প্রশ্ন-উত্তরে ভবিষ্যত ভাবনা: ডিডিআই এক্সপো’তে ৪টি প্যানেল আলোচনা
ক.বি.ডেস্ক: ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬ এর আলোচনাভিত্তিক আয়োজনগুলো প্রদর্শনীকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। প্রদর্শনী ও পণ্য উপস্থাপনার বাইরে গিয়ে এই প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল চারটি প্যানেল আলোচনা, যেখানে একক বক্তব্য নয়, বরং প্রশ্ন-উত্তর, ভিন্নমত ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আদান-প্রদানের মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতের বর্তমান চিত্র ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ওঠে আসে।
এই প্যানেল আলোচনাগুলোতে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও খাতসংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণে ডিজিটাল ইকোসিস্টেম, উদ্ভাবনের বাস্তব চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়। সরাসরি মতবিনিময়ের এই পরিসর অংশগ্রহণকারীদের জন্য কেবল তথ্য নয়, বরং বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ ও কার্যকর দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিজিটাল সেবার অ্যাক্সেস সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার আহ্বান
দেশে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে টেলিকমের ভূমিকা অপরিসীম। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে সামনে এগোতে হচ্ছে। এই অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্মার্ট ডিভাইসের পেনিট্রেশন বাড়াতে হবে। আমাদের সব শ্রেণির ব্যবহারকারীর জন্য একটা ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হবে। উন্নত বাজারগুলোতে কৃষি, শিক্ষা, শিল্প সবখাতের জন্যই আলাদা ইকোসিস্টেম রয়েছে। এজন্য নিজেদের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি এদিকেও নজর দেয়ার কথা বলেন টেলিকম খাতের বিনিয়োগকারীরা।

৩০ জানুয়ারি (শুক্রবার) ‘ডিজিটাল রাষ্ট্রের সহায়ক শক্তি: অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে টেলকো’ শিরোনামে প্যানেল আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তরা। সঞ্চালনা করেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী।
প্যানেলে আলোচক ছিলেন গ্রামীণফোনের চিফ বিজনেস অফিসার ড. আসিফ নাইমুর রশিদ, রবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াদ সাতারা, বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইউহান বুস, টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী, বিটিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশীদ এবং বিসিএস সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম।
প্যানেলে আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে ফিক্সড টেলিকমের পাশাপাশি মোবাইল সেবা শুরু হয় নব্বই দশকে। গত ২০ থেকে ৩০ বছরে একটি রেভুলোশনের মাধ্যমে বর্তমান অবস্থায় এসেছে। এর সবকিছুই হয়েছে একটি বিষয়কে সামনে রেখে সেটি হলো ভয়েস কল। দেশে এখনও প্রায় ৪০ শতাংশ ফিচার ফোন ব্যবহার করেন। এটি ধীরে ধীরে বদল হচ্ছে। কিন্তু আমাদের জোর দিতে হবে স্মার্টফোন পেনিট্রেশনে।
তৈরি পোশাকের পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যে ভিন্নতা আনতে হবে, মূল খাত হতে পারে প্রযুক্তি

বাংলাদেশ এখনও রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি খাত তৈরি পোশাকেই আটকে আছে। বাংলাদেশ প্রতি বছর বিশ্বে যে পরিমাণ রপ্তানি করে তার ৮০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক। অথচ সেই তৈরি পোশাকেরও বাংলাদেশের কোনো নিজস্ব ব্র্যান্ড নেই। এমন অবস্থায় রপ্তানিতে ভিন্নতা আনতে সবচেয়ে উপযোগী খাত প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিপণ্য বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ এখন অনেক বড় প্রযুক্তিবাজার যা রপ্তানিযোগ্য। এখানে অনেক ট্যালেন্ট আছে, যা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করার ব্যবস্থা করতে হবে।
৩০ জানুয়ারি (শুক্রবার) ‘বাংলাদেশ থেকে বিশ্বে: উৎপাদন ও রপ্তানির স্বপ্ন’ শিরোনামে প্যানেল আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তরা। সঞ্চালনা করেন বিসিএস সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম।
প্যানেলে আলোচক ছিলেন ইপিবির মহাসচিব মোহাম্মদ হাসান আরিফ, আরএফএল ইলেক্ট্রনিক্সের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নূর আলম, ওয়ালটন ডিজি হাইটেক ইন্ডাস্ট্রির গ্লোবাল বিজনেস ডিভিশনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর আব্দুর রউফ, শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউদ্দন চৌধুরী এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সিনিয়র স্পেশালিস্ট উবাহ থমাস উবাহ।
প্যানেলে আলোচনায় বক্তারা বলেন, ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির ঘরে বাংলাদেশ, যার অধিকাংশ গার্মেন্ট সেক্টরে। অন্য খাতের রপ্তানি এখনও বলার মতো না। নতুন রপ্তানির ফ্রন্টিয়ার হতে পারে প্রযুক্তি ও ডিভাইস। বাংলাদেশের এখন বিভিন্ন এজেন্ডা ধরে আগোনো দরকার। সেটি করতে হলে সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। বেসরকারি খাতে সরকারের পলিসির সঙ্গে ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রটাও উন্মুক্ত করতে হবে। তাহলে বাংলাদেশ থেকেউ ইউনিকর্ন কিছু বের হয়ে আসতে পারে। আমাদের জন্য ইলেক্ট্রনিক্সে ক্ষেত্রে সঠিক পলিসি করতে হবে।
সেমিকন্ডাক্টর খাতে সম্ভাবনার বাংলাদেশ: ইন্ডাস্ট্রি–একাডেমিয়া সংযোগ জোরদারের তাগিদ

বাংলাদেশে মেধাবী শিক্ষার্থীদের অভাব নেই। দরকার তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলে দেশের সেমিকন্ডাক্টর খাতকে বৈশ্বিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করা। ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে একাডেমিয়ার ঘনিষ্টতা বাড়িয়ে দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এজন্য দেশের সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ল্যাব প্রতিষ্ঠা, গবেষণায় অর্থায়ন এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকদের অন্তর্ভূক্তিতে জোর দিয়েছেন তারা। একইসঙ্গে বিগটেক বান্ধব পলিসি প্রণয়ন; এআই প্যাকেজিং ও ডিজিটাল টুইনের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আত্মবিশ্বাসী হওয়া তাগিদ দিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
২৯ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) ‘ভোক্তা থেকে উৎপাদক হিসেবে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর এবং ডিপ-টেক ভ্যালু চেইনে বাংলাদেশের অবস্থান’ বিষয়ক প্যানেল আলোচনায় এসব কথা ওঠে আসে। সঞ্চলনা করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. তৌহিদুর রহমান।
প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ জব্বার, বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. নাদিম চৌধুরী, হুয়াওয়ে সাউথ এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন হাই (হেভেন), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান নাহিয়ান রহমান রচি এবং কনফিগভিআর ও কনফিগআরবটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুদমিলা নওশিন। ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে আলোচনায় যুক্ত হন আমেরিকার পারডু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুস্তাফা হোসেন।
প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, সেমিকন্ডাক্টর খাতে বাংলাদেশি অনেকেই বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছেন। সেমিকন্ডাক্টর উদ্ভাবন নির্ভর খাত। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকেই এই উদ্ভাবনগুলো আসে। আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের এই খাতের উপযোগী করতে এবং সেমিকন্ডাক্টর ইকো সিস্টেমে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে সরকার-একাডেমিয়া-এনআরবিদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এখন আমাদের পলিসি সাপোর্ট দরকার। যদি ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়া একসঙ্গে কাজ করতে পারে তবে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা সেমিকন্ডাক্টর খাত থেকে অনেক পিছিয়ে আছি। এ খাতে এগিয়ে যেতে দক্ষতা উন্নয়নের বিকল্প নেই।
টেকসই উদ্ভাবনে প্রযুক্তির গতির সঙ্গে নীতিমালা পরিবর্তনের তাগিদ

সঠিক সময়ে উপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার না করা হলে দেশে টেকসই উদ্ভাবন সংস্কৃতি গড়ে ওঠা দূরূহ। তাই প্রযুক্তি পরিবর্তনে গতির সঙ্গে নীতিমালা পরিবর্তনের তাগিদ দিয়েছেন ব্যবাসয়ী নেতারা। আর ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সমন্বয়ে অ্যাসোসিয়েশন সেতুবন্ধন রচনা করতে পারে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। একইসঙ্গে প্রাথমিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চতুর্থ বর্ষে অধ্যায়নরতদের জন্য বিসিসির অধীনে আবার ইন্টার্নশিপ চালু, বৈশ্বিক মান বজায় রাখতে উদ্ভবন থেকে শিল্প পর্যায়ে আইএসও মান অনুশীলনের তাগিদ দিয়েছেন বক্তারা।
২৮ জানুয়ারি (বুধবার) ‘ব্রিজিং গ্যাপস ইন দ্য ইনোভেশন ইকোসিস্টেম: হোয়াট বাংলাদেশ নিডস টু ডু’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সঞ্চালনা করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন আইসিটি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবু সাঈদ, বুয়েটের অধ্যাপক ড. এ বি এম আলিম আল ইসলাম, বাক্কো’র অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আমিনুল হক, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি-এর মহাপরিচালক ড. মো. তৈয়বুর রহমান, এটুআই প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুর রফিক, আইডিয়া প্রকল্প পরিচালক মুর্তুজা জুলকার নাঈন নোমান এবং বিসিএস-এর জ্যেষ্ঠ সদস্য আতিক ই রাব্বানী।
প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, ডিজিটাল রূপান্তরে সরকারের পক্ষ থেকে অনেক কাজ করা হয়েছে। এখন এসব কাজের মধ্যে সমন্বয় দরকার। সে লক্ষ্যেই অন্তর্ভূক্তিমূলক ডিজিটাল উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ন্যাশনাল ডেটা গভর্নেন্স এজেন্সি অধ্যাদেশ এবং এআই ব্যবহার নিয়ে ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশ প্রস্তুত করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এখন নাগরিকের কাঙ্ক্ষিত সেবা পৌঁছে দিতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
উল্লেখ্য, ‘বাংলাদেশ টু দ্য ওয়ার্ল্ড’ স্লোগানে চার দিনব্যাপী (২৮-৩১ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের সর্ববৃহত আইসিটি পণ্যের প্রদর্শনী ‘‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬’’। ঢাকার শেরেবাংলা নগরের আগারগাঁও-এ অবস্থিত বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এবারের প্রদর্শনী যৌথভাবে আয়োজন করেছে বাংলাদেশ কমপিউটার সমিতি (বিসিএস), আইসিটি বিভাগ এবং বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ)। সহযোগিতায় ছিলো এটুআই প্রকল্প, ডিপার্টমেন্ট অব আইসিটি, এনসিএসএ, বিসিসি, স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড, সিসিএ, বেসিস, বাক্কো, আইএসপিএবি, ই-ক্যাব, বিআইজেএফ এবং টিএমজিবি।
ডিডিআই এক্সপো





