সংযোগ থেকে সার্ভিসে রূপান্তর: টেলিকম খাতে বাংলাদেশের নতুন মহাযাত্রা
ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ (তুষার): বাংলাদেশের টেলিকম ও ডিজিটাল খাত দীর্ঘদিন ধরে একটি সীমাবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ ছিল, যেখানে সংযোগই ছিল শেষ কথা। ডেটা মানেই এমবি বা জিবি, আর টেলিকম অপারেটর মানেই ভয়েস ও ইন্টারনেট সরবরাহকারী। তবে এই বাস্তবতা বদলাতে শুরু করেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর টেলিকম ও ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতে যে আনব্লকিং প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিটিসিএল-এর এমভিএনও: নতুন অধ্যায়ের সূচনা
বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) পরীক্ষামূলকভাবে মোবাইল ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক অপারেটর (এমভিএনও) চালুর অনুমোদন পেয়েছে। ইতোমধ্যে বিটিসিএল টিম এই সেবার বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে এবং শিগগিরই এর পাইলট কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে এমভিএনও সেবার মাধ্যমে টেলিকম বাজারে নতুন প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবনের দ্বার খুলবে।
ফাইভজি থেকে ভিওওয়াইফাই: একের পর এক আনলক
এই আনব্লকিং উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে ফাইভজি। পাশাপাশি পুরোদমে শুরু হয়েছে ভয়েজ ওভার লং টার্ম ইভোলুশন (ভিওএলটিই) রোলআউট, উন্মোচন করা হয়েছে ভয়েস ওভার ওয়াইফাই (ভিওওয়াইফাই)। সামনে রয়েছে প্রাইভেট ফাইভজি, লার্জ পাবলিক ইনডোর (এপিআই), স্মল সেল, নেটওয়ার্ক স্লাইসিং ও হটস্পট-এর মতো আধুনিক টেলিকম সার্ভিস। নতুন টেলিকম নীতিতে এসব প্রযুক্তিকে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে, যা আগে নানা বিধিনিষেধে আটকে ছিল।
৭০০ মেগাহার্টজ অকশন ও ‘টোল প্লাজা’ বাস্তবতা
টেলিকম খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের অকশন ইতোমধ্যেই ডাকা হয়েছে। তবে নীতিনির্ধারকদের ভাষায়, দীর্ঘদিন ধরে সংযোগকে কেন্দ্র করে টেলিকম খাতকে জিম্মি করে রেখেছিল বিভিন্ন স্তরের ‘মাফিয়া’। বিগত সময়ে টেলিকম সংযোগ কার্যত একটি টোল প্লাজাতে পরিণত হয়েছিল, যেখানে অল্প বিনিয়োগে বিশাল ইকোসিস্টেমে রেন্ট-সিকিংয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতেই ফাইবার উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে, যাতে এক্সেস টু ফাইবার ও বাল্ক ডেটা ফ্লোতে কোনও অবকাঠামোগত বাধা না থাকে। লক্ষ্য একটাই: সংযোগ হবে হাইওয়ে, সেখানে টোল প্লাজা থাকবে না।
এমবি/জিবি নয়, সেবা-কেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশে এখনও মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড বাজার মূলত এমবি/জিবি ভিত্তিক। অথচ বিশ্ব এগিয়েছে সেবাকেন্দ্রিক মডেলে। নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে বেসিক সংযোগের ওপর আলাদা আলাদা প্যাকেজ থাকতে পারে শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহীতা, কিংবা শিল্প খাতের জন্য। এড-টেক, অ্যাগ্রো-টেক, গভ-টেক, ফিন-টেক, হেলথ-টেক, স্টার্টআপ ও ওটিটি-ভিত্তিক ডিজিটাল সার্ভিসের পাশাপাশি সামনে আসছে আইওটি, মিশন-ক্রিটিক্যাল ও ইন্ডাস্ট্রি-ক্রিটিক্যাল কমিউনিকেশন, গেমিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ক্লাউড ও কম্পিউটিং সার্ভিস। অর্থাৎ সংযোগ হবে ভিত্তি, কিন্তু মূল্য সংযোজন হবে সেবায়।
টেলিকম নেটওয়ার্ক অ্যান্ড লাইসেন্সিং পলিসি ২০২৫
এই দর্শনের বাস্তব রূপ হলো নতুন টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক অ্যান্ড লাইসেন্সিং পলিসি ২০২৫। নীতিটির মূল দর্শন সংযোগ থেকে সার্ভিসে রূপান্তর। গ্র্যান্ড ডিজাইন অনুযায়ী, ধাপে ধাপে ইন্ডাস্ট্রির সব প্লেয়ারকে সার্ভিসভিত্তিক মডেলে মাইগ্রেট করানো হবে।
প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘‘বিগত সরকার টেলিকমকে শুধু সংযোগ ব্যবসায় আটকে রেখে এই খাতকে একটি ইনোভেশনহীন, নলেজহীন এবং সীমিত সার্ভিসের ‘বনসাই’তে পরিণত করেছিল। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে সেই বামন দশা থেকে মুক্তির যাত্রা শুরু হয়েছে।’’
ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার: চূড়ান্ত লক্ষ্য
এই রূপান্তরের চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করছে কয়েকটি বড় প্রকল্পের ওপর- ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই)-এর সংযোগ হাব; ইলেকট্রনিক আইডেন্টিটি অথেন্টিকেশন লেয়ার; ন্যাশনাল এপিআই এক্সচেঞ্জ; সেক্টরাল ইন্টার-অপারেবিলিটি এক্সচেঞ্জ। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্র, নাগরিক ও বেসরকারি সেবার মধ্যে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি হবে।
বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘‘আমরা চাই সংযোগ হাইওয়েতে কোনও টোল প্লাজা থাকবে না। অতি সামান্য বিনিয়োগ করে কেউ বিশাল ইকোসিস্টেম এবং ইনভেস্টমেন্ট সার্কেলে রেন্ট সিকিং করতে পারবে না। এজন্য আমরা ফাইবার উন্মুক্ত করে দিয়েছি, যাতে এক্সেস টু ফাইবার এবং বাল্ক ডেটা ফ্লোতে কোনও অবকাঠামোগত বাধা না আসে।’’
ডেটা সুরক্ষা ও আইনগত ভিত্তি
ডিজিটাল সার্ভিস ইকোসিস্টেমের বিস্তারের সঙ্গে ব্যক্তিগত উপাত্ত ও গোপনীয়তা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা জরুরি। সে লক্ষ্যেই প্রণয়ন করা হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ‘পার্সোনাল ডেটা প্রটেকশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫’ এবং ‘ন্যাশনাল ডেটা গভর্নেন্স অর্ডিন্যান্স ২০২৫’। এর মাধ্যমে ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।
এক মহাযাত্রার শুরু
সবমিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এক ডিজিটাল মহাযাত্রার সূচনালগ্নে। লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক, সংযোগ থেকে সার্ভিসে রূপান্তর, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ইলেকট্রনিক আইডি ম্যানেজমেন্ট এবং ইন্টারকানেক্টিভিটি হাবভিত্তিক নাগরিক সেবা সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের পথচলা। দুর্বৃত্তায়ন ও অচলায়তন ভেঙে একটি সার্ভিস বেজড ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাই এই যাত্রার মূল লক্ষ্য। এর সুফল শেষ পর্যন্ত পৌঁছাবে দেশের মানুষের হাতে এবং শক্ত ভিত পাবে জাতীয় অর্থনীতি।





