এই প্রযুক্তি খাত থেকেই ভবিষ্যত রচনা হবে: প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস
ক.বি.ডেস্ক: আগামী বিশ্ব হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বিশ্ব। আমরা এখন যেগুলো চিন্তাও করতে পারছি না, সেগুলো বাস্তব হবে। প্রযুক্তির, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। আমরা যদি নিজেদের গতি দ্রুত না করি, ওই গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান না করি, কী পরিমাণ দ্রুতগতিতে আমরা পিছিয়ে পড়ব, চিন্তাও করা যায় না। এই প্রযুক্তি খাতটাই হচ্ছে মূল খাত। এই প্রযুক্তি খাত থেকেই ভবিষ্যত রচনা হবে। তাই এই খাতকে প্রয়োজনীয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার ওপর জোর দিতে হবে।
আজ বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বিসিএফসিসি) অনুষ্ঠিত সর্ববৃহৎ আইসিটি পণ্যের প্রদর্শনী ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’ এর উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
‘বাংলাদেশ টু দ্য ওয়ার্ল্ড’ স্লোগানে চার দিনব্যাপী (২৮-৩১ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ আইসিটি পণ্যের প্রদর্শনী ‘‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬’’ যৌথভাবে আয়োজন করছে বাংলাদেশ কমপিউটার সমিতি (বিসিএস), আইসিটি বিভাগ এবং বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ)। আইসিটি খাতে বাংলাদেশের সাফল্য ও অবারিত সম্ভাবনাকে দেশ-বিদেশের সামনে তুলে ধরা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্য নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের প্রদর্শনী।
‘ডিডিআই এক্সপো-২০২৬’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া এবং বিসিএস সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘‘এই প্রদর্শনী শুধু একটি প্রদর্শনী নয়, এটি বাংলাদেশের সক্ষমতার এক সুদূরপ্রসারী অঙ্গীকার। এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা বিশ্বকে জানাতে চাই-বাংলাদেশ এখন আর কেবল সস্তা শ্রম বা আউটসোর্সিংয়ের দেশ নয়, আমরা এখন বিশ্বমানের ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদন ও উচ্চপ্রযুক্তির উদ্ভাবক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘বর্তমান বিশ্বে আইসিটি খাত আর কেবল অন্য কোনও খাতের সহায়তাকারী নয়, এটি এখন আমাদের জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু, শিল্পায়নের চালিকাশক্তি এবং রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার মেরুদণ্ড। আমরা এখন ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজির দিকে এগোচ্ছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ব্লকচেইন, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, রোবোটিক্স এবং গ্রিন টেকনোলজির মতো বিষয়গুলো আমাদের অর্থনীতিকে দেবে নতুন গভীরতা ও নতুন নেতৃত্ব।’’

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘‘তথ্যপ্রযুক্তিই বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই আমাদের লক্ষ্য কেবল ঘোষণায় নয়, বাস্তব কাজ ও ফলাফলে। দেশীয় প্রযুক্তি উৎপাদন বাড়িয়ে মোবাইল ডিভাইস, সফটওয়্যার, আইওটি ও এমবেডেড সিস্টেমে আত্মনির্ভরতা অর্জনের মাধ্যমে আমদানি নির্ভরতা কমানো ও তরুণদের জন্য উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হচ্ছে। ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ, হাই-টেক পার্ক ও ইনোভেশন হাবের কার্যকর ব্যবহার এবং এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হচ্ছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ রেজিস্ট্রেশন, কর ছাড়, নীতিগত সহায়তা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে উদ্ভাবনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের কথা বিবেচনায় রেখে এআই, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার সিকিউরিটি, ব্লকচেইন, ক্লাউড ও রোবোটিক্সে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা হচ্ছে।’’
শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘‘বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তার পেছনে আইসিটি বিভাগের ধারাবাহিক নীতিগত উদ্যোগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ গঠনের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রয়েছে। আইসিটি বিভাগ বিশ্বাস করে-প্রযুক্তি শুধু একটি আলাদা খাত নয়, বরং এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও প্রশাসনসহ প্রতিটি উন্নয়ন ক্ষেত্রের মূল চালিকাশক্তি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আইসিটি বিভাগের নেতৃত্বে আমরা ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, ই-গভর্ন্যান্স বাস্তবায়ন, হাই-টেক পার্ক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক প্রতিষ্ঠা, স্টার্টআপ ও ইনোভেশন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা এবং তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছি। এর ফলে আজ বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করছে না, বরং বৈশ্বিক বাজারেও প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে ওঠছে।’’
মো. মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া বলেন, ‘‘আজকের দিনটি শুধু একটি আয়োজনের নয়, এটি একটি সময়ের সাক্ষী। এমন এক মুহূর্তে আমরা একত্রিত হয়েছি, যখন বাংলাদেশ নতুন করে নিজের স্বপ্ন দেখে, নিজের মূল্যবোধে আস্থা রাখে এবং ভবিষ্যৎকে সাহসের সঙ্গে গড়ে তুলতে এগিয়ে যায়। ন্যায়, অন্তর্ভুক্তি ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের যে জাগরণ আমরা অনুভব করছি, এই প্রদর্শনী তারই প্রাণবন্ত প্রকাশ। বাংলাদেশ আর কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বাংলাদেশ আজ প্রযুক্তির নির্মাতা, উদ্ভাবনের কারিগর এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার।’’
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘‘এই প্রদর্শনীতে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং দেশীয় প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে সময়োপযোগী জ্ঞানভিত্তিক সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্মার্ট ডিভাইস, ফিনটেক, হেলথটেক, এডুটেক ও ইন্ডাস্ট্রি ৪.০-কেন্দ্রিক দেশীয় প্রযুক্তি পণ্য প্রদর্শনের মাধ্যমে স্থানীয় উদ্ভাবনের সক্ষমতা তুলে ধরা হচ্ছে। এই প্রদর্শনী জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আইসিটি খাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, তরুণদের অংশগ্রহণ, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে দেশি ও বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।’’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন আইসিটি বিভাগ, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, আইডিয়া প্রকল্প এবং বিসিএস, আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথিবৃন্দ, দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, সরকারি ও বেসরকারি ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধি, ছাত্রছাত্রী।
আয়োজকরা জানান, আজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রদর্শনী রাত ৮টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে। অন্যান্য দিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রদর্শনীতে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ থাকলেও অনলাইনে (www.ddiexpo.com.bd) অথবা স্পট রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে।





