শেষ ডাক
ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা যুদ্ধের কামানের গর্জন আমাদের দেশের ৩০ লাখ মানুষের জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সংকেত। ই-কমার্স সেক্টর আজ এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গত এক দশকে তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই বিশাল ডিজিটাল বাজারকে সুরক্ষিত করতে সরকার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ই-ক্যাবকে তাদের দায়সারা ভূমিকা ত্যাগ করে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজ যদি ৩০ লাখ মানুষের এই জীবিকা বিপন্ন হয়, তবে ডিজিটাল রুপাান্তর স্বপ্নটি অকালেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
সোহেল মৃধা- ই-কমার্স উদ্যোক্তা এবং বিশ্লেষক
তথ্যসূত্র ও উপাত্ত সংগ্রহ: ই-ক্যাব সদস্য ও উদ্যোক্তা বিষয়ক পরিসংখ্যান; আইএমএফ ও আইইএ; লজিস্টিকস রিসার্চ উইং; বিবিএস ও জাতীয় ডাটাবেজ; সিডিসিআরএ।





