ভাবনা থেকে বাস্তবতা: ডিডিআই এক্সপো’তে অনুষ্ঠিত হলো ৫টি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার
ক.বি.ডেস্ক: প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও ডিজিটাল ভবিষ্যতকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২৬’ কেবল প্রদর্শনী বা প্রযুক্তি মেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও নিজেকে উপস্থাপন করেছে। এ আয়োজনের অংশ হিসেবে প্রদর্শনী চলাকালে বিষয়ভিত্তিক পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে দেশের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্ভাবকেরা অংশ নেন। এসব সেমিনারে ডিজিটাল রূপান্তর, উদ্ভাবন, স্মার্ট প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়, যা অংশগ্রহণকারীদের জন্য নতুন ভাবনা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল ডিভাইসের ঋণদানে প্রয়োজন সমন্বিত পলিসি
শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল ডিভাইস সহজলভ্য করতে হলে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে একটি পলিসি তৈরি করতে হবে। ডিজিটাল ডিভাইসের জন্য ঋণদানে এই পলিসি তৈরি করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে হাজার কোটি টাকার অবদান রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা।

৩০ জানুয়ারি (শুক্রবার) ‘অ্যাক্সেস টু ফাইন্যান্স টুওয়ার্ডস অপরচুনিটিজ: ফাইন্যান্সিং ডিজিটাল ডিভাইস ফর স্টুডেন্টস টু বিল্ড অ্যান ইন্টেলিজেন্ট সোসাইটি’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিসিএস সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন বিল্ডকন কনসালটেন্সি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব উদ্দীন আহমদ।
সেমিনারে আলোচক ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, আইসিটি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দীন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট সুপর্ণা রয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আলিফ রুদাবা, ফিজিশিয়ান আব্দুন নূর তুষার এবং অ্যাক্সেটেক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদিল হোসেন নোবেল।
নিজের সুরক্ষা, দেশের নিরাপত্তা ও শিল্পের প্রয়োজনেই এনইআইআর

দেশের মানুষের সুরক্ষার জন্য সাইবার ক্রাইম ঠেকানো, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং ক্রমবর্ধমান শিল্পের প্রয়োজনে দেশে ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর প্রয়োজন। এটি বাস্তবায়ন হলে মানুষ বিভিন্ন ধরনের হয়রানি থেকে সুরক্ষা পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২৯ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) ‘প্রসপ্যাক্ট অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস অব ইমপ্লিমেন্টিং ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। সেমিনারের সভাপতিত্ব করেন আইসিটি সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিটিআরসির সাবেক চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. নাসিম পারভেজ।
আলোচনায় অংশ নেন আইসিটি বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মোহাম্মদ আজিজুল হক, গ্রামীণফোনের রেগুলেটরি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কমার্শিয়াল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রধান ইমতিয়াজ শফিক, বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আমিনুল হক, এক্সেল টেলিকমের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন টিপু এবং সিটিটিসির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন শাখার অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার এস এম মোবাশ্বের হোসেন।
সেমিনারে বক্তারা এনইআইআর ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ, গ্রাহক সচেতনতা, নীতিগত প্রস্তুতি এবং সাইবার নিরাপত্তার দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। কার্যকর এনইআইআর বাস্তবায়নে সরকার, অপারেটর, আমদানিকারক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় অপরিহার্য বলে মনে করেন বক্তারা। দেশে এনইআইআর চালু হোক এটা যেমন চায় বিডা, এনবিআর, বিটিআরসি, তেমনি চায় মোবাইল ইন্ডাস্ট্রি্ও।
দেশে শক্তিশালী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গতে তুলতে প্রয়োজন সরকারের পলিসি সাপোর্ট

বাংলাদেশে স্টার্টআপগুলোর ব্যর্থতার হার অনেক দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ওঠে এসেছে নীতিগত সহায়তার অভাব। উদ্যোক্তারা মনে করেন, সরকারের সঠিক ও সময়োপযোগী পলিসি সাপোর্ট পেলে দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম বড় বড় কোম্পানিতে রূপ নিতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে টেকসই করতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার-ট্যালেন্ট কনভার্সন, ক্যাপিটাল ডেফথ, মার্কেট অ্যাক্সেস, বিশ্বস্ত অবকাঠামো এবং এক্সিট পাথওয়ে-নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
২৯ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) ‘বিল্ডিং অ্যা সাসটেইনেবল আইসিটি স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: অপরচুনিটিজ অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব কথা বলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা। সেমিনারের সভাপতিত্ব করেন আইসিটি সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্টার্টআপ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল হাই।
আলোচনায় অংশ নেন শিখো ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীর চৌধুরী, লাইটক্যাসল পার্টনার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিজন ইসলাম, চালডাল ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিম আলীম, পাঠাও বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ, বিডিজবস ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাশরুর, শেয়ারট্রিপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া হক।
নীতিমালার ধারাবাহিকতা ও প্রশাসনিক সদিচ্ছাই বিনিয়োগে মূল চাবিকাঠি

বিদেশি বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নয়; বরং নীতিমালার ধারাবাহিকতা, সমতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আমলাদের সদিচ্ছা ও সাহসী উদ্যোগ থাকলেই দেশে বিনিয়োগের ঘাটতি থাকবে না-এমন মত দিয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে হাইটেক পার্কগুলোতে প্লাগ অ্যান্ড প্লে সুবিধা চালু এবং লক্ষ্যপূরণে সরকারের কার্যকর সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছেন তারা।
২৯ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) ‘বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক: আ গেটওয়ে টু গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন আইসিটি বিভাগের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের সদস্য মোহাম্মদ সাইফুল হাসান।
সেমিনারে আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ড্যাফোডিল ফ্যামিলির চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খান, বিসিএস সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি জেনারেল ম্যানেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী এবং ওয়ালটন ডিজি-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. লিয়াত আলী।
সেমিনারে বক্তরা বলেন, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও সহায়ক পরিবেশ থাকলে দেশীয় বিনিয়োগ দিয়েই হাইটেক পার্কগুলোকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে নীতিমালা কোনও বড় বাধা নয়; বরং দরকার প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের সহজ ও দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া। পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নমুখী পথে এগোতে হবে হাইটেক পার্কগুলোকে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কাঁচামাল, মানবসম্পদসহ প্রয়োজনীয় সব সহায়ক পরিবেশ হাইটেক পার্কেই বিদ্যমান আছে কি না, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
ডেটা সুরক্ষা ও ওয়ান আইডিকে কেন্দ্র করে নতুন ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ছে সরকার

বিচ্ছিন্নভাবে করা ডিজিটাল উন্নয়নগুলোকে অন্তর্ভূক্তিমূলক ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিয়ে উপাত্তভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জোর দিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এজন্য ব্যক্তির পরিচয় সনাক্ত করণ এবং ডেটার নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার পরমার্শ তাদের। প্রযুক্তিবিদরা মনে করেন ডিজিটাল উন্নয়নে সাইবার নিরাপত্তায় কোনও ছাড় দেয়া যাবে না। আর সেদিকটায় লক্ষ্য রেখে ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে মেস থেকে স্টার মডেলে পা রেখেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
২৮ জানুয়ারি (বুধবার) ‘বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের প্রক্ষেপনের স্বপ্ন থেকে বাস্তবায়ন’ বিষয়ক সেমিনারে এমন অভিমত ব্যক্ত করেন ব্যক্তরা। সেমিনারে প্রধান বক্তা ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া।
আইসিটি সচিব শীষ হায়দার চৌধুরীর সঞ্চালনায় সেমিনারে আলোচক ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বর্তমান সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) শিক্ষাবিদ ড. আব্দুর রাজ্জাক, বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির এবং স্পেকট্রাম সফটওয়্যার অ্যান্ড কনসালটিং লিমিটেডের ম্যানেজিং পার্টনার মুশফিকুর রহমান।
উল্লেখ্য, ‘বাংলাদেশ টু দ্য ওয়ার্ল্ড’ স্লোগানে চার দিনব্যাপী (২৮-৩১ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের সর্ববৃহত আইসিটি পণ্যের প্রদর্শনী ‘‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬’’। ঢাকার শেরেবাংলা নগরের আগারগাঁও-এ অবস্থিত বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এবারের প্রদর্শনী যৌথভাবে আয়োজন করেছে বাংলাদেশ কমপিউটার সমিতি (বিসিএস), আইসিটি বিভাগ এবং বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ)। সহযোগিতায় ছিলো এটুআই প্রকল্প, ডিপার্টমেন্ট অব আইসিটি, এনসিএসএ, বিসিসি, স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড, সিসিএ, বেসিস, বাক্কো, আইএসপিএবি, ই-ক্যাব, বিআইজেএফ এবং টিএমজিবি।





